পাহাড়ধসে মৃত্যু: মানবসৃষ্ট বিপর্যয়
বাংলাদেশে যে বস্তুটি সবচেয়ে সস্তা তা সম্ভবত জীবন। সুনির্দিষ্টভাবে বললে ‘মানুষের জীবন’। ধনী গরিবের আকাশ পাতাল অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো সস্তা জীবনের মূল্যেও রয়েছে বৈষম্য। জীবনের দাম নিয়ে সর্বশেষ বড় দুঃসংবাদটি এসেছে পাহাড়ধস থেকেই। বৃষ্টি হলে পাহাড়ধস হবে এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়; মানুষের প্রাণহানি তো নয়ই। এটি দুর্ঘটনা নয়, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। কোনোভাবেই এর জন্য বৃষ্টি বা পাহাড়ের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। বছরের পর বছর ধরে নির্বিচারে গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে। শুধু কি গাছ, পাহাড় কেটে সমতল বানানো হয়েছে। গাছ না থাকায় মাটির কাঠামো দুর্বল হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই নামছে ধস। এদিকে বন্যা ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ-এই সাত জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। আরও পড়ুন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ৯ বন্য
বাংলাদেশে যে বস্তুটি সবচেয়ে সস্তা তা সম্ভবত জীবন। সুনির্দিষ্টভাবে বললে ‘মানুষের জীবন’। ধনী গরিবের আকাশ পাতাল অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো সস্তা জীবনের মূল্যেও রয়েছে বৈষম্য। জীবনের দাম নিয়ে সর্বশেষ বড় দুঃসংবাদটি এসেছে পাহাড়ধস থেকেই। বৃষ্টি হলে পাহাড়ধস হবে এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়; মানুষের প্রাণহানি তো নয়ই। এটি দুর্ঘটনা নয়, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। কোনোভাবেই এর জন্য বৃষ্টি বা পাহাড়ের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই।
বছরের পর বছর ধরে নির্বিচারে গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে। শুধু কি গাছ, পাহাড় কেটে সমতল বানানো হয়েছে। গাছ না থাকায় মাটির কাঠামো দুর্বল হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই নামছে ধস। এদিকে বন্যা ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ-এই সাত জেলা বন্যার কবলে পড়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ৯ বন্যা
গত শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, এসব জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সাত জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড়ধস ও বন্যায় ২৩ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। কক্সবাজারে আহত হয়েছেন ২৪ জন। এদিকে বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে বন্যা ও দেয়াল ধসের ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ১২ জনের আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ঢলের পানিতে ভেসে ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন; আহতের সংখ্যা ২। আরেক পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারে বন্যায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। জেলার ১৬টি উপজেলায় আংশিক ও পূর্ণ জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রামে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি।
বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে
এরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে ১০টি উপজেলার ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ বন্যাকবলিত এবং ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার পানিবন্দি। অন্যান্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলায় ২৭ হাজার ২২০ জন, রাঙ্গামাটির ৯ উপজেলায় ৩ হাজার ৫২৪ জন, বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ৮ হাজার ৩৫০ জন, মৌলভীবাজারের চার উপজেলায় ৩৮ হাজার ১৭২ জন এবং হবিগঞ্জের তিন উপজেলায় ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হঠাৎ উপচে পড়া পানি ও পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি হারিয়ে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে হাজারো মানুষ।
সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি আশ্রয় দিতে মোট ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এরই মধ্যে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো নিজের জলমগ্ন ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নেওয়া বিপন্ন মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গত দুই দশকে বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধস বড় এক মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।
আমাদের দেশের পাহাড়গুলো মূলত মাটির পাহাড়। একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্ম নেওয়া ওই অঞ্চলের নিজস্ব গাছগুলো ভারী বৃষ্টি থেকে পাহাড় রক্ষায় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়াত। তবে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নির্বিচার পাহাড় কেটেছেন। অনেক জায়গায় পাহাড় কেটে সড়ক, রেল অবকাঠামোসহ নানা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পও করা হয়েছে। এর সঙ্গে পাহাড়ের নিজস্ব পরিবেশে জন্ম নেওয়া গাছগুলো সাবাড় করে সেখানে নানান অর্থকরী ফলদ ও বনজ বাগান করা হয়েছে। এসব গাছের শিকড় খুব বেশি মাটি ধরে রাখতে পারছে না। এসব কারণে টানা বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে মানুষের বসতিতে পড়ছে।
২০০৭ ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ পার্বত্য তিন জেলায় ভয়াবহ পাহাড়ধস হয়েছিল। সে সময় নিহত হয় দেড় শতাধিক মানুষ। আহতের সংখ্যা কত ছিল তা কেবল অনুমান করা যায়। কারণ নিহতের সংখ্যা নিয়ে যেখানে একেক গণমাধ্যমে একেক রকম তথ্য এসেছে সেখানে আহতের খবর আর রাখে কে? কোথাও নিহতের সংখ্যা বলা হয়েছে ১৫২, আবার কেউ লিখেছে প্রায় ১৭০। অন্তত দেড় শতাধিক প্রাণ মাটিচাপায় নিভে গিয়েছিল সেদিন সেটি নিশ্চিত। এর মধ্যে শুধু রাঙ্গামাটি থেকেই প্রায় ১২০ জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল। সে সময়টায় বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ ছিল। দিনরাত টানা বৃষ্টি চলে। এর পরই ধসে পড়ে পাহাড়।
এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর সরকার একটি কমিটি গঠন করে। ঐ কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশ করে। এছাড়া পাহাড়ধসে প্রাণহানি বন্ধ করতে সেসময়ে সরকারের কাছে ১২ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। ওই প্রতিবেদনে, ধস ঠেকাতে পাহাড় ও টিলা সংরক্ষণে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ কঠোরভাবে প্রতিপালন, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিক্ষয় রোধে বনায়ন, পাহাড় সংরক্ষণ টেকসই কৃষির প্রবর্তন, পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ম্যাপিং, জোনিংসহ পাহাড়ি এলাকার বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, পাহাড় সংরক্ষণ, পাহাড়ি এলাকার ব্যবহার সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছিল।
২০০৭ ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ পার্বত্য তিন জেলায় ভয়াবহ পাহাড়ধস হয়েছিল
প্রত্যেক পাহাড়ধসে প্রাণহানি প্রমাণ করেছেন এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হওয়া সুদূর পরাহত। প্রত্যেকবার পাহাড়ধসে প্রাণহানির পরই কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়ে দায় সারে। আর যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি দায় বর্তায় তারা প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড়ধস রোধে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ উচ্ছেদের মতো অস্থায়ী কিছু ব্যবস্থা নেয়। শেষ মুহূর্তে পাহাড়ের ঢাল থেকে লোকজন সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে তারাও দায় সারে। কিন্তু প্রতি বছর পাহাড়ধসের পর দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশমালা আরও দীর্ঘ হলেও বাস্তবায়ন হয় না।
কেএসকে
What's Your Reaction?
