নেইমার যুগ শেষ, ব্রাজিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

একটা সময় ছিল, ব্রাজিল মানেই ছিল নেইমার। মাঠে নামার আগে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার প্রথম পাতায় থাকত তার নাম। গ্যালারিতে হাজারো সমর্থকের চোখে থাকত একটাই প্রত্যাশা- আজ কী জাদু দেখাবেন নেইমার? প্রায় দেড় দশক ধরে ব্রাজিলের ফুটবল মানচিত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু সবকিছুরই শেষ থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর সেই শেষটাও নিজেই ঘোষণা করলেন নেইমার। নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়ের পর আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি। এবার শেষ। এখান থেকেই শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম।’ তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো হতাশার মুহূর্তের কথা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর আনুষ্ঠানিকভাবেই জানিয়ে দিলেন- ব্রাজিল জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা শেষ। ২৮ জুলাই সান্তোসের হয়ে দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ কোপা সুদামেরিকানায় ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে নেইমার বলেন, ‘জাতীয় দলে আমার সময় শেষ। আমি ইতিহাস গড়েছি, অসংখ্য সুন্দর মুহূর্ত পেয়েছি। নিজের রক্ত, ঘাম, জীবন সবকিছু দিয়েছি। কিন্তু আর ফিরতে চাই না।’ নেইমারের বিদায়ে শুধু একজন তারকা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই শেষ

নেইমার যুগ শেষ, ব্রাজিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

একটা সময় ছিল, ব্রাজিল মানেই ছিল নেইমার। মাঠে নামার আগে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার প্রথম পাতায় থাকত তার নাম। গ্যালারিতে হাজারো সমর্থকের চোখে থাকত একটাই প্রত্যাশা- আজ কী জাদু দেখাবেন নেইমার? প্রায় দেড় দশক ধরে ব্রাজিলের ফুটবল মানচিত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু সবকিছুরই শেষ থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর সেই শেষটাও নিজেই ঘোষণা করলেন নেইমার।

নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়ের পর আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি। এবার শেষ। এখান থেকেই শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম।’ তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো হতাশার মুহূর্তের কথা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর আনুষ্ঠানিকভাবেই জানিয়ে দিলেন- ব্রাজিল জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা শেষ।

২৮ জুলাই সান্তোসের হয়ে দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ কোপা সুদামেরিকানায় ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে নেইমার বলেন, ‘জাতীয় দলে আমার সময় শেষ। আমি ইতিহাস গড়েছি, অসংখ্য সুন্দর মুহূর্ত পেয়েছি। নিজের রক্ত, ঘাম, জীবন সবকিছু দিয়েছি। কিন্তু আর ফিরতে চাই না।’

নেইমারের বিদায়ে শুধু একজন তারকা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই শেষ হয়নি; শেষ হয়েছে ব্রাজিল ফুটবলের একটি যুগও। এখন প্রশ্ন একটাই- নেইমারের পর ব্রাজিলকে নেতৃত্ব দেবেন কে? কাকে সামনে রেখে এগিয়ে যাবে ব্রাজিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ। এটাই এখন ব্রাজিল ফুটবলে কোটি টাকার প্রশ্ন। কোচ কার্লো আনচেলত্তি না হয় শিক্ষক হিসেবে ঠিক আছে, কিন্তু মাঠের খেলায় নেতৃত্ব থাকবে কার কাঁধে?

১৬ বছর ব্রাজিল ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নেইমার

ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের ভূমিকা সাফল্য আর আক্ষেপের এক অদ্ভুত মিশেলে গড়া। সংখ্যার বিচারে তিনি দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করার পর ব্রাজিলের জার্সি গায়ে ৮০ গোল করে ছাড়িয়ে গেছেন কিংবদন্তি পেলের রেকর্ড। ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। অসংখ্য ম্যাচে একাই দলকে জিতিয়েছেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙেছেন নিজের সৃজনশীলতা আর ড্রিবলিংয়ে।

কিন্তু যে ট্রফির জন্য ব্রাজিল তাকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে বলে আশা করেছিল, সেই বিশ্বকাপ আর জেতা হয়নি। চারটি বিশ্বকাপ খেলেও কখনও ফাইনালে উঠতে পারেননি। এমনকি সেমিফাইনালও খেলেননি। ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক ৭-১ পরাজয়ের ম্যাচেও ছিলেন না। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ভয়াবহ চোটে মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গিয়েছিল তার।

Neymar

জাতীয় দলের হয়ে একমাত্র বড় শিরোপা ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ। ২০১৯ কোপা আমেরিকা জয়ের সময় চোটের কারণে ছিলেন দলের বাইরে। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে প্রথমবার স্বর্ণপদক জেতালেও সেটি অনূর্ধ্ব-২৩ আসর হওয়ায় মূল জাতীয় দলের পরিসংখ্যানে যোগ হয় না। তবু এতদিন পর্যন্ত ব্রাজিলকে ভাবা হতো নেইমারকে কেন্দ্র করেই। তিনিই ছিলেন ব্রাজিল ফুটবলের পোস্টারবয়।

পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল হোক, বিশ্বকাপহীন নেইমারের জাতীয় দলের অধ্যায়ে থেকে গেছে এক অপূর্ণতার আক্ষেপ।

শেষ বিশ্বকাপেও ছিলেন ছায়ামাত্র

২০২৬ বিশ্বকাপে নেইমারের শেষ নাচ দেখার অপেক্ষায় ছিল কোটি সমর্থক। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিশ্বকাপের আগে ডান পায়ের কাফ মাংসপেশির দ্বিতীয় মাত্রার চোটে পড়েন তিনি। সুস্থ হয়ে দলে ফিরলেও আগের মতো ছন্দে ছিলেন না।

পুরো টুর্নামেন্টে খেলেছেন মাত্র দুটি ম্যাচ- স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের বিপক্ষে। তাও শেষ দিকে তাকে নামানো হয় মাঠে। সব মিলিয়ে মাত্র ৫৪ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। গোলও পেয়েছেন একটি, সেটিও পেনাল্টি থেকে, যখন ব্রাজিল কার্যত বিদায়ের পথে ছিল। যে নেইমার একসময় পুরো দলকে কাঁধে তুলে নিয়ে খেলতেন, শেষ বিশ্বকাপে তাকে দেখা গেছে সহায়ক চরিত্রে।

বিতর্কের মধ্যেও ছিলেন কেন্দ্রবিন্দু

নেইমারের ক্যারিয়ার শুধুই ফুটবল দিয়েই লেখা নয়। মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক, ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক অবস্থান- সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বিভাজিত ব্যক্তিত্বদের একজন। একদল তাকে দেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে শ্রদ্ধা করেছে। অন্যদিকে সমালোচকেরাও কখনও কম ছিলেন না।

Neymar

বিশ্বকাপের আগে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল, আদৌ তাকে দলে নেওয়া উচিত কি না। শেষ পর্যন্ত কোচ কার্লো আনচেলত্তি অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রেখে তাকে স্কোয়াডে রাখেন। কিন্তু বিশ্বকাপ শেষে ইতালিয়ান কোচও স্পষ্ট করে দেন- এবার নতুন প্রজন্মের সময়। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজন্মের অধ্যায় শেষ হয়েছে। নেইমার, দানিলো, ক্যাসেমিরো- যারা ত্রিশের ওপরে ছিল, তাদের যুগ শেষের দিকে।’

যে ফুটবলার একসময় একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন, শেষ বিশ্বকাপে তাকে দেখা গেলো সহায়কের ভূমিকায়। এটাই যেন বলে দিচ্ছিল- সময়ের চাকা ঘুরে গেছে। নেইমারও বিষয়টা বুঝে গিয়েছিলেন। সে কারণে হয়তো তিনি জাতীয় দলকে বিদায় বলে দিতে আর দ্বিতীয়বার ভাবলেন না।

আনচেলত্তির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর কোচ কার্লো আনচেলত্তি কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, ব্রাজিল এখন প্রজন্ম পরিবর্তনের সময় পার করছে। শুধু নেইমার নন, দানিলো, ক্যাসেমিরোসহ ত্রিশোর্ধ্ব একাধিক ফুটবলারের আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষের পথে। অর্থাৎ, ব্রাজিলের সামনে এখন শুধু নেইমারের মত একজন ফুটবলারের শূন্যতা পূরণের চ্যালেঞ্জ নয়; পুরো দলের পরিচয় নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আনচেলত্তির কাঁধে।

১৬ বছর বছর পর এমন এক ব্রাজিল দল দেখা যাবে, যেখানে নেইমারের উপস্থিতি থাকবে না। ফলে নতুন নেতৃত্ব, নতুন কাঠামো এবং নতুন দর্শন নিয়েই এগোতে হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

নেতৃত্বের মশাল কি ভিনিসিয়ুসের হাতে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- নেইমারের জায়গা নেবেন কে? এই মুহূর্তে আপাতত সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফরমার ছিলেন। এতদিন জাতীয় দলে খেললেও নেইমারের উপস্থিতির কারণে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পুরোপুরি আসতে পারেননি।

Vinisius

এখন সময় ও পরিস্থিতি বদলে গেছে। ব্রাজিলের নতুন ‘পোস্টার বয়’ হওয়ার পথে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ভিনি। শুধু মাঠে নয়, ড্রেসিংরুমেও তাকে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে হবে।

শুধু ভিনি নন, তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

ব্রাজিল অবশ্য একজন ফুটবলারের ওপর ভবিষ্যৎ গড়তে চায় না। আনচেলত্তির পরিকল্পনায় রয়েছেন আরও কয়েকজন তরুণ। চোটের কারণে বিশ্বকাপ খেলতে না পারা এস্তেভাওকে ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার প্রতিভা নিয়ে কোচ আনচেলত্তিও বেশ আশাবাদী।

এ ছাড়া এনদ্রিক, রায়ানের মতো তরুণরাও জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোচের নজরে রয়েছেন আরও বেশ কিছু তরুণ। যেমন ২০ বছর বয়সী ভিতোর রেইস, ক্রুজেইরোর ২৩ বছর বয়সী কাইকি ব্রুনো, ২২ বছর বয়সী ওয়েসলি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ২২ বছর বয়সী তারকা আন্দ্রে সান্তোস, চেলসি তারকা হোয়াও পেদ্রো, ২৫ বছর বয়সী মিডফিল্ডার হোয়াও গোমেজ, ব্রাজিল সিরি-এ’য় ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রুজেইরো তারকা কাইয়ো জর্জ, পালমেইরাস তারকা ভিতোর রকস এবং বোটাফোগোর তারকা ইগর হেসুস। এই তরুণদের নিয়েই পরবর্তী বিশ্বকাপের দল প্রস্তুত করতে পারেন আনচেলত্তি।

Estebao

অর্থাৎ, এবার ব্রাজিলের লক্ষ্য একজন ‘সুপারস্টার’ তৈরি করা নয়; বরং একাধিক তরুণকে নিয়ে নতুন একটি প্রতিযোগিতামূলক দল গড়ে তোলা।

নেইমারের ছায়া থেকে বের হওয়ার সুযোগ

গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল, প্রায় সবকিছুই নেইমারকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া। তিনি খেলবেন কি না, ফিট কি না, তাকে ঘিরেই কৌশল সাজানো, তাকে ঘিরেই প্রত্যাশা তৈরি করা। তবে নেইমার যখন অবসরের ঘোষণাটা দিয়েই ফেললেন, তখন সেই নির্ভরতার অবসান ঘটেছে। এতে একদিকে যেমন একজন কিংবদন্তির শূন্যতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম নিজেদের মতো করে দলটিকে গড়ে তোলার সুযোগও পাচ্ছে।

নতুন পরিচয়ের সন্ধানে ব্রাজিল

নেইমারের বিদায় ব্রাজিলের জন্য শুধু আবেগের নয়, বাস্তবতারও মুহূর্ত। এক যুগের বেশি সময় ধরে একজন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে চলা দলকে এখন নতুন করে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হবে।

ভিনিসিয়ুস কি সেই নেতৃত্ব দিতে পারবেন? এস্তেভাও, এনদ্রিক কিংবা রায়ানরা কি প্রত্যাশা পূরণ করবেন? আনচেলত্তি কি আবারও ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের পথে ফেরাতে পারবেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই জানা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত- নেইমারের অধ্যায় শেষ হয়েছে, এখন শুরু হচ্ছে ব্রাজিল ফুটবলের নতুন যুগ। এই নতুন যুগের সাফল্য নির্ভর করবে একজন তারকার ওপর নয়, বরং নতুন এক প্রজন্ম কত দ্রুত নিজেদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারে, তার ওপর।

আইএইচএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow