পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে গতি পাচ্ছে জেআইটির অনুসন্ধান

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে গঠিত আন্তসংস্থা জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের (জেআইটি) কার্যক্রমে আবারও গতি আনা হচ্ছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে পাচার হওয়া সম্পদ সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি কমাতে জেআইটির কর্মকর্তাদের পূর্ণকালীন দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিটি যৌথ তদন্ত দলের জন্য পৃথক কক্ষ, কম্পিউটার, যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সূত্র জানায়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত জেআইটির অস্থায়ী কার্যালয়ে বসেই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ বিষয়ে সম্প্রতি কমিশনের সব মহাপরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠিয়েছে দুদকের মানি লন্ডারিং শাখা। এর মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আরও পড়ুন রিমান্ডে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ মিলেছে, অর্থপাচার মামলায় কারাগারে হরিদাস এ বিষয়ে গত ৭ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও সংশ্লিষ্ট

পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে গতি পাচ্ছে জেআইটির অনুসন্ধান

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে গঠিত আন্তসংস্থা জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের (জেআইটি) কার্যক্রমে আবারও গতি আনা হচ্ছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে পাচার হওয়া সম্পদ সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি কমাতে জেআইটির কর্মকর্তাদের পূর্ণকালীন দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিটি যৌথ তদন্ত দলের জন্য পৃথক কক্ষ, কম্পিউটার, যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সূত্র জানায়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত জেআইটির অস্থায়ী কার্যালয়ে বসেই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ বিষয়ে সম্প্রতি কমিশনের সব মহাপরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠিয়েছে দুদকের মানি লন্ডারিং শাখা। এর মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে গত ৭ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও সংশ্লিষ্ট চারটি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে জেআইটির কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেআইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে বসে অফিস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে জেআইটির বাইরে কোনো অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে আমরা সম্পদ পাচারসংক্রান্ত চলমান তদন্তের ওপরই পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারবো।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্য এবং দেশের শীর্ষ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে দুদকের নেতৃত্বে জেআইটি গঠন করা হয়। তবে গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের পর এর কার্যক্রম অনেকটাই ধীর হয়ে যায়।

এ বিষয়ে দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জেআইটি গঠনের সময়ই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এটি হবে সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড টিম। এর সদস্যরা অন্য কোনো অনুসন্ধানে যুক্ত থাকবেন না, যাতে তারা শুধু অর্থপাচার-সংক্রান্ত তদন্তেই পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ‘কথা ছিল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলো দেখবেন জেইটি কর্মকর্তারা, যা হয়নি। অনেক কর্মকর্তার কাছেই ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত আলাদা তদন্তের ফাইল আছে। ফলে জেআইটির অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।’

তাদের ভাষ্য, অর্থপাচারের মামলায় সামান্য বিলম্বও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তরা অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পদ অন্যের নামে হস্তান্তর, রূপান্তর বা বিদেশে সরিয়ে ফেলার সুযোগ পায়। এ কারণেই কর্মকর্তাদের অন্যান্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে পূর্ণকালীনভাবে জেআইটির তদন্তকাজে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে প্রতিটি যৌথ দলে দুদকের পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) কর্মকর্তারা রয়েছেন। পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

জেআইটির আওতায় বর্তমানে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অনুসন্ধান ও মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্তও রয়েছে। পাশাপাশি বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, এস আলম, সামিট, সিকদার, ওরিয়ন, নাবিল, নাসা, প্রিমিয়ার এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরামিট গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চলছে।

এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুস, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থপাচার এবং কর-শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করে ব্যবসা, বাড়ি ও ফ্ল্যাটে বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকটি অভিযোগে এরই মধ্যে মামলা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। পূর্বাচল প্লট বরাদ্দসংক্রান্ত ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। অন্যদিকে, সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছে। প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে। এছাড়া আরও ১৬টি নতুন মামলার প্রস্তুতি চলছে, যেখানে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবার এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর দেশে-বিদেশে মোট ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের আদেশে সংযুক্ত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে প্রায় ১৯ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ রয়েছে।

বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে আদালতের আদেশ কার্যকর করতে এরই মধ্যে ১৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। আরও প্রায় ১২টি অনুরোধ পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সম্ভাব্য অর্থপাচারের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং হংকংকে চিহ্নিত করেছে সরকার।

পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রম জোরদার করতে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউর অধীনে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, ২০২৫ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক অ্যান্টি-করাপশন কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের (আইএসিসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা প্রটোকল সইয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়ানো হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। দুদকের এখতিয়ারভুক্ত কোনো কাজই থেমে নেই।— দুর্নীতি দমন কমিশনের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিধি মেনেই তদন্তকারী কর্মকর্তারা কাজ করছেন। অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। দুদকের এখতিয়ারভুক্ত কোনো কাজই থেমে নেই।

এসএম/এমএএইচ/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow