পরিশ্রান্ত শরীর চায় ঘুম, মশা আর দূষণের সঙ্গে সহাবস্থান তাদের

  রাজধানীর ব্যস্ততম জলপথের প্রবেশদ্বার ‘সদরঘাট’। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সদরঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দরও। দিনে এখানে মানুষের ঢল নামে, ভিড় জমে হাজারো যাত্রী আর নৌযানের। কিন্তু রাত নামলেই এই চেনা দৃশ্য পাল্টে যায়। কোলাহল থেমে গেলে উন্মোচিত হয় আরেকটি নীরব বাস্তবতা একটি অদৃশ্য শহর, যেখানে বসবাস করেন খেয়া নৌকার মাঝিরা। যাত্রী পারাপারের তীব্র ব্যস্ততায় দিন কাটানো সেসব জীবনগুলোর সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। ঘুম, যা বিলাসিতা নয় অস্তিত্বের শর্ত সদরঘাটের অধিকাংশ মাঝির স্থায়ী বসতি ঢাকার বাইরে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখে, জীবিকার তাগিদে তারা রাজধানীতে এলেও এখানে তাদের কোনো স্থায়ী আশ্রয় গড়ে ওঠে না। কারণ একটাই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। নগরের উচ্চ ব্যয় তাদের নাগালের বাইরে। ফলে নৌকাই হয়ে ওঠে তাদের বাসস্থান। সেখানেই খাওয়া, বিশ্রাম সবকিছু। ঢাকায় একটি সাধারণ বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ-পানি ও দৈনন্দিন খরচ মেটানো তাদের আয় দিয়ে প্রায় অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে নৌকাকেই তারা বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। নৌকার পাটাতনই তাদের বিছানা, আকাশই

পরিশ্রান্ত শরীর চায় ঘুম, মশা আর দূষণের সঙ্গে সহাবস্থান তাদের

 

রাজধানীর ব্যস্ততম জলপথের প্রবেশদ্বার ‘সদরঘাট’। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সদরঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দরও। দিনে এখানে মানুষের ঢল নামে, ভিড় জমে হাজারো যাত্রী আর নৌযানের। কিন্তু রাত নামলেই এই চেনা দৃশ্য পাল্টে যায়। কোলাহল থেমে গেলে উন্মোচিত হয় আরেকটি নীরব বাস্তবতা একটি অদৃশ্য শহর, যেখানে বসবাস করেন খেয়া নৌকার মাঝিরা। যাত্রী পারাপারের তীব্র ব্যস্ততায় দিন কাটানো সেসব জীবনগুলোর সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে।

ঘুম, যা বিলাসিতা নয় অস্তিত্বের শর্ত

সদরঘাটের অধিকাংশ মাঝির স্থায়ী বসতি ঢাকার বাইরে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখে, জীবিকার তাগিদে তারা রাজধানীতে এলেও এখানে তাদের কোনো স্থায়ী আশ্রয় গড়ে ওঠে না। কারণ একটাই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। নগরের উচ্চ ব্যয় তাদের নাগালের বাইরে। ফলে নৌকাই হয়ে ওঠে তাদের বাসস্থান। সেখানেই খাওয়া, বিশ্রাম সবকিছু।

jagonewsঢাকায় একটি সাধারণ বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ-পানি ও দৈনন্দিন খরচ মেটানো তাদের আয় দিয়ে প্রায় অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে নৌকাকেই তারা বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। নৌকার পাটাতনই তাদের বিছানা, আকাশই ছাদ। নৌকার পাটাতনেই তারা ঘুমায়। সদরঘাটের নৌকায় এভাবে বসবাস করা মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদরঘাটের মাঝিদের ঘুমানো রুটিনটা স্বাভাবিকত সমাজের আর দশজনের মতো হয় না। মাঝিদের মধ্যে কেউ কেউ রাতভর নৌকা চালান, আবার কেউ কেউ চালান শুধু দিনের বেলায়। যারা রাতভর নৌকা চালান, তারা ফজরের আযানের পরে সাধারণত ঘুমাতে যান। আবার কেউ নৌকা চালানো শুরু করেন ফজরের পর থেকে।

দিনভর মানুষ পারাপারের পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাঝিরা ফিরে যান না কোনো ঘরে। নদীর পাড়ে কিংবা পল্টনের কাছে কোনো পিলারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে নৌকা বেঁধে, সেখানেই তারা শরীর এলিয়ে দেন। এই ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্যতামূলক এক বিশ্রাম। নৌকা যেন ভেসে না যায়, সেজন্য মাঝিরা দড়ি দিয়ে পিলার বা ঘাটের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। তারপর সেখানেই শুয়ে পড়েন। কোনো নিরাপত্তা ছাড়া, থাকে না ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও।

মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার ব্যস্ততার মধ্যে তারা গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান। এই ঘুমও স্বস্তির নয়, আরামদায়ক নয়। খোলা আকাশের নিচে, গন্ধ আর অনিরাপত্তার মধ্যে কাটানো সময়। নদীর ঢেউ, লঞ্চের শব্দ, হর্ন, মানুষের আনাগোনা সব মিলিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ঘুম তাদের জন্য বিলাসিতা।

মাঝি শরফুদ্দিন পিন্টু বলেন, ‘দিন শেষে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। দুই বেলা রাস্তার পাশের সস্তা হোটেল থেকে খাই। মলত্যাগের জন্য পাবলিক টয়লেট বা লঞ্চের টয়লেট ব্যবহার করি। কিন্তু ঘুমানোর আলাদা কোনো জায়গা নেই। নৌকার ওপরই শুয়ে পড়ি। শুরুতে কষ্ট হতো, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে শরীর ক্লান্ত থাকলে পাটাতনেই ঘুম চলে আসে।’

মশা আর দূষণের সঙ্গে সহাবস্থান

বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দীর্ঘদিন ধরেই দূষণের জন্য সমালোচিত। নদীর চারপাশে জমে থাকা শিল্পবর্জ্য, নর্দমার পানি এবং আবর্জনা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই পরিবেশেই দিন-রাত কাটাতে হয় মাঝিদের।

সবচেয়ে বড় ভোগান্তির একটি হলো মশার উপদ্রব। নদীর পানি দূষিত, আশপাশে জমে থাকা আবর্জনা আর নর্দমার কারণে মশার উপদ্রব এখানে ভয়াবহ। রাতে এই মশার আক্রমণ মাঝিদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ। মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে যায় বারবার। তবুও কোনো প্রতিকার নেই। অনেক মাঝি জানান, মশার কয়েল বা ওষুধ ব্যবহারের সামর্থ্যও সবসময় থাকে না।

jagonews

ঝালকাঠির বাসিন্দা মাঝি হেমায়েত মিয়া বলেন, ‘গ্রামে পরিবার রেখে এখানে কাজ করি। ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা চলে। এর মধ্যে ঢাকায় বাসা ভাড়া রাখলে চলা সম্ভব হবে না। তাই নৌকাতেই থাকতে হয়, বাধ্য হয়ে নৌকায় ঘুমাই। ঝড়-বৃষ্টি, মশা-মাছি, রোদ-শব্দ-গন্ধ-নানা কারণে কষ্ট পাই। সব সহ্য করেই দিন পার করি। এগুলোই আমাদের নিয়তি। মেনে না নিয়ে উপায় নাই।’

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক চিন্ময় দাস বলেন, ‘এই ধরনের পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাস করলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, ত্বকের রোগ, জ্বর, ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও কমে যায়।’

স্বল্প আয়ে দীর্ঘ শ্রমঘণ্টার জীবন

খেয়া পারাপারের এই কাজটি পুরোপুরি নির্ভর করে যাত্রীর ওপর। কোনো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নেই। প্রতিদিনের আয় নির্ভর করে যাত্রী সংখ্যা, আবহাওয়া এবং মৌসুমের ওপর। অনেক মাঝি জানান, গড়ে দিনে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মতো আয় হয়, যা দিয়ে নিজের খরচ চালিয়ে পরিবারে টাকা পাঠানোই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেও তারা সঞ্চয় করতে পারেন না। দিনের শেষে সামান্য খাবার আর কয়েক ঘণ্টার বিশ্রামই তাদের প্রাপ্তি।

মানবিক দৃষ্টিকোণ: অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি কোথায়?

সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কার ফোরাম-এর ঢাকা মহানগর সমন্বয়ক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘নগরের এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত। তারা পরিবহন ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ, কিন্তু তাদের জন্য নেই কোনো আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা বা নিরাপত্তা কাঠামো। এটি পরিকল্পনার বড় ঘাটতি।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বল্পমূল্যের ডরমিটরি, বিশ্রামাগার এবং স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই মানুষগুলোর জীবনমান অনেকটাই উন্নত হতে পারে।’

যাত্রীদের উপলব্ধি

প্রতিদিন বুড়িগঙ্গা পার হওয়া যাত্রী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুধু নৌকায় উঠি-নামি, কিন্তু মাঝিদের জীবনটা দেখি না। তারা কীভাবে থাকে, কীভাবে ঘুমায় এসব জানলে সত্যিই খারাপ লাগে। তাদের জন্য অন্তত একটা নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা দরকার।’

jagonews

সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি

ঝালকাঠির মাঝি আরিফুল হক বলেন, ‘গ্রামে পরিবার আছে। তাদের জন্যই এখানে থাকি। আয় কম, খরচ বেশি। বাসা ভাড়া নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। তাই নৌকাই আমাদের সব। কষ্ট আছে, কিন্তু কিছু করার নেই।’

এই ‘কিছু করার নেই’ বাক্যটিই যেন সদরঘাটের মাঝিদের জীবনের সারাংশ। প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তারা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন।

সমাধানের পথ কোথায়?

সদরঘাটের মাঝিদের জীবন এক ধরনের অদৃশ্য বাস্তবতা যা নগরের কোলাহলের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। অথচ এই মানুষগুলোর শ্রমেই প্রতিদিন হাজারো মানুষ নদী পার হয়, শহরের গতি সচল থাকে।

নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই শ্রমজীবী মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন, নিরাপদ বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, তাদের এই মানবেতর জীবনযাপন কেবল একটি শ্রেণির কষ্ট নয় বরং পুরো নগর ব্যবস্থার বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। তবে কিছু বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে-

  • ঘাট এলাকায় শ্রমজীবীদের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন বা ডরমিটরি নির্মাণ
  • নিরাপদ পানীয় জল ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা
  • নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ
  • মাঝিদের জন্য নিবন্ধন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু

সদরঘাটের মাঝিরা এই শহরের অদৃশ্য চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমে প্রতিদিন সচল থাকে নদীপথের যোগাযোগ। অথচ তাদের নিজেদের জীবন অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনায় ভরা। নগরের আলো যখন নিভে আসে, তখনো তারা জেগে থাকেন কখনো বৈঠা হাতে, কখনো নৌকার পাটাতনে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে। অন্ধকারে নৌকার পাটাতনে ঘুমিয়ে থাকা মাঝিদের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয় এই শহরে কিছু মানুষের রাত এখনো আলোকিত হয়নি। এই মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন শুধু দায়িত্ব নয়, মানবিকতারও দাবি।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow