নতুনের আবাহন: ছাত্রদলের আগামীর রাজনীতি ও গুণগত পরিবর্তনের রূপরেখা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিক্রমায় ছাত্র রাজনীতি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের অপরিহার্য সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে, যখনই এ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো কোনো স্বৈরাচারী শক্তির কবলে নিপাতিত হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সেই লৌহকপাট ভাঙার অগ্রসেনানী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।  নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রদল নিজেদের অসামান্য আত্মত্যাগের স্বাক্ষর রেখেছে। বর্তমানে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আগমনী বার্তা কেবল একটি গতানুগতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মূলত দেশের ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ ও গুণগত রূপান্তর নির্ধারণের এক অতিগুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। রক্ষণশীল দার্শনিক এডমান্ড বার্ক যথার্থই বলেছেন, ‘যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের উপায় ধারণ করে না, তা মূলত নিজের অস্তিত্ব সংরক্ষণেরও সক্ষমতা রাখে না।’ ছাত্রদলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ তত্ত্বটি সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় চরম নিপীড়ন, কারাবরণ এবং কাঠামোগত নির্যাতনের মুখে দাঁড়ি

নতুনের আবাহন: ছাত্রদলের আগামীর রাজনীতি ও গুণগত পরিবর্তনের রূপরেখা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিক্রমায় ছাত্র রাজনীতি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের অপরিহার্য সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে, যখনই এ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো কোনো স্বৈরাচারী শক্তির কবলে নিপাতিত হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সেই লৌহকপাট ভাঙার অগ্রসেনানী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রদল নিজেদের অসামান্য আত্মত্যাগের স্বাক্ষর রেখেছে। বর্তমানে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আগমনী বার্তা কেবল একটি গতানুগতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মূলত দেশের ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ ও গুণগত রূপান্তর নির্ধারণের এক অতিগুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

রক্ষণশীল দার্শনিক এডমান্ড বার্ক যথার্থই বলেছেন, ‘যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের উপায় ধারণ করে না, তা মূলত নিজের অস্তিত্ব সংরক্ষণেরও সক্ষমতা রাখে না।’ ছাত্রদলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ তত্ত্বটি সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় চরম নিপীড়ন, কারাবরণ এবং কাঠামোগত নির্যাতনের মুখে দাঁড়িয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যে অদম্য সাহসিকতা প্রদর্শন করেছেন, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ’ বা ডেমোক্রেটিক রেসিস্ট্যান্স এর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। 

অন্যান্য অনেক সংগঠন যখন আপসের পথে হেঁটেছে, ছাত্রদল তখন রাজপথের অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের সঁপে দিয়ে আন্দোলনের মশাল প্রজ্বলিত রেখেছে। তবে এই ত্যাগের মহিমাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বর্তমানের পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতায় ছাত্রদলকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট এর ভিত্তিতে অগ্রসর হতে হবে।

নতুন নেতৃত্বের সম্মুখভাগের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হলো ‘মিথ্যা বয়ান’ বা ফলস ন্যারেটিভ এর রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলা করা। বিগত বছরগুলোতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতির একটি বিকৃত ও নেতিবাচক চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সত্য-পরবর্তী এই যুগে সুকৌশলী প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তরুণদের একটি বৃহৎ অংশকে মূলধারার রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করার অপপ্রয়াস দৃশ্যমান। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘যখন কোনো সমাজ সত্য ও মিথ্যার বিভাজনরেখা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, ঠিক তখনই সেখানে স্বৈরতন্ত্রের শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত হয়।’ 

সুতরাং ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে কেবল স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাধ্যমে মিথ্যার দেয়াল চূর্ণ করে একটি সত্য ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ছাত্রদলকে একটি প্রডাক্টিভ ছাত্র সংগঠনে রূপান্তরিত করার সময় সমাগত। সংগঠনের মূলনীতি: শিক্ষা, ঐক্য ও প্রগতি। এটিকে কেবল কাগজে আবদ্ধ না রেখে এর প্রায়োগিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির লক্ষ্য কেবল মিছিল বা সমাবেশ নয়। তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বিদ্যমান কাঠামোগত অন্তরায়গুলো দূরীভূত করতে ছাত্রদলকে নীতি-নির্ধারণী বা পলিসি পর্যায়ে জোরাল ভূমিকা রাখতে হবে। 
সৃজনশীল অর্থনীতির বর্তমান যুগে একজন শিক্ষার্থী যেন কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে স্বয়ং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বা অন্ট্রপ্রেনর হতে পারে, সেই অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদলকে নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গুণগত পরিবর্তন আনয়ন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ছাত্রদলকে প্রকৃত অর্থেই ‘ভয়েস অব দ্য স্টুডেন্টস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তার ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থে যে ব্যক্তিস্বাধীনতার রূপরেখা দিয়েছেন, তার মূল সুর ধারণ করে ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সুরক্ষিত করা নতুন নেতৃত্বের একটি অপরিহার্য নৈতিক দায়িত্ব। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, নেতৃত্বের প্রকৃত সার্থকতা কেবল ক্ষমতার নিরঙ্কুশ চর্চায় নিহিত নয়; বরং তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার চূড়ান্ত প্রতীকে পরিণত হওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখছে, সেখানে ছাত্রদলের ভূমিকা হবে একজন দক্ষ স্থপতির ন্যায়। নিজেদের ত্যাগ ও বীরত্বের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পাথেয় করে, আধুনিকতা ও মেধার সুসমন্বয়ে ছাত্রদল একটি বৈষম্যহীন শিক্ষাঙ্গন বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, এটিই আজকের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সর্বজনীন প্রত্যাশা। নতুন নেতৃত্বে যারা সমাসীন হচ্ছেন, তাদের জন্য রইল শুভকামনা। ব্যক্তি নয়, বরং আদর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোরই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হোক।

লেখক
শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড (UWE), যুক্তরাজ্য।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow