পুরান ঢাকায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার ‘ব্লু-গ্রিন ইকোসিস্টেম’

পুরান ঢাকার বানরগুলো বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। বিশেষ করে বাহাদুর শাহ পার্কের পাশাপাশি রমনা পার্ক, গেন্ডারিয়া কবরস্থান, শাঁখারীবাজার, বিভিন্ন ভবনের ছাদ এমনকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেও তাদের দেখা যায়। মূলত গাছপালা ও বনাঞ্চল কমে যাওয়া, খাবারের সংকট এবং স্থায়ী আবাসস্থল না থাকায় তারা শহরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষের আশপাশে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত খাবার সরবরাহ এবং সীমিত পরিসরে অস্থায়ী আশ্রয় বা সেটেলমেন্ট তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন, ফলদ ও দেশীয় গাছ রোপণ এবং বুড়িগঙ্গার দুই পাশসহ সরকারি খালি জায়গায় সবুজায়ন করলে একটি নতুন ‘ব্লু-গ্রিন’ ইকোসিস্টেম তৈরি সম্ভব, যা বানরসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আবাস নিশ্চিত করবে এবং নগরের পরিবেশ ভারসাম্যপূর্ণ রাখবে। আরও পড়ুনঅস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’পুরান ঢাকার বানর সংরক্ষণ এখন জীববৈচিত্র্য রক্ষারও প্রশ্নবানর-রাজ্যে একদিনএকশো বছর ধরে বানরের বাস পুরান ঢাকায় আবার, সবুজায়ন কমে কংক্রিট বৃদ্ধি পেলে শহরের তাপমাত্রা ও হ

পুরান ঢাকায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার ‘ব্লু-গ্রিন ইকোসিস্টেম’

পুরান ঢাকার বানরগুলো বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। বিশেষ করে বাহাদুর শাহ পার্কের পাশাপাশি রমনা পার্ক, গেন্ডারিয়া কবরস্থান, শাঁখারীবাজার, বিভিন্ন ভবনের ছাদ এমনকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেও তাদের দেখা যায়। মূলত গাছপালা ও বনাঞ্চল কমে যাওয়া, খাবারের সংকট এবং স্থায়ী আবাসস্থল না থাকায় তারা শহরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষের আশপাশে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত খাবার সরবরাহ এবং সীমিত পরিসরে অস্থায়ী আশ্রয় বা সেটেলমেন্ট তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন, ফলদ ও দেশীয় গাছ রোপণ এবং বুড়িগঙ্গার দুই পাশসহ সরকারি খালি জায়গায় সবুজায়ন করলে একটি নতুন ‘ব্লু-গ্রিন’ ইকোসিস্টেম তৈরি সম্ভব, যা বানরসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আবাস নিশ্চিত করবে এবং নগরের পরিবেশ ভারসাম্যপূর্ণ রাখবে।

আরও পড়ুন
অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’

পুরান ঢাকার বানর সংরক্ষণ এখন জীববৈচিত্র্য রক্ষারও প্রশ্ন
বানর-রাজ্যে একদিন
একশো বছর ধরে বানরের বাস পুরান ঢাকায়

আবার, সবুজায়ন কমে কংক্রিট বৃদ্ধি পেলে শহরের তাপমাত্রা ও হিট ওয়েভের প্রভাব বাড়ে, তাই দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত নগর সবুজায়নই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান বলে মনে করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক। 

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার ‘ব্লু-গ্রিন ইকোসিস্টেম’পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরের দল, ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

জাগো নিউজ: বানরগুলো কেন শহরে এভাবে ছড়িয়ে পড়েছে?

মহিউদ্দিন: মূলত বনাঞ্চল ও গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন শহরে খাবারের সন্ধানে তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। গাছ না থাকা, বনভূমি ধ্বংস হওয়া এবং স্থায়ী আবাসস্থলের অভাব—এই তিনটি কারণে তারা শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং মানুষের আশপাশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

জাগো নিউজ: পুরান ঢাকায় বর্তমানে বানরগুলো কোথায় কোথায় বেশি দেখা যাচ্ছে?

মহিউদ্দিন: পুরান ঢাকার বানরগুলো এখন মূলত বিভিন্ন এলাকা ও আশ্রয়স্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। বাহাদুর শাহ পার্ক ছাড়া রমনা পার্কের আশপাশেও কিছু দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি থাকে গেন্ডারিয়া কবরস্থান এলাকায়। সেখানে কিছু গাছপালা থাকায় তারা আশ্রয় নেয়। এছাড়া বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের ছাদেও তাদের দেখা যায়। এমনকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ, শাঁখারীবাজারসহ বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়ও তারা ঘুরে বেড়ায়।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার ‘ব্লু-গ্রিন ইকোসিস্টেম’গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরদের খাবার দিচ্ছে একটি পরিবার, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজ: তাদের খাবার ও বসবাসের সমস্যা সমাধানে কী করা যেতে পারে?

মহিউদ্দিন: একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়মিত খাবার দেওয়া। যদি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিদিন খাবার দেওয়া হয়, তবে তারা সেখানে অভ্যস্ত হয়ে যাবে এবং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় জড়ো হবে। পাশাপাশি অস্থায়ী আশ্রয় বা ছোট সেটেলমেন্ট টাইপ জায়গা তৈরি করা যেতে পারে। এতে তারা নিরাপদে থাকতে পারবে এবং শহরে এলোমেলোভাবে ঘোরাঘুরি কমবে।

আরও পড়ুন
শহরের দেয়ালে বনের গল্প
বঙ্গভবনে বেড়েছে বানরের উৎপাত
‘খাঁচার বানর বাইরে আইলো কেমনে?’
পুরান ঢাকায় বানরদের খাবার দেওয়ার দাবি

জাগো নিউজ: শহরে সবুজায়ন বা বৃক্ষরোপণ কি তাদের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে?

মহিউদ্দিন: হ্যাঁ, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে। সামাজিক বনায়ন, ফলদ গাছ এবং দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগালে তারা খাদ্য ও আশ্রয় দুটোই পাবে। বুড়িগঙ্গার দুই পাশে বা শহরের খালি সরকারি জায়গায় গাছ লাগানো গেলে একটি নতুন ইকোসিস্টেম তৈরি হতে পারে। এতে শুধু বানর নয়, পাখি, কাঠবিড়ালিসহ অন্যান্য প্রাণীও ফিরে আসবে এবং পরিবেশ ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার ‘ব্লু-গ্রিন ইকোসিস্টেম’গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরের ব্যস্ততা, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজ: শহরে বানরদের উন্মুক্তভাবে ঘোরাঘুরি করা কি স্বাভাবিক পরিস্থিতি?

মহিউদ্দিন: এটি আসলে স্বাভাবিক আবাসস্থল হারানোর ফল। তারা উন্মুক্তভাবে ঘোরে। কারণ খাবারের খোঁজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়। যদি নির্দিষ্ট এলাকায় খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা যায়, তবে তারা সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করবে এবং এলোমেলোভাবে ঘোরাঘুরি কমে যাবে।

আরও পড়ুন
‘ঝরনার রানী’কে পাহারা দিচ্ছে একদল বানর
মোংলায় পর্যটক দেখলেই দলবেঁধে ছুটে আসছে বানর
খাবার সংকটে বানর, বসতবাড়িতে দিচ্ছে হানা
পুরান ঢাকায় বানর রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন

জাগো নিউজ: এই বানরগুলো পরিবেশে কী ধরনের ভূমিকা রাখে?

মহিউদ্দিন: তারা পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের অংশ। তারা খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি করে তারা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অতীতে যখন ঢাকায় জলাশয় ও বন ছিল, তখন এই প্রাণীগুলো স্বাভাবিকভাবেই বাস করত এবং পরিবেশকে সমৃদ্ধ করত।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দরকার ‘ব্লু-গ্রিন ইকোসিস্টেম’গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরের দল, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজ: শহরে সবুজায়ন না থাকলে পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

মহিউদ্দিন: সবুজায়ন কমে গেলে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, হিট ওয়েভের প্রভাব বাড়ে এবং কংক্রিটের কারণে তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা বেড়ে যায়। এতে নগর পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে গাছপালা ও জলাশয় থাকলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং সামগ্রিকভাবে একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়।

আরও পড়ুন
খাবারের খোঁজে ভারতের বানর বাংলাদেশে, দিশেহারা সীমান্তের কৃষকরা
বনে খাবারের অভাব, দলবেঁধে লোকালয়ে ছুটছে বানর
বানরের প্রতিশোধ!

জাগো নিউজ: দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত?

মহিউদ্দিন: শহরকে ‘ব্লু-গ্রিন’ ধারণায় উন্নয়ন করা দরকার—অর্থাৎ জলাশয় (ব্লু) ও সবুজায়ন (গ্রিন) একসাথে সংরক্ষণ করা। খাল, পুকুর, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব। এতে শুধু বানর নয়, পুরো নগর জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং শহরও বাসযোগ্য হবে।

এমডিএএ/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow