নয়ন আহমেদের দুটি অণুগল্প...
হাত দুপুরের দিকে আবু তাহের উদাস, অবলম্বনহীন তাকায় জানালা দিয়ে বাইরে। সাবিনা স্কুলে; তার স্ত্রী,স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর সে নিজে, ভূতপূর্ব কর্মচারী; তাও একটা ছাপাখানার। কাগজ কাটতে গিয়ে, ডান হাতের কব্জি হারিয়ে, এখন দু মাস ধরে বিছানায়। তার অসহায়ত্বে দুপুরটাও যেন বিষণ্ন। আবু তাহের দুঃখের দহনে পুড়তে থাকে। সাবিনাকে বিয়ে করে সে কি ভুল করেছে? প্রশ্ন করে সে নিজেকেই, কিন্তু উত্তর পায় না। বউ তার চেয়ে শিক্ষিত; বিয়ের আগে এইচএসসি; তারপর বিয়ের পর বিএ করেছে। সাবিনার জোর চেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে পাস করা। তারপর চাকরি; সোনার হরিণ পেয়েছে সে। সেই তুলনায় তাহের মাত্র এসএসসি। সাড়ে ৪টা নাগাদ সাবিনা আসে।দরজা খোলে তাহের। হঠাৎ তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় সে। হাতে আঘাত লাগে; ব্যথায় উহ্ করে ওঠে সে। সাবিনা তাকে ধরে উঠায়; বিছানায় বসায়। এমন ব্যবহারে একটু অবাক হয় তাহের। : শোনো,শক্ত হও। ভেঙে পড় না।সব ঠিক হয়ে যাবে। সাবিনা সান্ত্বনা দিতে দিতে বলে। : না, কিছুই ঠিক হবে না! সাবিনা সে মুহূর্তে কাটা হাতটা কোলে তুলে নিয়ে বলে, আমিই তোমার হাত। আবু তাহের আবেগে ভেসে যেতে থাকে। আবাসন শীতে
হাত
দুপুরের দিকে আবু তাহের উদাস, অবলম্বনহীন তাকায় জানালা দিয়ে বাইরে।
সাবিনা স্কুলে; তার স্ত্রী,স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
আর সে নিজে, ভূতপূর্ব কর্মচারী; তাও একটা ছাপাখানার।
কাগজ কাটতে গিয়ে, ডান হাতের কব্জি হারিয়ে, এখন দু মাস ধরে বিছানায়।
তার অসহায়ত্বে দুপুরটাও যেন বিষণ্ন। আবু তাহের দুঃখের দহনে পুড়তে থাকে।
সাবিনাকে বিয়ে করে সে কি ভুল করেছে? প্রশ্ন করে সে নিজেকেই, কিন্তু উত্তর পায় না।
বউ তার চেয়ে শিক্ষিত; বিয়ের আগে এইচএসসি; তারপর বিয়ের পর বিএ করেছে।
সাবিনার জোর চেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে পাস করা।
তারপর চাকরি; সোনার হরিণ পেয়েছে সে।
সেই তুলনায় তাহের মাত্র এসএসসি।
সাড়ে ৪টা নাগাদ সাবিনা আসে।দরজা খোলে তাহের।
হঠাৎ তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় সে।
হাতে আঘাত লাগে; ব্যথায় উহ্ করে ওঠে সে।
সাবিনা তাকে ধরে উঠায়; বিছানায় বসায়।
এমন ব্যবহারে একটু অবাক হয় তাহের।
: শোনো,শক্ত হও। ভেঙে পড় না।সব ঠিক হয়ে যাবে।
সাবিনা সান্ত্বনা দিতে দিতে বলে।
: না, কিছুই ঠিক হবে না!
সাবিনা সে মুহূর্তে কাটা হাতটা কোলে তুলে নিয়ে বলে, আমিই তোমার হাত।
আবু তাহের আবেগে ভেসে যেতে থাকে।
আবাসন
শীতের জুতো কিনেছি একজোড়া।
সস্তা দামের। এই শীতটা কাটবে ভালোভাবে। যত্নে রাখলে আগামী বছরটাও কাজে লাগানো যাবে।
কয়েকটা দিন পরলাম। কয়েক দিন পর বড়ো ভাইয়ের কাছ থেকে দামি আরেক জোড়া উপহার পেলাম।
‘আবির, তোর জন্য জুতো কিনেছি।
এই নে।’ মহাখুশি আমি।
দাম কতো হবে? জানতে চাইলাম না।
উপহারের জিনিসের দাম জিজ্ঞেস করতে নেই।
বাটা কোম্পানির জুতো তো। তিনহাজার টাকার নিচে হবে না। অনুমান করি।
উপহারে যেন আনন্দটা ফুলের মতো ফুটে ওঠে।
ভাইয়ের দেওয়া জুতো জোড়া পরছি এখন।ন
আর আমার কেনা জুতো জোড়া আলনার নিচে রেখে দিয়েছি।
নিরিবিলি থাকুক ওখানে।
বিশ্রাম নিক।
ওটা আর ধরাই হলো না।
মাত্র পাঁচশো টাকার জিনিস।
একটু তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলাম যেন।
ঘি পাইলে কে আর পান্তা ভাত খায়?
এমন অবস্থা আর কী!
দেখতে দেখতে শীত চলে গেলো। এলো বসন্ত।
ফুটলো নতুন ফুল। কে বলবে একদিন প্রচণ্ড শীত ছিলো?
দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই।
শুয়ে-বসে কাটাই রুমে।
এখনো ব্যাচেলর। খাই, ঘুমাই। অবসরে গল্প, কবিতার বই পড়ি।
বিছানা এলোমেলো।
কুঁড়ের বাদশা।
কেউ এলে মৃদু সমালোচনা করে। আনন্দ পাই।
বলি, একদিন নরম হাতের ছোঁয়ায় সব ঠিক হয়ে যাবে।
বন্ধুরা হাসে। মজা পায়।
একদিন দুপুর বেলা।
দিলাম ঘর ঝাড়ু। এটা-ওটা পরিষ্কার করছি।
অনেক হাবিছাতা পড়ে আছে।
আলনার নিচটায় ময়লা জমেছে।
সাবধানে পরিষ্কার করছি। শীতের দুই জোড়া জুতো কী অবস্থায় আছে, দেখছি।
অবহেলায় জিনিস নষ্ট হয়।
যত্নে দীর্ঘ স্থায়িত্ব পায়।
ওমা! আমি তো অবাক।
কোথা থেকে এসে দুজোড়া কুনোব্যাঙ নিজের কেনা জুতোর ভেতর ঘুমিয়ে আছে আরামে।
দুটো দুটো করে মোট চারটে।
নিশ্চয়ই এরা দম্পতি।
ভাইয়ের দেওয়া জুতো জোড়া তুলে রাখি সাবধানে।
বাকি জোড়ায়, ভেতরে আরামে থাকুক ওরা।
আমি আর ওদের উচ্ছেদ করি না।
থাকুক।
প্রত্যেকেরই বাড়ি দরকার।
একজোড়া জুতো ওদের আবাসন হয়ে রইলো।
অভিনন্দন জানালাম চারজনকে।
নয়ন আহমেদ : একজন বাংলাদেশি কবি। নব্বই দশকের অন্যতম প্রধান কবি।
নয়ন আহমেদ ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রব, মাতার নাম আলেয়া বেগম।
চার ভাইবোনের মধ্যে (তিন ভাই, এক বোন ) তিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৮৬ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে, এইচএসসি পাশ করেন বরিশাল কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর পাস করেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ (বিএম কলেজ) থেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত বিএম কলেজ থেকে অনার্সে তিনি সারাদেশের মধ্যে ১৯ তম প্লেস পান এবং এমএ তে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন সন্তানের জনক।
দুই কন্যা সন্তান— তামান্না রুকসাৎ, তানজিলা ও পুত্র সন্তান— মেহেদী হাসান।
স্ত্রী শিরিন আক্তারকে নিয়ে তাঁর দাম্পত্য জীবন।
বর্তমানে তিনি বরিশালে বসবাস করছেন।
পেশা অধ্যাপনা।
তিনি হিজলা উপজেলার বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
তার লেখালেখি শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকে।
নব্বই দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন তিনি।
তার কবিতায় সৌন্দর্যবোধ, দেশপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ ইত্যাদি নিষ্ঠার সাথে ফুটে উঠেছে।
কবিতায় তিনি ইসলামি মিথ ও ঐতিহ্য, ভারতীয় মিথ ও গ্রিকমিথ ব্যাপক ব্যবহার করেন। গল্প রচনায় ও তিনি সিদ্ধহস্ত।
ইতোমধ্য তার ১০টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
তার মধ্যে— অসম্ভব অহংকার, আমার বিবাহিত শব্দরা, খনিঘুম, সবকিছু রোদে দেবো, মারেফত সিরিজ, নাতিদীর্ঘ দুপুরের ধ্বনি, এককাপ গণ যোগাযোগ, মেরুদণ্ডময় উষ্ণতা, তার নাম আহমদ (সা.), ইহুদি সমগ্র।
কবিতার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন।
What's Your Reaction?