পানির নিচে যাত্রীদের কয়েক মিনিটের সেই ভয়ংকর লড়াই

দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাসটি যখন মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল পদ্মায় তলিয়ে যায়, তখন ভেতরে থাকা অর্ধশতাধিক যাত্রীর জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল।  প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেঁচে ফেরা যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পানির নিচে সেই কয়েক মিনিট ছিল এক অবর্ণনীয় বিভীষিকা। কারও মুখে ছিল শেষবারের মতো সৃষ্টিকর্তার নাম, কারও কণ্ঠে প্রিয়জনকে ডাকার আকুতি— সবই এখন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে ঘাটের বাতাসে। টানা দুইদিনের উদ্ধার অভিযান শেষে শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালেও স্বজনহারা মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে রাজবাড়ীর আকাশ। তবে এই শোকের সমান্তরালে এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে একটি প্রশ্ন— এই অকালমৃত্যুর দায় কার? এটি কি কেবলই চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানো, নাকি বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনা আর নিরাপত্তা ঘাটতির নিষ্ঠুর পরিণতি? বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাস যখন নদীর ৪০-৫০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায়, তখন এর দরজার ওপর পানির প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই চাপ ঠেলে দরজা খোলা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভেতরটা রূপ নেয় লোহার খাঁচায়। পানি যখন হু-হু করে ভেতরে ঢুকছিল, তখন একে অপরের ওপর চড়ে শেষ নিঃশ্বাসটুকু নেওয়ার জন্য ছ

পানির নিচে যাত্রীদের কয়েক মিনিটের সেই ভয়ংকর লড়াই

দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাসটি যখন মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল পদ্মায় তলিয়ে যায়, তখন ভেতরে থাকা অর্ধশতাধিক যাত্রীর জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল। 

প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেঁচে ফেরা যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পানির নিচে সেই কয়েক মিনিট ছিল এক অবর্ণনীয় বিভীষিকা। কারও মুখে ছিল শেষবারের মতো সৃষ্টিকর্তার নাম, কারও কণ্ঠে প্রিয়জনকে ডাকার আকুতি— সবই এখন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে ঘাটের বাতাসে।

টানা দুইদিনের উদ্ধার অভিযান শেষে শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালেও স্বজনহারা মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে রাজবাড়ীর আকাশ। তবে এই শোকের সমান্তরালে এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে একটি প্রশ্ন— এই অকালমৃত্যুর দায় কার? এটি কি কেবলই চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানো, নাকি বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনা আর নিরাপত্তা ঘাটতির নিষ্ঠুর পরিণতি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাস যখন নদীর ৪০-৫০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায়, তখন এর দরজার ওপর পানির প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই চাপ ঠেলে দরজা খোলা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভেতরটা রূপ নেয় লোহার খাঁচায়। পানি যখন হু-হু করে ভেতরে ঢুকছিল, তখন একে অপরের ওপর চড়ে শেষ নিঃশ্বাসটুকু নেওয়ার জন্য ছটফট করেছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর অনেককেই দেখা গেছে একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকা অবস্থায়।

উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ যখন বাসটি টেনে তোলে, তখন ভেতর থেকে বের হয়ে আসে একের পর এক নিথর দেহ। ২৬ জন নিহতের মধ্যে ১১ জন নারী ও ৮ জন শিশু ছিল। 

ফায়ার সার্ভিসের একজন ডুবুরি আক্ষেপ করে জানান, ভেতরের দৃশ্য ছিল অসহনীয়। মা তার সন্তানকে বুকে চেপে ধরে ছিলেন— হয়তো শেষ মুহূর্তেও চেয়েছেন কলিজার টুকরাকে বাঁচাতে। 

দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন, রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়ক ভবানীপুর এলাকার রেহেনা আক্তার ও তার ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান, কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড মজমপুর গ্রামের মর্জিনা খাতুন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের রাজীব বিশ্বাস, রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা গ্রামের জহুরা অন্তি, একই মহল্লার কাজী সাইফ, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়া গ্রামের মর্জিনা আক্তার এবং তার মেয়ে সাফিয়া আক্তার, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের শিশুসন্তান ইস্রাফিল, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের সন্তান ফাইজ শাহানূর, রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা মহল্লার কে বি এম মুসাব্বিরের শিশুসন্তান তাজবিদ, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখোলা গ্রামের গাড়িচালক আরমান খান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দপুর ইউনিয়নের বেলগাছি গ্রামের নাজমিরা ওরফে জেসমিন, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের লিমা আক্তার, একই ইউনিয়নের চর বেনিনগর গ্রামের জ্যোৎস্না, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার আমতলী ইউনিয়নের নোয়াধা গ্রামের মুক্তা খানম, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মথুয়ারাই গ্রামের নাছিমা, ঢাকার আশুলিয়া উপজেলার বাগধুনিয়া পালপাড়া গ্রামের আয়েশা আক্তার, রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার শিশুসন্তান সোহা আক্তার, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সমসপুর ইউনিয়নের গিয়াস উদ্দিনের শিশুসন্তান আয়েশা সিদ্দিকা, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের শিশুসন্তান আরমান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের শিশুসন্তান আব্দুর রহমান এবং রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশি ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের শিশুসন্তান সাবিত হাসান, উজ্জ্বল নামে এক ফল ব্যবসায়ী, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন এবং একই উপজেলার চর মদাপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম।

রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, এখনও নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। ডুবুরি দল, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করছে। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে গাড়িটি দ্রুতগতিতে ছুটে নদীতে পড়ে যায়। তবে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। 

বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ দাবি করেন, বাসটির ব্রেক ফেল করায় চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এখন থেকে বাসে যাত্রী নিয়ে সরাসরি ফেরিতে ওঠা নিষিদ্ধ করা হবে। চালক একা গাড়ি তুলবেন এবং যাত্রীরা হেঁটে ফেরিতে উঠবেন। পাশাপাশি পন্টুনে উঁচু রেলিং স্থাপন ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সরকার এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান জানান, নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার কাজ করবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow