নীলফামারীর বেশিরভাগ কারখানায় নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এসব কারখানায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন দেড় লাখের বেশি শ্রমিক। ফলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তবে ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা শতভাগ বাস্তবায়নে কাজ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলায় ছোট-বড় মিলে এক হাজার ৭৭৫টি কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে ৯০০টিতে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। এসব শিল্প কারখানায় ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি বাতি, ধোঁয়া শনাক্তের যন্ত্র, আগুন প্রতিরোধী কম্বল, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, টর্চ লাইটসহ অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম থাকার কথা থাকলেও এসব কিছুই চোখে পড়েনি বেশিরভাগ কারখানায়।
কয়েকটি কারখানায় থাকলেও যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। অনেক কারখানার সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র নেই। নেই ট্রেড লাইসেন্সও। যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অনেক কারখানা। এমনকি বস্তি এলাকা, আটকেপড়া পাকিস্তানি ক্যাম্প, বহুতল মার্কেট ও রেলের কোয়ার্টারে ছোট ছোট শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় ১০-২০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াও শ্রমিকদের গায়ে দেখা থাকে না ব্যক্তিগত নিরাপত্তা (পিপি) সামগ্রি।
নীলফামারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্যে মতে, গত পাঁচ বছরে জেলায় শিল্প কারখানায় ১৩০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি হয়েছে ১০ জনের। আহত হয়েছেন ২০০ জনের বেশি। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১৩ জন শ্রমিক। আর ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ৫০ কোটি টাকার বেশি।
এর মধ্যে ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর সৈয়দপুর বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থিত আমিনুল প্লাইউড কারখানায় আগুনে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই বছর ১৪ জুলাই এ উপজেলার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ব্যবসায়ী রাজ কুমার পোদ্দারের মালিকানাধীন নোয়াহ্ কারখানার রয়েলেক্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের তৈরি প্রেসার কুকার, গ্যাসের চুলা ও তৈজসপত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাড়াও বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকে। সৃষ্ট আগুনে অ্যালুমিনিয়ামের কয়েক লক্ষাধিক টাকার তৈজসপত্র পুড়ে যায়।
সম্প্রতি একটি কৃত্রিম চুল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক আরজিনা জানান, কারখানায় আগুন লেগে প্রায় ২০০ শ্রমিক আহত হয়। আহতদের মধ্যে অনেকেই স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আবার অনেককে রংপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু মালিকপক্ষ আমাদের কোনো ধরনের চিকিৎসা সহায়তার করেনি। সুস্থ হলেও ওই দিনের দুর্ঘটনার ক্ষত নিয়ে সারা জীবন বাঁচতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির নীলফামারী জেলা কমিটির সভাপতি এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, জেলায় ২০০টি হালকা প্রকৌশল ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা রয়েছে। যেখানে ৫-১০০ জনের মত শ্রমিক কাজ করেন। অর্ধেকেরও কম কারখানায় রয়েছে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। অনেক কারখানা মালিকদের কোনোভাবে সচেতন করা যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিটি মিটিংয়ে এ ব্যাপারে তাগাদা দেওয়া হয়। তবে ফাইয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের গাফলতি রয়েছে। তারা এসব কারখানায় কোনো তদারকি করেন না।
নীলফামারী ফাইয়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক সাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানার মালিকরা এ নিয়ম মানছেন না। এসব কারখানাগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। যেগুলোতে নেই সেসব শিল্প কারখানাগুলোতে শতভাগ স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস। এ জন্য আমরা নিয়মিত গণসংযোগ ও মহড়া অব্যাহত রেখেছি। এছাড়া জেলায় দায়িত্বরত দুজন পরিদর্শককে তালিকাভুক্ত ও তালিকা ছাড়া কারখানাগুলোকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সেই হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, জেলার সব শিল্প কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযানও পরিচালনা করা হবে।
আরএইচ/এমএস