পুরুষের বেশে কেউ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, কেউ বাঁচিয়েছেন পরিবার

সম্প্রতি নারী ক্রীড়ায় ‘লিঙ্গ যাচাই’, ক্রোমোজোম পরীক্ষা এবং নারী বিভাগে কারা খেলতে পারবেন এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাতীয় অ্যাথলেট ২৮ বছর বয়সী জান্নাত বেগম ২৮ ও ১৯ বছর বয়সী কবিতা রায়কে পুরুষ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের সব পদক বাতিল ও আজীবন নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। এর আগেও বক্সার ইমানে খলিফ ও লিন ইউ-টিংকে ঘিরে ২০২৩ সালের বিতর্ক, প্যারিস অলিম্পিকে তাদের অংশগ্রহণ এবং ২০২৬ সালে ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন জেনেটিক পরীক্ষার নীতি বিষয়টিকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। তবে শুরুতেই একটি তথ্যগত সতর্কতা জরুরি খলিফ ও লিনকে ‘পুরুষ প্রমাণিত’ বলা সঠিক নয়। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়েছিল এবং লিনের ব্রোঞ্জ পদক বাতিল করেছিল। কিন্তু পরীক্ষার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৪ সালে আইওসি ওই পরীক্ষাকে ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ বলে সমালোচনা করে এবং দুজনকেই প্যারিস অলিম্পিকে নারী বিভাগে খেলার অনুমতি দেয়। ২০২৬ সালের মার্চে আবার ওয়ার্ল্ড বক্সিং লিনকে নারী বিভাগে খেলার যোগ্য ঘোষণা করে। এই বিতর্কের মাঝেই যদি ইতিহাসের দিকে তাকান তবে ব

পুরুষের বেশে কেউ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, কেউ বাঁচিয়েছেন পরিবার

সম্প্রতি নারী ক্রীড়ায় ‘লিঙ্গ যাচাই’, ক্রোমোজোম পরীক্ষা এবং নারী বিভাগে কারা খেলতে পারবেন এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাতীয় অ্যাথলেট ২৮ বছর বয়সী জান্নাত বেগম ২৮ ও ১৯ বছর বয়সী কবিতা রায়কে পুরুষ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের সব পদক বাতিল ও আজীবন নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন।

এর আগেও বক্সার ইমানে খলিফ ও লিন ইউ-টিংকে ঘিরে ২০২৩ সালের বিতর্ক, প্যারিস অলিম্পিকে তাদের অংশগ্রহণ এবং ২০২৬ সালে ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন জেনেটিক পরীক্ষার নীতি বিষয়টিকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। তবে শুরুতেই একটি তথ্যগত সতর্কতা জরুরি খলিফ ও লিনকে ‘পুরুষ প্রমাণিত’ বলা সঠিক নয়।

২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়েছিল এবং লিনের ব্রোঞ্জ পদক বাতিল করেছিল। কিন্তু পরীক্ষার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৪ সালে আইওসি ওই পরীক্ষাকে ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ বলে সমালোচনা করে এবং দুজনকেই প্যারিস অলিম্পিকে নারী বিভাগে খেলার অনুমতি দেয়। ২০২৬ সালের মার্চে আবার ওয়ার্ল্ড বক্সিং লিনকে নারী বিভাগে খেলার যোগ্য ঘোষণা করে।

সম্প্রতি নারী ক্রীড়ায় ‘লিঙ্গ যাচাই’, ক্রোমোজোম পরীক্ষায় দুই অ্যাথলেট বিতর্কে

এই বিতর্কের মাঝেই যদি ইতিহাসের দিকে তাকান তবে বেশ কিছু উদাহরণ চোখে পড়ে নারীদের পুরুষের বেশে জীবন কাটানোর ঘটনা। যদিও সেসব নিয়ে বিতর্ক হয়নি, কারণ তারা পরিস্থতির চাপে পড়ে পুরুষ সেজেছিলেন কিন্তু এতে বাড়তি কোনো সুবিধা নেননি।

জন্মের সময় নারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েও বিভিন্ন কারণে পুরুষ পরিচয়ে জীবন কাটিয়েছেন এমন মানুষের গল্প একেবারেই নতুন নয়। কারো ক্ষেত্রে কারণ ছিল বেঁচে থাকা, কারো পরিবারের দায়িত্ব, আবার কারো ক্ষেত্রে সেটি ছিল নিজের পরিচয়েরই প্রকাশ। সেই ইতিহাসের চারটি মানবিক গল্পই যেন আজকের বিতর্ককে অন্য একটি আয়নায় দেখতে সাহায্য করে।

নাদিয়া গুলাম তখন মাত্র ১১ বছরের একটি মেয়ে

নাদিয়া গুলাম: মৃত ভাইয়ের পরিচয়ে প্রায় এক দশক

আফগানিস্তানের একটি গল্প গভীরভাবে বানিয়েছে বিশ্বকে। নাদিয়া গুলাম মাত্র ১১ বছরের একটি মেয়ে। ছোটবেলায় যুদ্ধের ভয়াবহতায় আহত হন। নাদিয়ার একটি ভাইও ছিল। কিন্তু সে মারা যায় অল্প বয়সেই। ফলে তাদের পরিবারে উপার্জনক্ষম কোনো পুরুষ ছিলেন না। নাদিয়া ও তার মা অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পড়েন। ঠিকমতো খাওয়া-পড়ার ব্যবস্থা তারা করতে পারছিলেন না। এ সময় চলছে তালিবান আমল। সে সময় নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো কোনো আইন-বিধিনিষেধ মানতে চায় না।

সে সময় নাদিয়ার মা একটি কঠিন পদক্ষেপ নেন। তিনি নাদিয়াকে তার মৃত ভাই জেলমাইয়ের পরিচয় দেন। ছেলের পোশাক পরে নাদিয়া বাইরে যেতেন, কাজ করতেন এবং পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করতেন। অর্থাৎ নিজের নারী পরিচয় লুকিয়ে রাখাটা তার কাছে ছিল বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। তার জীবনকাহিনি পরবর্তী সময়ে বই ও নানা সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

নাদিয়ার গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক জায়গাটি হলো একটি মেয়েকে নিজের পরিবারের খাবার জোগাড় করতে এমন একটি পরিচয় ধারণ করতে হয়েছিল, যে পরিচয়ের অধিকার সমাজ তার ভাইকে দিয়েছে, তাকে দেয়নি।

পরিবারে উপার্জনক্ষম পুরুষ না থাকায় নুরিয়া থেকে নূর আহমেদ নামে পুরুষের ছদ্মবেশে বাইরে কাজ করতেন তিনি

পরিবারের জন্য ছেলে সেজেছিল আরেক আফগান কিশোরী

২০২৬ সালে আফগানিস্তানের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী নুরিয়ার ঘটনা সামনে আসে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও বোনদের দেখাশোনার জন্য পরিবারের আর কোনো উপার্জনক্ষম পুরুষ ছিল না। তালিবান শাসনে নারীদের কাজের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় নুরিয়া ছেলের পোশাক পরে ‘নূর আহমদ’ নামে বাজারে কাজ করতেন। প্রায় তিন বছর তিনি এভাবে একটি ক্যাফেতে কাজ করে মাকে ও বোনদের সাহায্য করেছেন।

এই গল্পের সবচেয়ে আবেগের জায়গা হলো নুরিয়া নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি ইচ্ছা করে ছেলে সাজেননি; পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তার মা এবং বোনেরা যেন তিনবেলা খাবার খেতে পারেন। তাদের যেন ক্ষধার যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে না হয়।

তবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কিছু জায়গায় ‘বাচা পোশ’ নামে একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি রয়েছে। দারি ও ফার্সি ভাষায় ‘বাচা পোশ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ছেলের পোশাকে সজ্জিত মেয়ে’। যেখানে কোনো পরিবারে ছেলে সন্তান না থাকলে মেয়েকে ছেলের পোশাক পরিয়ে ছেলের মতো সামাজিক পরিচয় দেওয়া হয়। তালিবান আমলে এই প্রবণতার পেছনে আরও কঠিন বাস্তবতা যুক্ত হয়েছে নারীদের বাইরে কাজ করা এবং চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ।

অ্যালবার্ট ডি. জে ঊনবিংশ শতকে পুরো গৃহযুদ্ধজুড়ে সেনাবাহিনীতে ছিলেন একজন সৈন্য হিসেবে

যুদ্ধের ময়দানে পুরুষ পরিচয়

ঊনবিংশ শতকের আমেরিকায় অ্যালবার্ট ডি. জে. ক্যাশিয়ার নামের এক ব্যক্তি ইউনিয়ন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি ১৮৬২ সালে ৯৫তম ইলিনয় ইনফ্যান্ট্রিতে সৈনিক হিসেবে নাম লেখান এবং প্রায় পুরো গৃহযুদ্ধজুড়ে সেনাবাহিনীতে ছিলেন। প্রায় ৪০টি যুদ্ধ ও সংঘর্ষে অংশ নেওয়ার তথ্য রয়েছে মার্কিন ন্যাশনাল আর্কাইভসের নথিতে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ক্যাশিয়ার পুরুষ পরিচয়েই জীবন কাটাতে থাকেন। ১৯১৩ সালে একটি সামরিক আবাসনের চিকিৎসক তার জন্মপরিচয় সম্পর্কে জানতে পারেন। তখনই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তার দীর্ঘ সামরিক জীবনে সহযোদ্ধাদের কেউ তার জন্মপরিচয় বুঝতে পারেননি। আজকের ভাষায় তাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, তা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। তাই তাকে কেবল ‘নারী ছদ্মবেশে পুরুষ’ বলা যেমন সরলীকরণ, তেমনই তার নিজের পরিচয়কে উপেক্ষা করাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়।

পুরুষ পরিচয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইতিহাস

জেমস ব্যারির গল্প আরও বিস্ময়কর। ১৭৯৫ সালে আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ব্যারি ব্রিটিশ সামরিক চিকিৎসক হিসেবে অসাধারণ ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। তিনি সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদে পৌঁছেছিলেন এবং চিকিৎসাব্যবস্থার মান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন।

জীবদ্দশায় ব্যারি নিজেকে পুরুষ হিসেবেই পরিচয় দিতেন। সারাজীবন কাটিয়েছেন একজন চিকিৎসক পরিচয়ে এবং একজন পুরুষ হিসেবে। কিন্তু ১৮৬৫ সালে তার মৃত্যুর পর তার জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ব্রিটেনের দ্য ন্যাশনাল আর্কাইভস স্পষ্টভাবে জানায়, ব্যারি সারাজীবন পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং বর্তমান গবেষণায় তাকে ট্রান্সজেন্ডার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। তবে সেই সময়ে ট্রান্সজেন্ডার বিষয়টি এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতি সফল ছিল কি না সে প্রশ্ন ইতিহাসবিদরা ভেবেছেন বটে।

জেমস ব্যারিরের গল্পের বিশেষ দিক হলো আজকের সমাজে আমরা যে ‘লিঙ্গ পরিচয়’ ও ‘জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গ’-এর পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করি, ব্যারির জীবন সেই আলোচনার বহু আগের।

জেমস ব্যারি সারাজীবন কাটিয়েছেন একজন চিকিৎসক পরিচয়েচাইনিজ বেশ জনপ্রিয় একটি ড্রামা রয়েছে আর্সেনাল মিলিটারি একাডেমি। এটি একটি একাডেমি যেখানে সৈন্য তৈরি করা বা প্রশিক্ষিত করা হয়। নাটকের প্রেক্ষাপটটি ছিল এমন যে, একটি মেয়ে সেখানে ছেলে সেজে ভর্তি হয়। বিভিন্নভাবে তার পরিচয় লুকায় কিন্তু এক সহপাঠীর কাছে তার পরিচয় প্রকাশ পায়, তারপর তাদের প্রেম, বিভিন্ন শত্রুর মোকাবিলা করা, মেয়ে হওয়ার কারণে বিভিন্ন জায়গায় দুর্বলতাসহ নানান প্লটে শেষ হয় ড্রামাটি।

কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে মেয়েটি কেন ছেলে সেজে এই পুরুষদের একাডমিতে ভর্তি হতে গেলো, আসলে গল্পের প্লটটি ছিল ২০ শতকের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯১০-এর দশকে চীনের প্রজাততান্ত্রিক আমলে। যখন চীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাপানি আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়েছিল। এখানে মেয়েটি তার মৃত ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণে তার নাম নিয়ে এবং পুরুষ হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে একটি কঠোর মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেয়। চাইলে দেখে নিতে পারেন ৪৮ পর্বের ড্রামাটি।

এখানেও পরিস্থিতি, ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য মেয়েটি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। তবে বর্তমানে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তার সঙ্গে এর অবশ্য মিল নেই। কিন্তু ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে তা-তো আগেই জানালাম, ড্রামাটা যদিও কাল্পনিক বলেই দাবি সংশ্লিষ্টদের।

তবে ইতিহাসের এই গল্পগুল আজকের বিতর্কের সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় মানুষের শরীর, পরিচয় এবং সামাজিক ভূমিকা সব সময় একই সরল রেখায় চলে না। কেউ পরিচয় বদলেছেন বাঁচার জন্য, কেউ পরিবারের জন্য, কেউ নিজের জীবনকে নিজের মতো করে বেছে নিয়েছেন। আর খেলাধুলা সেই জটিল প্রশ্নটিকেই আরও কঠিন করে তুলেছে কারণ সেখানে ব্যক্তিগত পরিচয়ের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে প্রতিযোগিতার সমতা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। এটি অবশ্য ভিন্ন একটি দিক। এই লেখায় আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি বিশ্বে নানান জায়গায় এমন ঘটনা ঘটে যা শুধু মানবিকতাকেই সামনে আনে।

সূত্র: রয়টার্স, আইপিএস নিউজ, ডেইলি মেইল, আমেরিকান ব্যাটেলফিল্ড ট্রাস্ট

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow