‘নিজস্ব আদালত’ বসিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন তারা

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং বাজারে কোনো বিরোধ বা অভিযোগ উঠলেই ডাকা হয় ‘বিচার’। কিন্তু সেই বিচার বসে না ইউনিয়ন পরিষদে, যায় না থানায়ও। বাজার কমিটির কার্যালয়েই বসে কথিত এক ‘নিজস্ব আদালত’। সেখানে ডেকে নেওয়া হয় সিএনজি-টমটম চালক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ শোনা হয়, রায়ও দেওয়া হয়। তবে সেই রায়ের সঙ্গে প্রায়ই জুড়ে থাকে মোটা অঙ্কের টাকা। স্থানীয়দের দাবি, বাজার কমিটির প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এভাবে সালিশের নামে অর্থ আদায় করে আসছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলছেন, প্রতিবাদ করলে গাড়ি আটক, হুমকি কিংবা অপমানের শিকার হতে হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সিএনজি ও টমটম চালক এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ও সিএনজি-টমটম সমিতির নাম ভাঙিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুবেল ও কথিত সিএনজি–টমটম সমিতির নেতা জসিম উদ্দিন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো বিরোধ বা অভিযোগ উঠলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাজার কমিটির কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বসে ক

‘নিজস্ব আদালত’ বসিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন তারা

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং বাজারে কোনো বিরোধ বা অভিযোগ উঠলেই ডাকা হয় ‘বিচার’। কিন্তু সেই বিচার বসে না ইউনিয়ন পরিষদে, যায় না থানায়ও। বাজার কমিটির কার্যালয়েই বসে কথিত এক ‘নিজস্ব আদালত’। সেখানে ডেকে নেওয়া হয় সিএনজি-টমটম চালক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ শোনা হয়, রায়ও দেওয়া হয়। তবে সেই রায়ের সঙ্গে প্রায়ই জুড়ে থাকে মোটা অঙ্কের টাকা।

স্থানীয়দের দাবি, বাজার কমিটির প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এভাবে সালিশের নামে অর্থ আদায় করে আসছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলছেন, প্রতিবাদ করলে গাড়ি আটক, হুমকি কিংবা অপমানের শিকার হতে হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, সিএনজি ও টমটম চালক এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ও সিএনজি-টমটম সমিতির নাম ভাঙিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুবেল ও কথিত সিএনজি–টমটম সমিতির নেতা জসিম উদ্দিন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো বিরোধ বা অভিযোগ উঠলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাজার কমিটির কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বসে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেরাই ‘বিচার’ করেন। পরে নানা অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি আটক, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন সময় সিএনজি, টমটমসহ অন্যান্য যানবাহন আটক করে রাখেন। পরে গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে মালিক বা চালকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে দিনের পর দিন গাড়ি জব্দ করে রাখা হয়।

একাধিক সিএনজি চালক ও মালিক জানিয়েছেন, বাজার কমিটির নামে এমন কর্মকাণ্ডের কারণে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে উল্টো অভিযোগ তোলা হয় কিংবা গাড়ি আটকে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি অডিও ক্লিপেও এমন আচরণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ওই অডিওতে রুবেল নামে এক ব্যক্তিকে উচ্চস্বরে গালিগালাজ করতে শোনা যায়। সেখানে তিনি নিজেকে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দাবি করে বিভিন্ন কাজে লোকজনকে টাকা দিয়ে ব্যবহার করার কথাও বলেন। একই অডিওতে তাকে হুমকি দিয়ে বলতে শোনা যায়, আবার কাউকে ধরতে পারলে তার হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে। ‘ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে সই’ নিতে চাপ এদিকে একটি ভিডিও বার্তায় এক যুবক অভিযোগ করেন, কুতুপালং এলাকার ছৈয়দ নুর সওদাগরের ছেলে রুবেল মদ্যপ অবস্থায় এসে তার সিএনজি গাড়ি আটক করেন। পরে তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে তার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

রিনা নামের এক নারী সিএনজি মালিক জানান, তিনি তার গাড়িটি একজন চালকের কাছে ভাড়ায় চালাতে দিয়েছিলেন। কিছুদিন পর জানতে পারেন বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুবেল গাড়িটি আটক করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, গাড়ি ছাড়াতে গেলে আমার কাছে চার লাখ টাকা চাওয়া হয়। আমি এত টাকা দিতে পারব না বললে গাড়ি দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।

রিনার দাবি, পরে স্থানীয় এক যুবকের মাধ্যমে প্রথমে ৯০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন তিনি। এরপরও গাড়ি ফেরত না পেয়ে আরও ৩০ হাজার টাকা দিয়ে নানা কৌশলে গাড়িটি উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কুতুপালং বাজার কমিটির কার্যালয়ে আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার অভিযোগ ওঠে। এক রোহিঙ্গা ব্যক্তি দাবি করেন, উখিয়া বাজারে টাকা লেনদেনের কাজ শেষ করে ফেরার পথে কয়েকজন যুবক তার কাছ থেকে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। পরে বাজার কমিটির লোকজন তাকে নিজেদের অফিসে নিয়ে যায়।

তিনি অভিযোগ করেন, সারারাত সেখানে বসিয়ে রেখে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে টাকা নেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ ধরনের একাধিক ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কুতুপালং বাজার কমিটি কি কেবল ব্যবসায়ীদের সংগঠন, নাকি এটি এখন কার্যত একটি বিকল্প আদালতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার করার জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে। কিন্তু বাজার কমিটির নামে এভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উদ্বেগজনক।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, এ ধরনের দুই-একটি ঘটনার বিষয়ে কিছু ভুক্তভোগী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তখন আমি রুবেলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। পরে ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি আর অনুসরণ করা হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, বাজারে যদি কোনো ধরনের হাইজ্যাক বা সমস্যা ঘটে, সেটি দেখার দায়িত্ব আমাদের। আপনি যে বিষয়টির কথা বলছেন, কয়েকদিন আগে এমন একটি ঘটনা আমাদের কাছে এসেছিল। আমরা সেটি সমাধানের চেষ্টা করেছি। এছাড়া ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা দেখা ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। আমরা মূলত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই কাজ করছি। কারও কাছ থেকে জোর করে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

তবে বাজার কমিটির নামে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

অন্যদিকে কথিত সিএনজি ও টমটম সমিতির নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, সিএনজি আটকিয়ে রেখে টাকা নেওয়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমরা কারও কাছ থেকে টাকা নেইনি।

এ বিষয়ে জানতে বাজার কমিটির সভাপতি জহিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, কুতুপালং এলাকায় এমন কিছু ঘটনার কথা শুনেছি। তবে এ বিষয়ে থানায় কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার কমিটির নামে কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করে, তাহলে তা গুরুতর অপরাধ।

তাদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। না হলে কুতুপালং বাজারে এমন কর্মকাণ্ড আরও বেড়ে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষ আরও বেশি ভুক্তভোগী হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow