পুরান ঢাকার বানর সংরক্ষণ এখন জীববৈচিত্র্য রক্ষারও প্রশ্ন
পুরান ঢাকার বানরগুলো বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে রয়েছে। একসময় এদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকলেও নগরায়ণ, শব্দদূষণ, মানুষের চাপ এবং খাদ্যসংকটের কারণে এখন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দীর্ঘদিন মানুষের আশপাশে বসবাস করতে করতে তারা শহুরে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং মানুষের ঘরবাড়ি বা রান্নাঘরে ঢুকে খাবার সংগ্রহ করার মতো আচরণগত দক্ষতাও অর্জন করেছে। তবে খাদ্যের অভাবে অনেক বানর অপুষ্টিতে ভুগছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠেছে। এখন, পুরান ঢাকার বানরদের সংরক্ষণে নিয়মিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ করে নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্থানে খাদ্য সরবরাহ করা গেলে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত কমবে এবং টিকে থাকার সুযোগ বাড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় ও ধারাবাহিক ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার দিক থেকেও বানর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। তাই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা এই প্রাণীগুলোকে রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় ভবিষ্যতে তাদের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে। কথাগুলো বলছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ
পুরান ঢাকার বানরগুলো বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে রয়েছে। একসময় এদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকলেও নগরায়ণ, শব্দদূষণ, মানুষের চাপ এবং খাদ্যসংকটের কারণে এখন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দীর্ঘদিন মানুষের আশপাশে বসবাস করতে করতে তারা শহুরে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং মানুষের ঘরবাড়ি বা রান্নাঘরে ঢুকে খাবার সংগ্রহ করার মতো আচরণগত দক্ষতাও অর্জন করেছে। তবে খাদ্যের অভাবে অনেক বানর অপুষ্টিতে ভুগছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠেছে।
এখন, পুরান ঢাকার বানরদের সংরক্ষণে নিয়মিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ করে নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্থানে খাদ্য সরবরাহ করা গেলে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত কমবে এবং টিকে থাকার সুযোগ বাড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় ও ধারাবাহিক ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার দিক থেকেও বানর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। তাই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা এই প্রাণীগুলোকে রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় ভবিষ্যতে তাদের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।
কথাগুলো বলছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।
পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া কবরস্থান ও এর আশপাশে এখনো দেখা মেলে বানরদের, গত মঙ্গলবার তোলা। ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ
জাগো নিউজ: পুরান ঢাকার বানরগুলো নিয়ে এখন কেন এত আলোচনা হচ্ছে? তাদের বর্তমান অবস্থা কেমন?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: পুরান ঢাকার বানরগুলো বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় এদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল, কিন্তু এখন সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। আমার ধারণা, পুরো এলাকায় ১০০ থেকে ২০০টির মতো বানর থাকতে পারে। নগরায়ণ, মানুষের চাপ, শব্দদূষণ এবং খাদ্যসংকট তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। অনেক বানরকে অপুষ্টিতে ভুগতে দেখা যায়। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় তাদের শরীর অত্যন্ত শীর্ণ হয়ে গেছে। তাই বিষয়টি এখন শুধু প্রাণী সংরক্ষণের নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষারও প্রশ্ন।
জাগো নিউজ: পুরান ঢাকার বানরগুলোকে অনেকেই ‘নাগরিক বানর’ বলেন। এর কারণ কী?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: দীর্ঘদিন মানুষের আশপাশে বসবাস করতে করতে তারা নাগরিক জীবনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তারা খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী। অনেক সময় মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ে, দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলতে পারে, রান্নাঘরে রাখা চাল-ডালের টিনের ঢাকনাও খুলে ফেলে। অর্থাৎ শহুরে পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তারা নানা ধরনের আচরণগত দক্ষতা অর্জন করেছে। তবে এই বিষয়গুলোই আবার মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বুকে সন্তান নিয়ে একটি বানর। গেন্ডারিয়া কবরস্থান থেকে তোলা, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: অন্য প্রাণীদের জন্য মানুষ যেভাবে এগিয়ে আসে, বানরদের জন্য তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না কেন?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: এর অন্যতম কারণ মানুষের সঙ্গে বানরের সম্পর্কটা তুলনামূলক জটিল। যেমন কুকুর মানুষের প্রতি আনুগত্য দেখায়, বিড়ালও অনেকের কাছে প্রিয় প্রাণী। কিন্তু বানর স্বাধীনচেতা এবং সুযোগ পেলে মানুষের খাবার নিয়ে যায়। ফলে মানুষ অনেক সময় তাদের নেতিবাচকভাবে দেখে। আবার বানর সাধারণত মানুষের খুব কাছে আসে না, লাজুক স্বভাবের কারণে আড়ালে থাকতে পছন্দ করে। এসব কারণে তাদের জন্য জনসমর্থনও তুলনামূলক কম দেখা যায়।
আরও পড়ুন
অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’
বানর-রাজ্যে একদিন
একশো বছর ধরে বানরের বাস পুরান ঢাকায়
পুরান ঢাকায় বানর রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন
জাগো নিউজ: ঢাকার বানরদের খাদ্যসংকট কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: এটি এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। পুরান ঢাকার পরিবেশে তাদের স্বাভাবিক খাদ্যের উৎস প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে তারা মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কিন্তু নিয়মিত খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে অনেক বানরের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাদের দিকে তাকালেই অপুষ্টির চিত্র স্পষ্ট বোঝা যায়।
গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরকে খাবার দিচ্ছেন এক ব্যক্তি, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: এই প্রাণীগুলোকে রক্ষার জন্য বাস্তবসম্মত কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: আমি মনে করি নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নিয়মিত খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে। বিশেষ করে উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় যদি তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহ করা যায়, তাহলে তারা সেখানে অবস্থান করবে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতও কমবে। সংখ্যাও খুব বেশি নয়, তাই এটি অসম্ভব কোনো কাজ নয়।
আরও পড়ুন
‘ঝরনার রানী’কে পাহারা দিচ্ছে একদল বানর
মোংলায় পর্যটক দেখলেই দলবেঁধে ছুটে আসছে বানর
খাবার সংকটে বানর, বসতবাড়িতে দিচ্ছে হানা
জাগো নিউজ: সিটি করপোরেশন ও বন বিভাগের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: তাদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। মাঝেমধ্যে কিছু উদ্যোগ বা বরাদ্দের কথা শোনা যায়, কিন্তু সেগুলো ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয় না। প্রাণী সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত তদারকি। যদি পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হয়, তাহলে পুরান ঢাকার এই বানরগুলোকে সহজেই সংরক্ষণ করা সম্ভব।
গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরের দল, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: অনেকের মধ্যে ধারণা রয়েছে, বানর থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে। এ আশঙ্কা কতটা বাস্তব?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণকে আমরা জুনোটিক ডিজিজ বলি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন উদাহরণ আছে। তবে বাংলাদেশে, বিশেষ করে পুরান ঢাকার বানর থেকে মানুষের মধ্যে কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ার উল্লেখযোগ্য রেকর্ড নেই। যেহেতু মানুষ ও বানর সাধারণত নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখে, তাই ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম।
আরও পড়ুন
খাবারের খোঁজে ভারতের বানর বাংলাদেশে, দিশেহারা সীমান্তের কৃষকরা
বনে খাবারের অভাব, দলবেঁধে লোকালয়ে ছুটছে বানর
বানরের প্রতিশোধ!
জাগো নিউজ: বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক—দুই দৃষ্টিকোণ থেকে বানর সংরক্ষণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: বৈজ্ঞানিকভাবে বানর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় তাদের ব্যবহার করা হয়, কারণ তারা মানুষের কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের প্রাণী। অন্যদিকে নৈতিক দিক থেকেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ জীব বলি, তাহলে অন্য প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। বানর প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তাদের বাঁচিয়ে রাখা মানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা।
গেন্ডারিয়া কবরস্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি বানর, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: পুরান ঢাকার বানর কি বিলুপ্তির পথে?
আবদুল্লাহ্ আল্ মাসুদ: ‘বিলুপ্তি’ শব্দটি হয়তো এখনই ব্যবহার করা যাবে না, তবে তারা অবশ্যই অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে রয়েছে। একসময় পুরান ঢাকায় বানরের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আমার ধারণা, বর্তমানে ১০০ থেকে ২০০টির মতো বানর রয়েছে। নগরায়ণ, মানুষের চাপ, শব্দদূষণ এবং খাদ্যের অভাব তাদের টিকে থাকাকে কঠিন করে তুলেছে। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে তাদের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।
এমডিএএ/এমএমএআর
What's Your Reaction?