পিরোজপুরের ২০০ বছরের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে

প্রায় দু’শ বছর আগে পিরোজপুর জেলার কাউখালীর সোনাকুড়ে শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পের কাজ শুরু করলেও প্রায় ত্রিশ বছরে তা ছড়িয়ে পরে জেলার সদর, মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুরে। পঞ্চাশ বছরে এর সংখ্যা দাঁড়ায় কয়েক হাজারে, তবে নাজিরপুর ও ভান্ডারিয়ায় এর প্রসার লোপ পেলেও সদর উপজেলার পালপাড়া, মুলগ্রাম ও রানীপুরে এবং কাউখালীর সোনাকুড়ে এদের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। মৃৎশিল্পের এক সময়ের প্রজ্জলিত মশাল এখন নিবু নিবু অগ্নি শিখায় পরিণত হয়েছে। মাটির তৈরি খেলনার কদর কমে যাওয়ায় তাদের ভরসা শুধু দইয়ের হাঁড়ি আর তৈজসপত্রের উপর। বাঙালির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে একসময় দম ফেলার সময় টুকু ছিল না এখানকার মৃৎশিল্পীদের। এখন তা পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শিশুদের খেলনা মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা তো দূরের কথা এখন ভরা মৌসুমেও প্রতিদিনের মতো মাটির সরা দইয়ের হাঁড়ি সহ নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু তৈজসপত্র তৈরি করছেন তারা। এই পেশায় জড়িত কয়েক হাজার পরিবারের মধ্যে শত শত পরিবার এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। অভাব আর ঋণে পড়ে অনেকে ছেড়েছেন দেশও। ব্যবসায়িক লোকসান, জিনিসপত্র ও শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, প্লাস্টিক সামগ্রী,

পিরোজপুরের ২০০ বছরের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে

প্রায় দু’শ বছর আগে পিরোজপুর জেলার কাউখালীর সোনাকুড়ে শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পের কাজ শুরু করলেও প্রায় ত্রিশ বছরে তা ছড়িয়ে পরে জেলার সদর, মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুরে। পঞ্চাশ বছরে এর সংখ্যা দাঁড়ায় কয়েক হাজারে, তবে নাজিরপুর ও ভান্ডারিয়ায় এর প্রসার লোপ পেলেও সদর উপজেলার পালপাড়া, মুলগ্রাম ও রানীপুরে এবং কাউখালীর সোনাকুড়ে এদের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। মৃৎশিল্পের এক সময়ের প্রজ্জলিত মশাল এখন নিবু নিবু অগ্নি শিখায় পরিণত হয়েছে। মাটির তৈরি খেলনার কদর কমে যাওয়ায় তাদের ভরসা শুধু দইয়ের হাঁড়ি আর তৈজসপত্রের উপর।

বাঙালির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে একসময় দম ফেলার সময় টুকু ছিল না এখানকার মৃৎশিল্পীদের। এখন তা পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শিশুদের খেলনা মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা তো দূরের কথা এখন ভরা মৌসুমেও প্রতিদিনের মতো মাটির সরা দইয়ের হাঁড়ি সহ নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু তৈজসপত্র তৈরি করছেন তারা।

jago

এই পেশায় জড়িত কয়েক হাজার পরিবারের মধ্যে শত শত পরিবার এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। অভাব আর ঋণে পড়ে অনেকে ছেড়েছেন দেশও। ব্যবসায়িক লোকসান, জিনিসপত্র ও শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, প্লাস্টিক সামগ্রী, সুদ বিহীন লোন না পাওয়া, চড়া সুদের ক্ষুদ্র ঋণে জড়িয়ে পড়ায় পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা। প্লাস্টিক সামগ্রীর সহজলভ্যতায় মৃৎশিল্প টিকে থাকতে পারছে না। দেশের এ পরিবেশ বান্ধব সামগ্রী টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন এ পেশায় যুক্ত সংশ্লিষ্টরা।

পিরোজপুর মূলগ্রাম এলাকার বীরেন পাল বলেন, ‘আমাদের এখানে কয়েকশত পালের বসবাস ছিল কিন্তু এই পেশায় ভালো মূল্য পাওয়া যায় না। তাই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে পালেরা। আগে পহেলা বৈশাখের সময় কত ব্যস্ত সময় পার করতাম কিন্তু এখন সেই ব্যস্ততা নেই। হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, কলসিসহ নানান রকম খেলনা বানাতে দিনরাত কাজ করতাম। কিন্তু এখন প্লাস্টিক হওয়ায় আমাদের জিনিসপত্রের মূল্য কমে গিয়েছে তাই এগুলো বানাই না।’

jagoএকই এলাকার অরুন পাল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আমাদের অনেক কাজ থাকতো, মেলা উপলক্ষে অনেক জিনিসপত্র তৈরি করতাম কিন্তু এখন সেগুলো তার তৈরি করি না। প্লাস্টিক আমাদের জিনিসপত্রের কদর কমিয়ে দিয়েছে তাই এগুলো আর তৈরি করা হয় না। আমরা এখন শুধু দইয়ের হাঁড়ি, খাদা, বাসন এগুলো তৈরি করি। যাও তৈরি করি তার সঠিক মূল্য পাইনা, ধীরে ধীরে এই শিল্প বিলুপ্তের পথে।’

পিরোজপুর সদর উপজেলার রানীপুর এলাকার তপন পাল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আমরা এখন আর কিছু বানাতে পারি না। জিনিসপত্র সবকিছুর দাম বেশি। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন আর এই পেশায় আসতে চায় না। আমরা তো এই কাজ শিখছি তাই করতেছি, এইটা ছাড়া তো অন্য কোনো কাজ পারি না। এই পেশার জন্য অনেকে ধার কার্য করে দেনা হয়েছে। সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করত তাহলে অনেক ভালো হতো। বৈশাখ উপলক্ষে দিন রাত কাজ করতাম, ঘুমানোর সময় পেতাম না কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নাই। এখন সবকিছু প্লাস্টিকের হওয়ার কারণে আমাদের জিনিস আর চলে না। সরকারের প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বন্ধ করে দেওয়া উচিত এগুলো তো পরিবেশের ক্ষতি করে।’

jagoঝর্ণা রানী বলেন, ‘এখানে সারাদিন কাজ করে দুই থেকে আড়াইশো টাকা পাই, এই দিয়ে কি সংসার চলে। সরকার যদি আমাকে কোনো সহযোগিতা করতে তাহলে হয়তো ভালো থাকতে পারতাম, ছেলে মেয়ে নিয়ে বাঁচতে পারতাম।’

পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘স্বর্ণ যুগের সেই কয়েক হাজার পরিবার ব্যবসায়িক লোকসান, জিনিসপত্র ও শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও সুদ বিহীন লোন না পাওয়ায় এবং চড়া সুদের ক্ষুদ্র ঋণে জড়িয়ে পড়ায় এরই মধ্যে শত শত পরিবার এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। তবে বর্তমানে যারা আছেন, এ শিল্প রক্ষায় তাদের জন্য সরকারি প্রনোদনা ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে।’

মোঃ তরিকুল ইসলাম/কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow