নৌবাহিনীর অবশ্যই পাঠ্য, নদীপথে মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য বই
বাংলাদেশ ভূ-প্রকৃতি নদী দিয়ে সৃষ্টি বলা যায়। প্রাচীনকাল থেকেই এই দেশে নদীকে কেন্দ্র করেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। গুপ্ত, পাল, সেন, তুর্কি, আফগান, মোঘল ও ইংরেজ আমল থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই দেশে হাতে গোনা বড় কয়েকটি নদীতে সেতু ছিল। সেহেতু ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ মূলত নদীকেন্দ্রিক বলাই চলে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের লে. জেনারেল কামাল উদ্দিন এর ' ট্রাজেডি অব এররস' বইয়ের একটি মন্তব্য স্মরণযোগ্য- ' সিনাই ও রাইন নদীর প্রবাহ ছিল সংকীর্ণ, সে তুলনায় গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ছিল মাইলকে মাইল প্রশস্ত। ভৈরব ও পাকশী ছাড়া এ দেশের বেশিরভাগ নদীই ছিল সেতুবিহীন।' এছাড়া এই দেশের উত্তরাঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১৫০ মিটার উঁচু আর দক্ষিণাঞ্চল ১০মিটার থেকে ক্রমে নিচু হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠে মিশেছে। স্বভাবতই হরহামেশাই বন্যা লেগেই থাকতো। এজন্যই নদীপথে যুদ্ধের কলাকৌশল নির্ধারণ জটিল ছিল বটে। ১৯৭১সালের মার্চের আগ থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নদীর পথে জাহাজে করে যুদ্ধের সরঞ্জাম এনে মজুদ করা শুরু করে। এ-র ফলে যুদ্ধে বাংলাদেশের রণকৌশল সাজাতে হঠাৎ হঠাৎ গতিপ্রকৃতি পালটাতে হয়; এখানে বাঙালিরা নিজেদের চেনাজানা পরিবেশের ফায়দা পেয়ে যায়।
বাংলাদেশ ভূ-প্রকৃতি নদী দিয়ে সৃষ্টি বলা যায়। প্রাচীনকাল থেকেই এই দেশে নদীকে কেন্দ্র করেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। গুপ্ত, পাল, সেন, তুর্কি, আফগান, মোঘল ও ইংরেজ আমল থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই দেশে হাতে গোনা বড় কয়েকটি নদীতে সেতু ছিল। সেহেতু ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ মূলত নদীকেন্দ্রিক বলাই চলে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের লে. জেনারেল কামাল উদ্দিন এর ' ট্রাজেডি অব এররস' বইয়ের একটি মন্তব্য স্মরণযোগ্য- ' সিনাই ও রাইন নদীর প্রবাহ ছিল সংকীর্ণ, সে তুলনায় গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ছিল মাইলকে মাইল প্রশস্ত। ভৈরব ও পাকশী ছাড়া এ দেশের বেশিরভাগ নদীই ছিল সেতুবিহীন।'
এছাড়া এই দেশের উত্তরাঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১৫০ মিটার উঁচু আর দক্ষিণাঞ্চল ১০মিটার থেকে ক্রমে নিচু হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠে মিশেছে। স্বভাবতই হরহামেশাই বন্যা লেগেই থাকতো। এজন্যই নদীপথে যুদ্ধের কলাকৌশল নির্ধারণ জটিল ছিল বটে। ১৯৭১সালের মার্চের আগ থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নদীর পথে জাহাজে করে যুদ্ধের সরঞ্জাম এনে মজুদ করা শুরু করে। এ-র ফলে যুদ্ধে বাংলাদেশের রণকৌশল সাজাতে হঠাৎ হঠাৎ গতিপ্রকৃতি পালটাতে হয়; এখানে বাঙালিরা নিজেদের চেনাজানা পরিবেশের ফায়দা পেয়ে যায়। তখনও পাকিস্তানের সামরিক শক্তির তুলনায় বাংলাদেশের তেমন কিছু ছিল না। এজন্যই পাকিস্তানের দাম্ভিকতা কিংবা অতি আত্মবিশ্বাস ছিল।
এখানেই বাঙালিরা বুক চিতিয়ে নদীর জলে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীনতার ৫৪বছর পেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে এসব নদীকেন্দ্রিক সমৃদ্ধ ইতিহাস অজানাই থেকে গেছে দুর্ভাগ্যক্রমে। অথবা সেসব ইতিহাসের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা কিংবা উদ্ঘাটনের প্রয়াস ছিল না। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিতেই বুঝি নদী ও পরিবেশের অন্তঃপ্রাণ লেখক ও সম্পাদক মোহাম্মদ এজাজ এর নিবেদন '১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ' বইটি; সাড়ে পাঁচশ পৃষ্ঠার বেশি বৃহৎ কলেবরের বইটি মুক্তিযুদ্ধে নদীকেন্দ্রিক সামরিক অভিযানের আদ্যোপান্ত ইতিহাস বলে ক্ষান্ত হননি, নানান দিকের উদ্ভূত পরিস্থিতির সমস্যা এমনকি প্রতিটা অপারেশননের পরবর্তী পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর প্রতিক্রিয়ায় গতিপ্রকৃতি সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।
এই বইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গুণ বর্ণনায় বাহুল্য নেই, টানটান উত্তেজনার ঘটনা বলে যাওয়া। তবে আশ্চর্যের যে, ভাষার সারল্যে সহজাত বলে যাওয়ার মধ্যে মনে হচ্ছে সামরিক অভিযানগুলো পাঠকের সামনে ঘটে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের এক থেকে এগারো নম্বর সেক্টরের সংঘটিত নদীপথের সব ঘটনা, উপরন্তু নদীকে কেন্দ্র করেই সেক্টরগুলো পরিচালনা ও গঠিত হয়েছে, এসবের বিস্তারিত কারণ উপস্থিত করেছেন। উল্লেখ্য ১০নম্বর সেক্টরের পুরোটাই নদী নিয়ে জল-সীমানা নির্ধারিত হয়। এই বইয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের ডাফনে- ক্লাস সাবমেরিন পিএনএস ম্যানগ্রো নিয়েও লেখা আছে। এমনকি ১৯৭১ সালের পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রধান টেলিগ্রাফিস্ট আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর কথাও ঘটনার পর ঘটনার বিস্তারিত লেখেন। সাবমেরিনটি ফ্রান্সের তৈরি ফ্রান্সের তোলন নৌঘাঁটিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছিল। কিন্তু তরুণ ওয়াহেদ চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করবেন না। এই সিদ্ধান্তে ১৩জন সম্মতি দিলেও পালানোর সময় নয়জন ছিলেন। পথের মধ্যে একজন ব্রিটেনে চলে যায়। সবশেষে আটজনকে নিয়ে নানা জটিলতার পরে মাদ্রিদে ভারতীয় দূতাবাসের কাছে পাঠালে সেখান থেকেও পালান। এই পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে শেখ মুজিবের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধে সংগ্রামে যোগদানের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক।
ইতিহাসকে ইতিহাসের পথে চলতে দিয়ে লেখক প্রকৃত ইতিহাস জানাতে চেয়েছেন শুধু নয় সামরিক অভিযানে প্রত্যেক পদক্ষেপে কলাকৌশল উল্লেখ করেছেন পাঠকের সামনে; প্রত্যেক অপারেশনের মানচিত্র এঁকে দেখিয়ে দিয়েছেন পুরো নদীকেন্দ্রিক প্রকল্প। নৌ কমান্ডো সুইসাইডাল স্কোয়াডের গঠন ও অপারেশন পদ্মা নয়,পদ্ম- এর রক্তস্নাত ইতিহাসের নির্মোহ বর্ণনা কিংবা সম্রাট, কিং কোবরা এবং জলজ ইঁদুরের কথা এদেশের অনেক পাঠকের কাছে নতুন জানা হবে নিশ্চয়; এছাড়া সেক্টর এক্স, অপারেশন জ্যাকপট, অপারেশন এক্স কিংবা প্রতিরক্ষা থিওরি,ডিফেন্সিভ অভিযান, আত্মরক্ষা থিওরি,অফেন্সিভ অভিযান ও অ্যামবুশ থিওরি, অ্যামবুশ অভিযানের অধ্যায়টি এই দেশের সচেতন নাগরিকের মাঝে সামরিক সেন্স তৈরি করবে। এমনকি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে এই বইটি উল্লেখযোগ্য বই হিসেবে বিবেচিত হওয়া আবশ্যক বটে।
১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ
মোহাম্মদ এজাজ
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫
প্রকাশন: জাগতিক প্রকাশন
পৃষ্ঠা : ৫৫৯। মূল্য : ১৫০০ টাকা
What's Your Reaction?