পরিচয় সংকটের সমাজতত্ত্ব

একবিংশ শতাব্দীর এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থার দিকে নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করি, তবে দেখব আমাদের প্রতিদিনের যাপনে তিনটি সমান্তরাল ধারা—ধর্ম, সংস্কৃতি এবং আধুনিকতা—একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এক অদ্ভুত অথচ অনিবার্য টানাপড়েন তৈরি করছে। এই টানাপড়েন কেবল পোশাক-আশাক বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়, নৈতিক মানদণ্ড এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূলে আঘাত করছে। সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে এই বিবর্তনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশ যখন অতি দ্রুত কাঠামোগত উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করে, তখন তার চিরন্তন মূল্যবোধের সঙ্গে নতুন বিশ্বব্যবস্থার এক ধরনের সংঘাত তৈরি হয়, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় রূপান্তরকালীন সংকট হিসেবে অভিহিত করা যায়। বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ আজ ঠিক এই সংকটের এক তীব্রতম পর্যায় অতিক্রম করছে, যেখানে অতীতের ঐতিহ্য আর আগামীর আধুনিকতা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই সংঘাতটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের এক জটিল বহিঃপ্রকাশ। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম ওগবার্ন তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘সাংস্কৃতিক ব্যবধান’ বা ‘কালচারাল ল্যাগ’

পরিচয় সংকটের সমাজতত্ত্ব

একবিংশ শতাব্দীর এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থার দিকে নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করি, তবে দেখব আমাদের প্রতিদিনের যাপনে তিনটি সমান্তরাল ধারা—ধর্ম, সংস্কৃতি এবং আধুনিকতা—একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এক অদ্ভুত অথচ অনিবার্য টানাপড়েন তৈরি করছে। এই টানাপড়েন কেবল পোশাক-আশাক বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়, নৈতিক মানদণ্ড এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূলে আঘাত করছে। সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে এই বিবর্তনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশ যখন অতি দ্রুত কাঠামোগত উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করে, তখন তার চিরন্তন মূল্যবোধের সঙ্গে নতুন বিশ্বব্যবস্থার এক ধরনের সংঘাত তৈরি হয়, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় রূপান্তরকালীন সংকট হিসেবে অভিহিত করা যায়। বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ আজ ঠিক এই সংকটের এক তীব্রতম পর্যায় অতিক্রম করছে, যেখানে অতীতের ঐতিহ্য আর আগামীর আধুনিকতা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই সংঘাতটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের এক জটিল বহিঃপ্রকাশ।

সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম ওগবার্ন তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘সাংস্কৃতিক ব্যবধান’ বা ‘কালচারাল ল্যাগ’ তত্ত্বে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, একটি সমাজের বস্তুগত সংস্কৃতি যেভাবে রকেট গতিতে এগিয়ে যায়, অবস্তুগত সংস্কৃতি ঠিক সেভাবে তাল মেলাতে পারে না। আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বের সার্থকতা আজ প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের হাতে আজ অত্যাধুনিক স্মার্টফোন আছে, ঘরে ঘরে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছেছে, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা করছি, আমাদের অর্থনীতি ডিজিটাল হওয়ার পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। কিন্তু এই যে অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, এর সঙ্গে আমাদের মানসিকতা, বিশ্বাস এবং আচার-আচরণ কি সমান্তরালভাবে আধুনিক হতে পেরেছে? ওগবার্নের মতে, যখন বস্তুগত উন্নতি এবং মানসিক চেতনার মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়, তখন সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতা দেখা দেয়। বর্তমান বাংলাদেশে আমরা যে অসহিষ্ণুতা বা পরিচয়ের সংকট দেখি, তা মূলত এই সাংস্কৃতিক ব্যবধানেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। আমরা যন্ত্রের দিক থেকে আধুনিক হয়েছি, কিন্তু চেতনার গভীরে এখনো অনেক আদিম সংস্কার আঁকড়ে ধরে আছি, যা আমাদের এক ধরনের সামাজিক দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আধুনিকতা সম্পর্কে ধ্রুপদী সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের একটি শক্তিশালী ধারণা ছিল, যাকে তিনি ‘জগতের মোহমুক্তি’ বা ‘ডিসেনচ্যান্টমেন্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ওয়েবার মনে করেছিলেন, বিজ্ঞান ও যুক্তির অগ্রযাত্রার ফলে মানুষের জীবন থেকে অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস বা ধর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে এবং মানুষ প্রতিটি বিষয়কে কেবল যুক্তির মাপকাঠিতে বিচার করবে। তবে বর্তমান সমাজচিত্র ওয়েবারের এই ভবিষ্যধ্বনি নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ দেয়। আমরা দেখছি আধুনিকতা এবং প্রযুক্তি তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রতি ঝোঁক কমেনি, বরং এর বহিঃপ্রকাশের ধরন বদলেছে। আধুনিক মানুষ এখন প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে ধর্মের প্রচার করছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধর্মীয় বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। এখানে আধুনিকতা ধর্মকে বিসর্জন দেয়নি, বরং ধর্ম আধুনিকতাকে নিজের বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। এই যে ধর্ম ও আধুনিকতার সহাবস্থান, তা অনেক সময় সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে যখন আধুনিক জীবনবোধের উদারতা ধর্মের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার মুখোমুখি দাঁড়ায়। যুক্তিবাদ আমাদের আধুনিক বানাতে চায়, কিন্তু বিশ্বাস আমাদের ঐতিহ্যের শেকড়ে ধরে রাখতে চায়—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানেই বর্তমান প্রজন্মের বসবাস। এই শূন্যস্থানটি অনেক সময় চরমপন্থার জন্ম দেয়, যা সমাজের ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

এমিল ডুর্খেইম যখন ধর্মের সমাজতত্ত্ব নিয়ে লিখেছিলেন, তখন তিনি ধর্মকে দেখেছিলেন একটি ‘সামাজিক সংহতি’ বা ‘সোশ্যাল সলিডারিটি’র উৎস হিসেবে। ডুর্খেইমের মতে, ধর্ম মানুষকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে যা সমাজের ঐক্য বজায় রাখে। বর্তমান সময়ে যেখানে সমাজকাঠামো দ্রুত ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে, যেখানে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, সেখানে ধর্ম অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের পরিচয় এবং ঐক্যের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে যখন পশ্চিমা আধুনিকতা তার অমোঘ আকর্ষণ নিয়ে বাঙালির অন্দরমহলে হানা দেয়, তখন সেই সংহতিতে ফাটল ধরে। আধুনিকতা আমাদের শেখায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ—অর্থাৎ ‘আমিই সব’। অন্যদিকে ধর্ম ও আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আমাদের শেখায় ‘আমরা’ বা সামষ্টিকতা। এই ব্যক্তিবাদ বনাম সামষ্টিকতার লড়াইটিই হলো বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক টানাপড়েনের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষ একদিকে নিজের স্বাধীনতা চায়, অন্যদিকে একাকিত্বের ভয়ে আবার সেই পুরোনো গোষ্ঠীবদ্ধতার কাছে ফিরে যেতে চায়। এই দ্বন্দ্বই আমাদের পরিবারগুলোতে প্রজন্মের ব্যবধান বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ধর্ম আমাদের দেয় নৈতিক কাঠামো, সংস্কৃতি দেয় আত্মার পরিচয় আর আধুনিকতা দেয় এগিয়ে যাওয়ার পথ। এই তিনের মধ্যে কোনো একটিকে বাদ দিয়ে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ কল্পনা করতে পারি না। বর্তমানের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত জীবনদর্শন, যেখানে বিজ্ঞানের যুক্তি থাকবে, ধর্মের শাশ্বত নৈতিকতা থাকবে এবং বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতি থাকবে। যখন আমরা বুঝতে পারব যে আইফোন হাতে নিয়ে রোবটিক্স চর্চা করার পাশাপাশি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে নবান্ন পালন করা কিংবা প্রার্থনাগৃহে গিয়ে পরম সত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করা পরস্পরবিরোধী কোনো কাজ নয়, বরং এটাই আমাদের সমৃদ্ধ জীবনের বহিঃপ্রকাশ—সেদিন এই টানাপড়েনের অবসান ঘটবে।

সংস্কৃতি একটি প্রবহমান নদীর মতো হলেও আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা এক সংকীর্ণ খালের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য—নবান্ন, পহেলা বৈশাখ, বাউল গান আর লোকগাথা—অন্যদিকে আকাশ সংস্কৃতির অবারিত দ্বার দিয়ে আসা বৈশ্বিক পণ্যমুখী সংস্কৃতি। সমাজবিজ্ঞানী জর্জ রিটজার একে ‘ম্যাকডোনালাইজেশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। রিটজারের মতে, বিশ্বায়নের ফলে সারা বিশ্বের সংস্কৃতি আজ একই ছাঁচে ঢালাই হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ যখন বৈশ্বিক পপ-কালচার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কৃত্রিম দুনিয়ায় মগ্ন, তখন তারা নিজেদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ‘এলিয়েনেশন’ তাদের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করছে, যা তারা পূরণ করার চেষ্টা করছে হয় উগ্র আধুনিকতা দিয়ে, না হয় ধর্মের একপাক্ষিক ব্যাখ্যা দিয়ে। ফলে সংস্কৃতির যে উদার রূপটি একসময় বাঙালির পরিচয় ছিল, তা আজ কোণঠাসা। আমরা যখন নিজের উৎসব ভুলে বিজাতীয় উৎসবের মোহে আচ্ছন্ন হই, তখন সমাজতাত্ত্বিকভাবে আমরা একটি ‘পরিচয়হীন জাতি’তে পরিণত হওয়ার পথে থাকি, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সার্বভৌমত্বকেও দুর্বল করতে পারে।

এই টানাপড়েনের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো সমাজবিজ্ঞানী এরভিং গফম্যানের ‘ড্রামাটার্জি’ বা জীবনকে একটি রঙ্গমঞ্চ হিসেবে দেখার তত্ত্ব। গফম্যানের মতে, মানুষ সমাজের সামনে একটি নির্দিষ্ট মুখচ্ছবি বা ‘ফ্রন্ট স্টেজ’ বজায় রাখে। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া চালিত এই সমাজে এই মুখচ্ছবি বজায় রাখার লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন নাগরিক ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন, কিন্তু পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়তো অত্যন্ত রক্ষণশীল ও প্রথাগত। এই যে দ্বৈত জীবন যাপন, তা মানুষের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মানুষ নিজের প্রোফাইলে ধর্মীয় উদ্ধৃতি দিচ্ছে অথচ ব্যক্তিগত জীবনে সেই নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না। আধুনিকতা যখন কেবল লোক-দেখানো আচারে পরিণত হয় এবং ধর্ম যখন কেবল পরিচয়ের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সংস্কৃতির যে অন্তঃসারশূন্যতা তৈরি হয়, তার ভার বহন করতে হচ্ছে পুরো সমাজকে। এই কৃত্রিমতা আমাদের আন্তরিকতাকে হরণ করে এক যান্ত্রিক সমাজে পরিণত করছে, যেখানে সহমর্মিতার চেয়ে প্রদর্শনপ্রিয়তা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জিগমুন্ট বাউমান তাঁর ‘লিকুইড মডার্নিটি’ বা ‘তরল আধুনিকতা’ তত্ত্বে বলেছিলেন যে, আধুনিক যুগে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়—সবকিছুই পরিবর্তনশীল এবং অস্থির। আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা ঠিক এই তরল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সম্পর্ক, কর্মসংস্থান, এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসও এখন আগের মতো অটল নেই। এই অস্থিরতা মানুষকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যখন সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষ তার আদি পরিচয় বা ধর্মের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে স্থায়িত্বের সন্ধানে। ফলে আধুনিকতা মানুষকে মুক্তি দেওয়ার কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত মানুষ এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংকটে ভুগছে। এই সংকটের সমাধান হিসেবে ধর্মের উগ্র প্রকাশ অনেক সময় কাম্য মনে হয় অনেকের কাছে, যা আদতে সমাজতাত্ত্বিক বিচারে এক ধরনের পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। আধুনিক জীবনের এই গতিশীলতা মানুষের মনে এক ধরনের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করছে, যেখানে মানুষ আধুনিক হতে ভয় পায় পাছে সে তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। এই ভয় থেকেই জন্ম নেয় অসহিষ্ণুতা, যা আজ আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে প্রকট।

নারীর অবস্থান ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি এই টানাপড়েনে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বর্তমান সময়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে, শিক্ষা থেকে শুরু করে রাজনীতি—সবখানেই নারী তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে। এটি আধুনিকতার এক সফল ফল। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক বিচারে পিতৃতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব এখনো পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেনি। কর্মজীবী নারী যখন ঘরে ফেরেন, তখন সমাজ তাঁর কাছে প্রাচীন গৃহবধূর ভূমিকা প্রত্যাশা করে। এখানে আধুনিক কর্মজীবন আর প্রথাগত সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে যে সংঘাত, তা নারীর জন্য এক বিশাল মানসিক চাপ তৈরি করছে। ধর্ম ও সংস্কৃতির নাম করে অনেক সময় এই আধুনিকায়নকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত লিঙ্গীয় বৈষম্যকে আরও উসকে দেয়। আধুনিকতা ও নারী অধিকারের এই দ্বৈরথ আমাদের সমসাময়িক সমাজের অন্যতম প্রধান একটি দর্পণ। এখানে আধুনিকতা নারী মুক্তি চায়, আর রক্ষণশীল সংস্কৃতি তাঁকে শৃঙ্খলে বাঁধতে চায়। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের মানসিকতায় এক বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

বিশ্বায়ন ও আধুনিকতা আমাদের অনেক কিছু দিলেও বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে আমাদের সামাজিক প্রশান্তি ও নৈতিক স্থিতিশীলতা। কার্ল মার্ক্স যখন বলেছিলেন যে ‘সবকিছুই বাষ্পীভূত হয়ে যায়’, তখন তিনি পুঁজিবাদের প্রভাবে পুরোনো ব্যবস্থার বিলুপ্তির কথা বলেছিলেন। বর্তমানে আমরা দেখছি আমাদের পুরোনো মূল্যবোধগুলো পুঁজিবাদের দাপটে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি উৎসব আজ উৎসবে সীমাবদ্ধ নেই, তা পণ্যে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি এখন কেবল বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। এই পণ্যনির্ভর আধুনিকতা মানুষের নৈতিকতাকে শিথিল করে দিচ্ছে। অন্যদিকে ধর্ম অনেক সময় এই অবক্ষয় রোধে বর্ম হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করলেও, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সমাজকে, তখন ধর্ম ও সংস্কৃতি কেবল কেনাবেচার সামগ্রীতে পরিণত হয়। আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো এখন আর আগের মতো দৃঢ় নেই, কারণ আমরা সবাই এখন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার শিকার।

সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এই সংঘাত থেকে উত্তরণের পথটি সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবারমাসের ‘কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন’ বা সংলাপধর্মী কার্যক্রমের মধ্যে নিহিত থাকতে পারে। হাবারমাস মনে করতেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যদি যৌক্তিক সংলাপ স্থাপিত হয়, তবে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমাদের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে চরম অসহিষ্ণুতা। আধুনিকতার অনুসারীরা মনে করছেন ধর্মীয় বিশ্বাস মানেই পিছিয়ে পড়া, আবার ধর্মীয় ভাবধারার মানুষ মনে করছেন আধুনিকতা মানেই ধর্মের বিনাশ। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে দেশের উন্নতির জন্য, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি হবে আমাদের ঐতিহ্য ও ধর্মের মানবিক শিক্ষা। আধুনিকতা মানেই পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং আধুনিকতা হলো নিজের সত্তাকে সমুন্নত রেখে বিশ্ব নাগরিক হওয়া। সংলাপের মাধ্যমে আমাদের এই ভুল বোঝাবুঝিগুলো দূর করা সম্ভব যদি আমরা পরমতসহিষ্ণু হতে শিখি।

বর্তমানের এই সমাজ কেবল একটি উন্নয়নশীল কাঠামো নয়, এটি একটি রূপান্তরের পরীক্ষাগার। এখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধুনিকতা প্রতিনিয়ত একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নতুন এক সামাজিক রূপ তৈরি করছে। এই রূপটি কি শেষ পর্যন্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ হবে নাকি এটি আরও বড় কোনো সংকটের জন্ম দেবে, তা নির্ভর করছে আমাদের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং নাগরিক সচেতনতার ওপর। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে এই টানাপড়েন অনিবার্য, কিন্তু এই সংঘাত যেন সামাজিক বিচ্ছেদে রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আধুনিকতার চাকচিক্য যেন আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদকে গ্রাস না করে এবং ধর্মের কঠোরতা যেন মানুষের সৃজনশীলতাকে গলা টিপে না ধরে—এই ভারসাম্যই হবে আমাদের আগামী দিনের পাথেয়। আমাদের আধুনিক হতে হবে মস্তিষ্কে, আর শেকড় থাকতে হবে হৃদয়ে। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে আমরা এক আত্মপরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হব, যা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার নামান্তর।

একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত হলো তার নাগরিকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক স্পষ্টতা এবং ধর্মীয় সহনশীলতা বজায় রাখা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিক্ষা আরও সুসংহত করতে হবে। ধর্মকে কেবল আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার নৈতিক দর্শনের ওপর জোর দিতে হবে। যখন একজন তরুণ জানবে তার ঐতিহ্য তাকে ছোট করে না বরং তাকে একটি শক্ত ভিত্তি দেয়, তখন সে আধুনিকতাকে ভয় পাবে না বরং তাকে জয় করবে। আধুনিকতা তখন আর তার জন্য কোনো হুমকি হবে না, বরং তা হবে তার সৃজনশীলতার হাতিয়ার। আমাদের জাতীয় উৎসবগুলোকে কেবল কেনাকাটার উৎসবে পরিণত না করে সেগুলোর অন্তর্নিহিত মানবিক আবেদনকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তবেই আমাদের সংস্কৃতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এবং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার হাত থেকে সমাজ রক্ষা পাবে।

পরিশেষে বলা যায়, ধর্ম আমাদের দেয় নৈতিক কাঠামো, সংস্কৃতি দেয় আত্মার পরিচয় আর আধুনিকতা দেয় এগিয়ে যাওয়ার পথ। এই তিনের মধ্যে কোনো একটিকে বাদ দিয়ে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ কল্পনা করতে পারি না। বর্তমানের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত জীবনদর্শন, যেখানে বিজ্ঞানের যুক্তি থাকবে, ধর্মের শাশ্বত নৈতিকতা থাকবে এবং বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতি থাকবে। যখন আমরা বুঝতে পারব যে আইফোন হাতে নিয়ে রোবটিক্স চর্চা করার পাশাপাশি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে নবান্ন পালন করা কিংবা প্রার্থনাগৃহে গিয়ে পরম সত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করা পরস্পরবিরোধী কোনো কাজ নয়, বরং এটাই আমাদের সমৃদ্ধ জীবনের বহিঃপ্রকাশ—সেদিন এই টানাপড়েনের অবসান ঘটবে। আধুনিকতা হোক আমাদের প্রগতির সোপান, ধর্ম হোক আমাদের আলোর পথ এবং সংস্কৃতি হোক আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন। তবেই আমরা রূপান্তরের এই জটিল পথ সফলভাবে অতিক্রম করতে পারব। আমাদের ডানায় থাকবে আধুনিকতার শক্তি আর শেকড়ে থাকবে সংস্কৃতির গভীরতা—এই যুগলবন্দিই হবে আমাদের আগামীর জয়গান।

লেখক: সমাজবিজ্ঞান ও উন্নয়ন বিষয়ক কলাম লেখক ও গবেষক।

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow