রাতের আঁধারে ঢাকার পুরোনো একটি গলির বাতিগুলো ম্লান হয়ে আসছিল। যেন আলোও ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। দূরে কুকুরের হাহাকার আর ভাঙা রিকশার চাকা ঘোরার শব্দ মিলেমিশে অদ্ভুত রহস্য তৈরি করছিল। গলির শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল, মুখ ঢাকা কালো নেকাবে। চারপাশের নিস্তব্ধতা কাঁটার মতো বিঁধছিল। যেন পুরো শহর নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে ছায়ার গতিবিধির জন্য। কে সে, কোথা থেকে এসেছে—কেউ জানে না। শুধু জানা যায়, যেখানে সে যায়; সেখানেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, অপ্রকাশিত খুন কিংবা এমন সব গোপনীয়তা প্রকাশ পাওয়া, যেগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রাচীরকেও কাঁপিয়ে দিতে পারে।
গলির ভেতরে অচেনা দরজার সামনে থামলো কালো নেকাব। দরজাটা যেন বছরের পর বছর খোলা হয়নি, মরচে পড়া তালা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিল। সে নিজের আঙুলে একটি ছোট যন্ত্র ধরলো, মিনিটের ভেতরে তালা ভাঙলো কোনো শব্দ ছাড়াই। ভেতরে প্রবেশ করতেই হালকা ধুলো উড়লো। ভেতরের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা তাকগুলোর মধ্যে অগণিত ফাইল, পুরোনো নথি আর কিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ ছবির টুকরো দেখা গেলো। এগুলো শুধু নথি নয়, ক্ষমতার আড়ালের নগ্ন সত্য, যেগুলো প্রকাশ পেলে অনেক মানুষ ভেঙে পড়বে, অনেক মুখোশ খুলে যাবে। কালো নেকাব ধীরে ধীরে একটা ফাইল হাতে তুললো, পড়তে শুরু করলো, চোখের দৃষ্টিতে ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছিল অদ্ভুত এক শীতলতা।
হঠাৎ বাইরে থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এলো, যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে। অন্ধকারে সে স্থির হয়ে গেলো, নিঃশ্বাসও টানছিল না। কয়েক সেকেন্ড পর দরজায় টোকা পড়লো তিনবার, নির্দিষ্ট ছন্দে, যেন এটা কোনো সংকেত। কালো নেকাব জানতো এই সংকেতের মানে—শত্রু এসে গেছে। সে দ্রুত ফাইলগুলো ব্যাগে ভরে নিলো, আরেকটি দরজা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু ঠিক তখনই কড়া আলো পড়লো তার চোখে। সামনে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে, তাদের হাতে অস্ত্র।
একজন গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘তুমি যেখানেই যাও, ছায়ার মতো আমরা থাকি। তুমি পালাতে পারবে না।’ কালো নেকাব শুধু ঠান্ডা হাসলো, যেন এই মুহূর্তও সে অনেক আগেই আঁচ করেছিল। পকেট থেকে ছোট একটি ধাতব বল বের করে মাটিতে ছুঁড়ে মারলো, সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়ার মেঘ ছড়িয়ে গেলো চারদিকে। কাশি আর চিৎকারের শব্দ ভেসে উঠলো। সেই অরাজকতার ভেতরেই ছায়ার মতো মিলিয়ে গেলো কালো নেকাব।
বাইরে এসে শহরের রাতের ভিড়ে সে হারিয়ে গেল। রিকশা, গাড়ি, মানুষের ভিড়—সবকিছুর ভেতর দিয়ে সে অদৃশ্য হয়ে গেল, যেন ছিলই না। তার হাতে ধরা ফাইলের ভেতরের তথ্যগুলো এখন ঢাকার অদৃশ্য রক্তক্ষরণ শুরু করবে। রাজনীতির অন্ধকার, ব্যবসার নোংরা চুক্তি আর কিছু নাম—যাদের প্রকাশ মানে ভয়ংকর বিস্ফোরণ।
দূরে কোথাও ঘণ্টাধ্বনি বাজছিল, যেন সময়ের কণ্ঠস্বর সতর্ক করছে—এটাই শুধু শুরু, অন্ধকারের গভীরে যে খেলা চলছে তার নাম কেউ জানে না, কিন্তু সবাই ভয়ে ফিসফিস করে বলে—কালো নেকাব।
ঢাকার রাত যেন হঠাৎই ভারী হয়ে উঠলো। ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে মিলিয়ে যাওয়া কালো নেকাব এখন পুরোনো শহরের গলিপথে একা হাঁটছিল। হাতে ধরা ব্যাগটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে রেখেছিল। যেন ব্যাগের ভেতরের ফাইলগুলোই তার শ্বাস-প্রশ্বাসের উৎস। চারদিকে লোহার দোকানগুলোর ঝাপ পড়া, দেওয়ালে পুরোনো পোস্টারের ছেঁড়া কাগজ বাতাসে উড়ছে। তবু তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি দেওয়ালের আড়ালে, প্রতিটি জানালার ফাঁক দিয়ে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে জানে এই ফাইলগুলোর ভেতরে যাদের নাম আছে; তাদের মধ্যে একজন শুধু রাজনীতিবিদ নয়। সে ক্ষমতার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদৃশ্য হাত। যার নির্দেশে মানুষ নিখোঁজ হয়, যার ইশারায় বাজারে আগুন লাগে, যার কণ্ঠস্বর শোনা যায় না অথচ সবাই ভয় পায়। সেই হাতের রহস্য ভেদ করতেই কালো নেকাব এতদূর এগিয়েছে কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে মৃত্যু তার শিকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একটি পরিত্যক্ত ভবনের ছাদে উঠে এসে সে শ্বাস নিলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শহরের আলো নিচে ঝলমল করছে, অথচ তার চোখে এগুলো মৃত আগুনের মতো। ব্যাগ খুলে একটি ফাইল বের করলো, পাতাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো পরিচিত মুখ। একজন সাংবাদিকের নাম—রুবাইয়াৎ, যিনি তিন বছর আগে রহস্যজনকভাবে গুম হয়ে যান। ফাইলের ভেতরে লেখা ছিল, তার শেষ রিপোর্টে ছিল সরকারের ভেতরে গড়ে ওঠা গোপন নেটওয়ার্কের প্রমাণ। সেই রিপোর্টের কপি কোথাও জমা হয়নি কিন্তু ফাইলের টুকরোগুলোতে যা লেখা আছে, তা প্রকাশ পেলে শহরের শাসনব্যবস্থা কেঁপে উঠবে।
কালো নেকাব কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। হয়তো এই লড়াই তার একার নয়, যারা হারিয়ে গেছে, যাদের নীরবে গিলে ফেলা হয়েছে, তাদের আত্মার চিৎকারই তাকে টেনে এনেছে এখানে। কিন্তু একইসঙ্গে সে জানতো, এই ফাইল তার হাতে আসা মানে মৃত্যুর ছায়া আরও ঘন হয়ে নামা।
হঠাৎই মোবাইল কাঁপলো, স্ক্রিনে কোনো নাম নেই, শুধু এক লাইনের বার্তা—‘তুমি যা পেয়েছো, তার জন্য শহর তোমাকে ক্ষমা করবে না।’ বার্তাটা দেখে তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটলো, সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো, ‘আমি শহরে ক্ষমা চাইতে আসিনি, আমি এসেছি মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে।’
দূরে সাইরেন বাজতে শুরু করলো, হয়তো তার অবস্থান ফাঁস হয়ে গেছে। কালো নেকাব ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ছাদ থেকে নিচে নামতে শুরু করলো, কিন্তু তার মনের ভেতরে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—এই অন্ধকার খেলার আসল পরিচালক কে? আর রুবাইয়াৎ কোথায় হারিয়ে গেল? সে কি আসলেই মারা গেছে, নাকি অদৃশ্য কোনো কারাগারে আটকে আছে?
উত্তর এখনো লুকিয়ে আছে ফাইলের গভীরে, কিন্তু প্রতিটি পাতার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠছে মৃত্যুর সম্ভাবনা। তবু সে জানতো, পিছিয়ে আসার কোনো পথ নেই। কালো নেকাব যতই এগিয়ে যাবে; সত্য ততই রক্তাক্ত হয়ে উঠবে।
রাত ক্রমে গভীর হচ্ছে, শহরের বাতি যেন একে একে নিভে যাচ্ছে। কালো নেকাব সেই ব্যস্ত রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিল আর তার হাতে থাকা ফাইলের পাতা ওল্টানোর প্রতিটি শব্দ যেন নিঃশব্দে ঘন অন্ধকারকে ছেদ করছে। ব্যাগের ভেতরে লুকানো তথ্যগুলো শুধু ঝলসে ওঠা কাগজ নয় বরং শহরের অন্ধকারের রক্তমাখা ইতিহাস। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, পুলিশ—সবাই এই নেকাবের চোখের সামনে নগ্ন।
হঠাৎ একটি অচেনা ফোন কল—কণ্ঠটি জানতোই না কিন্তু ভয়ংকর সুনীতির সঙ্গে বলল, ‘ফাইলটা তুমি পেলে, আমরা কিছুই করবো না। তবে তুমি আর ফিরে আসবে না।’ কালো নেকাব শুধু থমকে দাঁড়ালো। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই কণ্ঠ যেন অদৃশ্য দুনিয়ার প্রেরিত এক হত্যার বার্তা। সে ফোন রাখলো, কিন্তু মনে মনে ঠিক করলো, তাকে ভয় দেখানো যাবে না। সেই কণ্ঠই হয়তো শহরের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু কিন্তু কালো নেকাব তার জন্য প্রস্তুত।
ফিরে তাকিয়ে সে এক অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করলো, যেখানে শুধু ধূলি আর বিষণ্নতা। এখানে মানুষের পায়ের আওয়াজও মিলিয়ে যায়। আরেকটু এগোলেই সে দেখতে পেলো একটি ছোট ঘর, যেখানে একটি চূড়ান্ত ফাইলের কপি রাখা। সেই কপি হলো রুবাইয়াতের রিপোর্টের মূল। কালো নেকাব জানলো, এখানেই শেষ লড়াই।
ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই একদল লোক ঘিরে ধরলো। তবে এবার সে একা ছিল না, তার পেছনে অচেনা ছায়ার মতো কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল—যারা শহরের সত্যকে প্রকাশ করার জন্য লড়াই করছিল। মুহূর্তের জন্য লড়াই থেমে গেল। তারপর শুরু হলো এক ভয়ংকর সংঘর্ষ। ধোঁয়া, চিৎকার, লাঠি আর ছুরি—সব মিলিয়ে এক জটিল নৃত্য। কালো নেকাবের দক্ষতা, অদ্ভুত গতিশীলতা এবং নিখুঁত পরিকল্পনা তাকে এগিয়ে নিয়ে গেলো।
শেষ মুহূর্তে, যখন সব প্রতিদ্বন্দ্বী মাটিতে পড়ে গেছে, কালো নেকাব ফাইল হাতে বেরিয়ে এলো। সে জানতো, এখন সময় এসেছে সত্য প্রকাশের। রাতের অন্ধকারে হঠাৎ সংবাদমাধ্যমে ফাইলের তথ্য প্রকাশ পেলো—নাগরিকেরা অবাক, ক্ষমতার দখলদাররা কেঁপে উঠলো। শহর জাগ্রত হলো আর যারা বহু বছর নিঃশব্দে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছিল, তারা ভেঙে পড়লো।
কালো নেকাব আর দেখা দিলো না। কেউ জানে না সে কোথায় চলে গেছে। শুধু শহরের মানুষ ফিসফিস করে বলে—‘কালো নেকাব এসেছিল, অন্ধকারের মুখোশ খুলে দিয়ে গেছে।’ রুবাইয়াৎ বেঁচে ছিল, অদৃশ্য কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল আর শহর নতুন দিনের আলো দেখলো—ভয়ংকর সত্য জানার পর মানুষের চোখে জ্বলে উঠলো সচেতনতার আগুন।
এসইউ/জিকেএস