বৈশাখের আগমনে চট্টগ্রাম নগরীরতে চলছে পাচন, ইলিশ ও নাড়ুর রমরমা বিকিকিনি। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে আনা হয় পাচনের এসব উপকরণ। নগরীর হাজারী লেইন, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাজীর দেউড়ি কাঁচাবাজার, বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার, কর্ণফুলী মার্কেট, সিরাজদৌল্লা সড়ক, আসকার দিঘী সড়ক, বকশিরহাট, চকবাজারসহ অলি-গলিতে ভ্যান গাড়িতে এসব পাচনের উপকরণ বিক্রি করা হচ্ছে।
পাচনের সবজির মধ্যে রয়েছে- কাট্টইস, তারা, ডুমুর, কাঞ্জল (কলাগাছের ভেতরের কাণ্ড), সজনে ডাটা, ছোট বেগুন, কলার মোচা, কাঁচা কাঠাল, কাঁচা পেঁপে, কাঁচকলা, কুমড়া, পটল, করলা, চালকুমড়া, গিমা শাক, আলু, লাউ প্রভৃতি। হাজারি লেইনে সব মিলিয়ে এক কেজি সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা ও তদূর্ধ্ব দামে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সনাতনী আচার মতে, সোমবার (১৩ এপ্রিল) ফুল বিউতে বিউফুলের মালা গেঁথে নিমপাতাসহ ঘরের দরজার ওপরে টাঙিয়ে দেওয়া হয়। চর্মরোগের জন্য উপকারী নিমপাতা সংগ্রহে রাখা হয় দীর্ঘদিন। গ্রামাঞ্চলে রোগ-জীবাণু নাশে পানিতে গোবর মিশিয়ে উঠোনে ছিটিয়ে দেওয়া হয়, ভাঁটফুল দিয়ে সাজানো হয় দরজা-জানালা। এসময়ে তিনদিন ভোর ও সন্ধ্যায় (পহেলা বৈশাখের ভোরবেলা পর্যন্ত) বুনো লতাগুল্ম পুড়িয়ে তার ধোঁয়া শরীরে লাগানো হয়, যার নাম ‘জাগ দেয়া’।
সাজু ঘোষ বলেন, ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, সবাইকে পাচন খেতে হয়। ১৮টি মতান্তরে ১০৮টি সবজি দিয়ে তৈরি হয় এই খাবার। একসময় শুধু হিন্দু পরিবারগুলোতে পাচন রান্নার চল থাকলেও বর্তমানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের পরিবারেও রান্না করা হয় ঔষধি গুণসম্পন্ন বিশেষ এই তরকারি।
মিঠুন বণিক বলেন, বলেন, নানান পদের সবজি দিয়ে তৈরি এই পাচন ঔষধি গুণসম্পন্ন। সারা বছর মাছ-মাংসের কারণে পাতে সবজিই ওঠে না অনেক পরিবারে। এই সময়টাতে অন্তত ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, সবাইকে পাচন খেতে হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাজারী লেইন, দেওয়ানজী পুকুর পাড়, হেমসেন লেইনসহ কাঁচাবাজারগুলোতে নিমপাতা ও হারগোজা (বিউ) ফুল একশ গ্রাম ৮০ টাকা, কনডেন্সড দুধের ছোট এক কৌটাভর্তি ফুল ৪০ টাকা, নিমপাতা এক আঁটি ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্দরকিল্লা এলাকায় ফুটপাতে বসে নিমপাতা ও ফুল বিক্রি রমরমা।
অপরদিকে, বকশিরহাটে নাড়ুর দোকানগুলোতেও চলছে বিকিকিনি। বাকলিয়া ও বলুয়ার দিঘির পাড় এলাকার কারখানায় তৈরি মোয়া-নাড়ু এখানকার দোকানগুলোতে মজুত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- খইয়ের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, জিরার নাড়ু, বরই নাড়ু, মুড়ি ও চিড়ার মোয়া, গুড় মেশানো খই, মুড়ি, চিড়া, তিলের নাড়ু, ঘস্যার টপি, বাদামের টফি, চানাচুর, মটর ভাজা, ছাতু (খইয়ের গুঁড়ো), বাতাসা ও আটকড়ই। আটকড়ইয়ে আছে মুড়ি, বুট, বাদাম, মিষ্টি জিরা, মিষ্টি কুমড়োর বিচি, শিম বিচি, মুগ বা খেসারি ডাল ও ভুট্টা। প্রতি প্যাকেট নাড়ু বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। আটকড়ই কেজি ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একসময় গ্রামে ঢেঁকিতে বানানো এসব নাড়ু এখন রেডিমেইড পাচ্ছেন নগরবাসী।
নগরীর কয়েকটি মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাঝারি আকারের ইলিশ কেজি ১ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, ৩০০ গ্রাম থেকে একটু বড় ইলিশ ৮শ-১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ থাকায় অনেকে যাচ্ছেন মাছের বাজারে।
কর্ণফুলী মার্কেটের মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, পহেলা বৈশাখে ইলিশের তেমন সরবরাহ নেই বললে চলে। ফিশারিঘাট থেকে আমরা মাছ কিনে এনে বিক্রি করি। সেখানে ইলিশের দাম চড়া। বড় ইলিশ মিললেও দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের সাথে তর্কাতর্কি হয়। তাছাড়া দাম একটু বেশি হওয়াতে বিক্রি কম।
বেপারী পাড়া বাজারে বাজার করতে আসা আফজাল হোসেন বলেন, স্ত্রী-সন্তানের আবদার মেটাতে ইলিশ কিনতে এসেছি। শহরে যখন গ্রামীণ সংস্কৃতি আসে, তখন তা অনেক সময় সামাজিক চাপও তৈরি করে।
এদিকে পহেলা বৈশাখে ভোর হতেই স্নান সেরে নতুন কাপড় পরিধান করে ব্যবসায়ী ও দোকানিরা ব্যস্ত থাকেন হালখাতা খোলার কাজে। লক্ষ্মী ও গণেশের পূজার্চনা শেষে হলুদ আর সিঁদুর মাখা মুদ্রার ছাপ দেওয়া হয় লাল শালুতে মুড়িয়ে রাখা নতুন হালখাতার প্রথম পৃষ্ঠায়। ‘ওঁ শ্রী গণেশায় নমঃ’ কিংবা স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা এই হিসেবের খাতাটাই নতুন বছরের আয় ও সমৃদ্ধির প্রতিভূ। ফুল, কলাগাছ, আম্রপল্লব দেওয়া, মঙ্গলঘট দিয়ে সাজানো, দোকানগুলোয় পরিচিত ও বাধা গ্রাহকদের জন্য মিষ্টিমুখের আয়োজনও চলে এদিন।
হাজারি গলির বণিক সমিতিতে চলছে বৈশাখের আমেজ। স্বর্ণের দোকান সেজেছে ভিন্ন সাজে। গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে পহেলা বৈশাখের নিমন্ত্রণ। স্বর্ণকার উজ্জল বণিক কালবেলাকে বলেন, বৈশাখে চৈত কাবারি হিসাব খোলা হয়। এদিন ক্রেতাদের ভিড় থাকে। আমরা তাদেরকে মিষ্টিমুখ করাই এবং ক্যালেন্ডার উপহার দেই। এদিন স্বর্ণের অর্ডার হয়ে থাকে। আবার স্বর্ণ ছাড়িয়ে নেন অনেকে।