পিঁপড়ার ডিমে জীবিকা

জীবিকা নির্বাহে মানুষের বিচিত্র ও বিস্ময়কর নানান রকমের পেশা রয়েছে। তেমনই অসাধারণ এক বৈচিত্র্যপূর্ণ পেশা পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। মৎস্য শিকারিদের চাহিদা মেটাতে বনজঙ্গলে গাছগাছালির ডাল-পালা-পাতায় বসবাসরত পিঁপড়ার বাসা থেকে সংগৃহীত এই ডিম বিক্রয়ের উপার্জিত অর্থে চলে এক শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পথে প্রান্তরে সহসাই দেখা মেলে বিচিত্র এই পেশার অধিকারী এসব মানুষের। ঘাটাইলে সংরক্ষিত ও সামাজিক প্রায় ২৫ হাজার একরের বনভূমিতে রয়েছে শাল, গজারি, আমলকি, সেগুন, হরিতকি, বহেড়া, অর্জুন, আকাশমণি, মেনজিয়াম, বট, শিমুল, ইউক্যালিপটাস সহ নানান প্রজাতির গাছ। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে আম, লিচু, মেহগিনি, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল, নারকেল, সুপারি গাছের প্রাচুর্য রয়েছে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অন্যতম ক্ষুদ্র পতঙ্গ এবং সামাজিক, পরিশ্রমী ও চতুর প্রাণী পিঁপড়া এসব গাছে আবাস গড়ে। দলবদ্ধভাবে বন্য পদ্ধতিতে গাছগাছালির ডাল-পালা-পাতায় বাসা বানায় খুদে, ডেঁয়ো, সুড়সুড়ে, বিষ ও লাল নামক প্রজাতির পিঁপড়া। এখানেই প্রাণীটির ডিম সংগ্রহে সচল থাকে মানুষের জীবিকা নির্বাহের এক মনোহর সংগ্রাম।

পিঁপড়ার ডিমে জীবিকা

জীবিকা নির্বাহে মানুষের বিচিত্র ও বিস্ময়কর নানান রকমের পেশা রয়েছে। তেমনই অসাধারণ এক বৈচিত্র্যপূর্ণ পেশা পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। মৎস্য শিকারিদের চাহিদা মেটাতে বনজঙ্গলে গাছগাছালির ডাল-পালা-পাতায় বসবাসরত পিঁপড়ার বাসা থেকে সংগৃহীত এই ডিম বিক্রয়ের উপার্জিত অর্থে চলে এক শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা।

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পথে প্রান্তরে সহসাই দেখা মেলে বিচিত্র এই পেশার অধিকারী এসব মানুষের।

ঘাটাইলে সংরক্ষিত ও সামাজিক প্রায় ২৫ হাজার একরের বনভূমিতে রয়েছে শাল, গজারি, আমলকি, সেগুন, হরিতকি, বহেড়া, অর্জুন, আকাশমণি, মেনজিয়াম, বট, শিমুল, ইউক্যালিপটাস সহ নানান প্রজাতির গাছ। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে আম, লিচু, মেহগিনি, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল, নারকেল, সুপারি গাছের প্রাচুর্য রয়েছে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অন্যতম ক্ষুদ্র পতঙ্গ এবং সামাজিক, পরিশ্রমী ও চতুর প্রাণী পিঁপড়া এসব গাছে আবাস গড়ে।

দলবদ্ধভাবে বন্য পদ্ধতিতে গাছগাছালির ডাল-পালা-পাতায় বাসা বানায় খুদে, ডেঁয়ো, সুড়সুড়ে, বিষ ও লাল নামক প্রজাতির পিঁপড়া। এখানেই প্রাণীটির ডিম সংগ্রহে সচল থাকে মানুষের জীবিকা নির্বাহের এক মনোহর সংগ্রাম।

সন্ধানপুর ইউনিয়নের মাকড়াই এলাকায় দেখা মিলে কয়েকজন পিঁপড়ার ডিম সংগ্রাহকের। কাঁধে পিঠে বাঁশ ও ঝুড়ি বেঁধে তারা বের হয়েছেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যাদের গাছে গাছে। প্রথম মনে হবে, কোনো জংলি ফলের খোঁজে বেরিয়েছেন তারা। কিন্তু না, পিঁপড়ার ডিমের জন্যে এই আয়োজন তাদের। হালিম মিয়া, আব্দুস সাত্তার ও আমজাদ আলী কালবেলাকে শোনান বিচিত্র এ পেশার রোমাঞ্চকর গল্প।

তারা কালবেলাকে বলেন, বছর জুড়ে পিঁপড়ার বাসা ভরে ওঠে ডিমে। বৈশাখ থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত এটির প্রাচুর্য থাকে। শীতে গাছের পাতা ঝরলে পিঁপড়ার সংখ্যা কমে, তখন চাহিদা থাকলেও যোগানে ঘাটতি দেখা দেয়। এগুলো আসলে প্রাণীটির পিউপা বা লার্ভা, যা সাদা ডিম্বাকৃতির দেখতে অনেকটা মুড়ি বা ভাতের মতো।

গাছের মগডালে উঠে, কেউ-বা নিচ থেকে বাঁশের সাহায্যে বাসা বা চাক ভেঙে ডিম সংগ্রহ করেন। পরে বিশেষ পদ্ধতিতে পিঁপড়া থেকে ডিম আলাদা করে সেগুলো বিক্রির জন্য উপযোগী করা হয়। 

তাদের ভাষ্য, পিঁপড়ার ডিমের প্রধান ক্রেতা বড়শিতে মৎস্য শিকারিরা। লাল পিঁপড়ার ডিমের টোপ বড় মাছেরা সহজেই গিলে। ফলে বড়শির টোপে এর মিশ্রণের রয়েছে আলাদা কদর। ভালো দামে তাই এগুলো কিনে নেন তারা। স্থানীয়ভাবে সাধারণত প্রতিকেজি পিঁপড়ার ডিম বিক্রি হয় পনেরশ থেকে দুই হাজার টাকায়। ঘাটাইলে অন্তত তিন চারটি দোকানে নিয়মিত এই ডিম বিক্রি করা হয়।

সংগ্রামপুর ইউনিয়নের নলমা গ্রামের বাসিন্দা রমজান শেখ বলেন, প্রতিটি বড় বাসায় একশ থেকে দেড়শ গ্রাম ডিম পাওয়া যায়। সারাদিনে গড়ে চার-পাঁচশ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ সম্ভব। এগুলো বাজারে বিক্রি করে অনেকেই প্রতিদিন অন্তত দুই হাজার টাকা উপার্জন করছেন।

জামুরিয়া ইউনিয়নের ফুলহারা এলাকার হাবিবুর রহমান বলেন, বড়শিতে মাছ শিকারের জন্যে প্রয়োজনীয় পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহে মাঝেমধ্যেই তিনি বিশেষ প্রকৃতির বাঁশ নিয়ে বের হন। এটি সংগ্রহ বেশ কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক। কখনও পিঁপড়ার কামড়ে হাত-পা ফুলে জ্বালাপোড়ার যন্ত্রণা সইতে হয়।

সন্ধানপুর ইউনিয়নের ইলিরচালা গ্রামের রহিজ উদ্দিন এবং তার ছেলে মনির খান নিয়মিত পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করেন। তাদের সাথে দেখা হলে তারা কালবেলাকে বলেন, ডিম সংগ্রহে থাকে সাপ, মৌমাছি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ।

কখনও গাছের উঁচু ডালে উঠতে হয়। কাজটিও সম্পন্ন করতে হয় সতর্কতায়। বড় আকারের প্রতি বাসায় একশ থেকে দেড়শ গ্রাম ডিম পাওয়া যায়। সারাদিনে চার-পাঁচশ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ সম্ভব। এগুলোর বাজারমূল্য ভালো।

লেংড়ার বাজার গ্রামের মিলন হোসেন বলেন, অন্যদের সঙ্গে বনজঙ্গলে গিয়ে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করি। সংগৃহীত পিঁপড়াসহ ডিম রাখা হয় বিশেষায়িত কাগজের প্যাকেটে। বিশেষ প্রক্রিয়ায় ডিম থেকে আলাদা করা হয় পিঁপড়া। পরে ডিম পরিমাপ করে বিক্রি করা হয়। অনেক সময় মৎস্য শিকারিরা সরাসরি আমাদের থেকে ডিম সংগ্রহ করেন।

গ্রামের অনেক বেকার যুবক এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। পুঁজি লাগে না বলেই অনেকেই এ পেশায় যুক্ত হয়ে মাসে কয়েক হাজার টাকা আয় করছেন।

স্থানীয় শৌখিন মৎস্য শিকারি আব্দুল বারেক মিয়া, মোতালেব হোসেন, মোস্তফা কামাল, জাহিদুর রহমান, বদরুল আলম। তারা কালবেলাকে বলেন, মাছ শিকারে প্রস্তুতির প্রথমেই থাকে পিঁপড়ার ডিম। সংগ্রহে ঘাটতি থাকায় কখনও আড়াই হাজার টাকা কেজি দরেও ডিম কিনতে হয়।

বৈশাখ থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত আমাদের এলাকায় এই ডিম প্রচুর পাওয়া যায়। শীতে গাছের পাতা ঝরা শুরু হলে পিঁপড়ার সংখ্যা কমে গেলে চাহিদা থাকলেও যোগানে ঘাটতি থাকে।

ঘাটাইলের ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন কালবেলাকে বলেন, বনাঞ্চলে প্রকৃতিনির্ভর এই জীবিকার সঙ্গে যুক্ত অনেক পরিবার। এগুলো রক্ষায় বন সংরক্ষণ জরুরি। বন ধ্বংস হলে শুধু গাছপালা, প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যই নয়, মানুষের জীবিকার পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ জীবন সংগ্রামের এক নীরব বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow