পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। আর অনেকেই মনে করেন, পান্তা-ইলিশ ছাড়া জমে না এ দিনের উদযাপন। পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ—এই ধারণাটি মূলত আশির দশকের শেষের দিকে ঢাকা শহরকেন্দ্রিক একটি আধুনিক রীতি হিসেবে শুরু হয়। তবে বাঙালির হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্যে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
বরং বাঙালির কৃষিভিত্তিক সমাজ ও ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পহেলা বৈশাখের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস ছিল আরও বৈচিত্র্যময় ও স্বাস্থ্যসম্মত। পান্তা-ইলিশের বাইরেও বৈশাখ উদযাপনে ভিন্নধর্মী ও সাশ্রয়ী অনেক খাবারের আয়োজন করা সম্ভব।
ভর্তা-ভাতের বৈচিত্র্য: বাঙালির রসনাবিলাসে ভর্তা এক অনন্য শিল্প। আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা এবং ডাল ভর্তার মতো চিরচেনা সব আয়োজন পান্তা ভাতের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে মাখানো এসব ভর্তা নববর্ষের ভোরে বাঙালির ঘরে ঘরে জনপ্রিয়।
পান্তা ভাতের স্নিগ্ধতার সঙ্গে যখন সরিষার তেলের কড়া ঝাঁজ মেশানো ভর্তা যুক্ত হয়, তখন তা সাধারণ খাবারকে অসাধারণ করে তোলে। আলু ভর্তার চিরায়ত স্বাদের পাশাপাশি পোড়া বেগুনের স্মোকি ফ্লেভার নববর্ষের সকালে ভিন্ন আমেজ আনে। শুঁটকি ভর্তার ক্ষেত্রে চ্যাপা বা লইট্টা শুঁটকিকে কড়া করে ভেজে প্রচুর পেঁয়াজ ও শুকনো মরিচ দিয়ে তৈরি করা হয়, যা স্বাদে যোগ করে তীব্রতা। এছাড়া ডাল ভর্তাকে আরও মুখরোচক করতে তাতে ধনেপাতা ও কুঁচো চিংড়ি মেশানোর প্রচলন রয়েছে।
ভিন্ন মাছের আয়োজন: বর্তমানে ইলিশের চড়া দাম এবং মৌসুম না হওয়ায় বাজারের সরবরাহেও রয়েছে সংকট। এক্ষেত্রে পান্তার সঙ্গী হিসেবে নদ-নদীর দেশি মাছ এক চমৎকার বিকল্প। কড়া করে ভাজা রুই বা কাতল মাছ পান্তা ভাতের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়।
এছাড়া পাবদা বা টেংরা মাছের চচ্চড়ি, কিংবা হালকা মশলায় ভাজা কোরাল ও পাঙাশ মাছও বৈশাখী থালায় আধুনিকতার ছোঁয়া দিচ্ছে। অনেক পরিবারে ইলিশের বদলে শোল মাছ পুড়িয়ে বা বোয়াল মাছের ভুনা দিয়ে পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত এবং সাশ্রয়ী।
ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি ও মিষ্টি: নববর্ষের আপ্যায়নে বাতাসা, কদমা, খই, মুড়কি এবং বিভিন্ন ধরণের পিঠার চল বহু পুরোনো। মুড়ির মোয়া ও নারকেলের নাড়ু বৈশাখী আড্ডায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বৈশাখের মেলা আর খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কদমা, বাতাসা এবং চিনি বা গুড়ের সাজ। গ্রামীণ ঐতিহ্যে এই শুকনো মিষ্টিগুলো ছাড়া নববর্ষ কল্পনা করা কঠিন। খই ও মুড়কির সঙ্গে ঝোলা গুড় মিশিয়ে তৈরি করা মোয়া ছোট-বড় সবার প্রিয়।
এছাড়া নারকেলের নাড়ু, যা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়, তা বৈশাখী আড্ডার প্রধান আকর্ষণ। ঘরে তৈরি ভাপা বা চিতই পিঠার পাশাপাশি নতুন ধানের চালের পায়েস উৎসবের মিষ্টিমুখকে পূর্ণতা দেয়। এই খাবারগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় শৈশবের সেই মেলায় যাওয়ার দিনগুলোর কথা।
চিড়া-দই-গুড়: বৈশাখী খরতাপে শরীর ও মনকে ঠাণ্ডা রাখতে চিড়া, দই ও গুড়ের মিশ্রণ এক আদর্শ খাবার। এটি কেবল একটি পদ নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর আহার। ভেজানো নরম চিড়ার সঙ্গে ঘন টক দই বা মিষ্টি দই এবং নলেন গুড় বা আখের গুড় মিশিয়ে খাওয়ার রীতিটি অত্যন্ত প্রাচীন। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে পাকা কলা বা আমের স্লাইস যুক্ত করা হয়, যা এর পুষ্টিগুণ ও স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মৌসুমি ফল: বৈশাখ মাস মানেই মধুমাসের আগমনী গান। এই সময়ে বাজারে আসতে শুরু করে রসালো সব ফল। কাঁচা আমের ভর্তা বা কাসুন্দি দিয়ে মাখানো আম তো বৈশাখের দুপুরের সিগনেচার আইটেম। তীব্র গরমে বেলের শরবত বা তরমুজের ফালি শরীরে পানিশূন্যতা রোধ করে। এছাড়া বাঙ্গি, যা অনেকের কাছে অপছন্দ হলেও চিনি বা গুড় দিয়ে মেখে খেলে তা শরীর ঠান্ডা রাখতে অতুলনীয়। এই ফলাহার কেবল উদরপূর্তি নয়, বরং প্রকৃতির পালাবদলের সঙ্গে মানুষের টিকে থাকার এক প্রাকৃতিক মেলবন্ধন। পান্তা-ইলিশের বাণিজ্যিক আড়ম্বর ছেড়ে এই দেশজ খাবারের দিকে ফিরে যাওয়াই হোক এবারের নববর্ষের মূল সুর।
এছাড়াও বাঙালির নববর্ষের প্রকৃত স্বাদ লুকিয়ে আছে চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিভিন্ন নিরামিষ ভোজনে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত ‘পাঁচন’ বা বহু প্রকার সবজির মিশ্রণে তৈরি তরকারি অত্যন্ত প্রাচীন ও জনপ্রিয়।
লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, বছরের প্রথম দিন এই বহু প্রকার সবজির মিশ্রণ খেলে রোগবালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চৈত্র মাসের তপ্ত দুপুর সামলাতে তিতকুটে স্বাদের গিমা শাক বা নিম-বেগুন ভাজা। প্রাচীন বাংলার কৃষি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত কাঁচা আম বা তেঁতুলের টক ডাল এবং নতুন চালের পায়েস।
খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশাখের এই প্রখর গরমে পান্তা-ইলিশের খাবারের চেয়ে সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি কার্যকর।
ইতিহাসবিদদের দাবি, মুঘল আমলে খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব হতো, সেখানে স্থানীয় কৃষিজাত পণ্যই ছিল আপ্যায়নের প্রধান অনুষঙ্গ। সেই সূত্রে কাঁচা আমের ভর্তা, গুড় দিয়ে তৈরি মুড়ি-মুড়কি এবং নতুন ধানের খই নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইলিশ মূলত বর্ষার মাছ, আর গ্রীষ্মের শুরুতে ইলিশের প্রজনন রক্ষায়ও বৈশাখে ইলিশ বর্জন একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তাই পান্তা-ইলিশের হুজুগে গা না ভাসিয়ে আমরা অনায়াসেই ফিরে যেতে পারি আমাদের আদি রন্ধনশৈলীর কাছে। এই বৈশাখে আমাদের ডাইনিং টেবিলে ফিরে আসুক মাঠের সবজি, নদীর দেশি মাছ আর পরম মমতায় তৈরি মায়ের হাতের চিরায়ত সেই পাঁচন, যা আমাদের তৃপ্ত করার পাশাপাশি মনে করিয়ে দেবে বাঙালির প্রকৃত পরিচয়। এভাবেই লোকজ খাবারের হাত ধরে বেঁচে থাকুক আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি।