পদ্মার চরে স্বাস্থ্যসেবায় চরম দুর্ভোগ, প্রসূতির সন্তান জন্ম নিল নৌকায়

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক। উপজেলার বিচ্ছিন্ন চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি চরাঞ্চল- আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরে প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস। কোনো সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগ ও জীবনঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরে কেউ অসুস্থ হলে একমাত্র ভরসা হাতুড়ে বা গ্রাম্য চিকিৎসক। জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রসূতি মা কিংবা বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অথবা ৮০ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়। তবে নদী ও দুর্গম চর পাড়ি দিয়ে এই দীর্ঘ পথ যাতায়াত মোটেও সহজ নয়। বর্ষা মৌসুমে কোনোমতে নৌকায় যাতায়াত করা গেলেও, শুষ্ক মৌসুমে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুচর হেঁটে পার হয়ে তবেই নৌকার দেখা মেলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একাধিক স্থানে টোল ও অতিরিক্ত নৌকা ভাড়ার আর্থিক সংকট। চরবাসীরা জানান, মাঝরাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো পরিবারকে চরম আ

পদ্মার চরে স্বাস্থ্যসেবায় চরম দুর্ভোগ, প্রসূতির সন্তান জন্ম নিল নৌকায়
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক। উপজেলার বিচ্ছিন্ন চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি চরাঞ্চল- আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরে প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস। কোনো সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগ ও জীবনঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরে কেউ অসুস্থ হলে একমাত্র ভরসা হাতুড়ে বা গ্রাম্য চিকিৎসক। জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রসূতি মা কিংবা বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অথবা ৮০ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়। তবে নদী ও দুর্গম চর পাড়ি দিয়ে এই দীর্ঘ পথ যাতায়াত মোটেও সহজ নয়। বর্ষা মৌসুমে কোনোমতে নৌকায় যাতায়াত করা গেলেও, শুষ্ক মৌসুমে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুচর হেঁটে পার হয়ে তবেই নৌকার দেখা মেলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একাধিক স্থানে টোল ও অতিরিক্ত নৌকা ভাড়ার আর্থিক সংকট। চরবাসীরা জানান, মাঝরাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো পরিবারকে চরম আতঙ্কে থাকতে হয়। বিশেষ করে প্রসূতি নারী ও গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে। দিয়ারকাদিরপুর চরের বেল্লাল হোসেন চরের চিকিৎসা সংকটের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে জানান, সম্প্রতি এক রাতে মালেক আলী ব্যাপারীর মেয়ে সেলিনা বেগমের প্রসববেদনা ওঠে। গভীর রাতে স্বজনেরা কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তাকে কোলে করে কোনোমতে ঘাটে এনে নৌকায় তোলেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মাঝনদীতে নৌকাতেই তিনি সন্তান প্রসব করেন। প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় ওই প্রসূতির জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করায় অল্পের জন্য মা ও নবজাতক প্রাণে বেঁচে যান। আতারপাড়া চরের বাসিন্দা ছলেমান আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার বৃদ্ধ মা প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। রাতে কোনো সমস্যা হলে বুক ধড়ফড় করে। কখন নৌকা পাব, কীভাবে দুর্গম চর পার হব, কখন হাসপাতালে পৌঁছাব- এই চিন্তায় আমাদের ঘুম আসে না। অনেক সময় রোগী পথেই মারা যায়। চৌমাদিয়া চরের দিনমজুর সোহেল রানা বলেন, চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা শহরে যেতে যে টাকা খরচ হয়, তা অনেকের সাধ্যের বাইরে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা কম খরচে গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছেই যাই। চৌমাদিয়া চরের গ্রাম্য চিকিৎসক মাসুম মোল্লা চরের বাস্তব চিত্র স্বীকার করে বলেন, আমরা এখানে সাধারণ ও প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক কিংবা প্রসূতি জটিলতার মতো জরুরি ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার থাকে না। যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে অনেক সময় চোখের সামনেই রোগী মারা যায়। চকরাজাপুর ইউনিয়নের আতারপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান দর্জি বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা চরাঞ্চলে একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়ারকাদিরপুর- এই তিনটি ওয়ার্ডে প্রায় ৭৫০টি পরিবারে ৫ হাজার ৫০ জন মানুষের বসবাস। অথচ পুরো এলাকায় রয়েছে মাত্র একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নেই কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, চকরাজাপুর ইউনিয়নে আগে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছিল, যার একটি পদ্মার নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যটির কাজ চলমান রয়েছে। তবে চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়ারকাদিরপুর এলাকায় বর্তমানে কোনো সরকারি ক্লিনিক নেই। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া ক্লিনিকটি পুনঃস্থাপন এবং সেখানে একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow