জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বাংলাদেশের কর প্রশাসন ও রাজস্ব আহরণের সর্বোচ্চ সংস্থা, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অধীন পরিচালিত হয়।
দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত, কার্যকর ও টেকসই করার লক্ষ্যে এনবিআর আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস ও এক্সাইজ শুল্কসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং তদারকির দায়িত্ব পালন করে। পাশাপাশি কর ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ, প্রজ্ঞাপন (এসআরও) জারি এবং কর আইনসমূহের ব্যাখ্যা প্রদানও সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত।
একটি আধুনিক ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য নীতিগত সামঞ্জস্য, স্বচ্ছতা এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, একই প্রতিষ্ঠানের অধীন পরিচালিত বিভিন্ন কর বিভাগের মধ্যে সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা এবং নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা কতটুকু যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য। এনবিআরের আওতাধীন আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস বিভাগসমূহের মৌলিক উদ্দেশ্য যেহেতু অভিন্ন-রাষ্ট্রের জন্য রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা, সেহেতু কর সম্পর্কিত মৌলিক ধারণা ও সংজ্ঞাসমূহে নীতিগত সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।
দুঃখজনকভাবে, বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায় যে একই বিষয়বস্তু বিভিন্ন বিভাগে ভিন্ন ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে অথবা একটি বিভাগের ব্যাখ্যা অন্য বিভাগে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। এই ধরনের নীতিগত অসামঞ্জস্য কেবল প্রশাসনিক জটিলতা বৃদ্ধি করে না; বরং ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা, ব্যাখ্যাগত দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
ফলস্বরূপ, কর পরিপালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ২ (৬২) অনুযায়ী ‘প্রচ্ছন্ন রপ্তানি’ বলতে এমন কিছু সরবরাহকে বোঝানো হয়েছে, যা সরাসরি দেশের বাইরে রপ্তানি না হলেও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে রপ্তানির ন্যায় বিবেচিত হয়। এই ধারার আওতায় প্রথমত, বাংলাদেশের বাইরে ভোগের উদ্দেশে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে কোনো পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা হলে তা প্রচ্ছন্ন রপ্তানি হিসেবে গণ্য হবে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে, নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা হলেও সেটি প্রচ্ছন্ন রপ্তানির অন্তর্ভুক্ত হবে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় ঋণপত্রের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য বা সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রচ্ছন্ন রপ্তানির বিধান প্রযোজ্য হবে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ২(৮২) অনুযায়ী ‘রপ্তানি’ অর্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তর হইতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার বাহিরে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে কোন সরবরাহ এবং প্রচ্ছন্ন রপ্তানিও উহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।
আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ২(৮০) ‘রপ্তানি’ অর্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তর হইতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার বাহিরে কোনো পণ্য বা সেবার সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাক টু ব্যাক এলসির অধীন রপ্তানিমুখী শিল্পে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ ও রপ্তানি অর্থে অন্তর্ভুক্ত হইবে। কিন্তু আয়কর আইনে ‘প্রচ্ছন্ন রপ্তানি’-এর কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা বা স্বীকৃতি না থাকায় একই লেনদেনকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলে, প্রচ্ছন্ন রপ্তানির আওতায় সরবরাহকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ৭% হারে উৎসে কর প্রদান করতে হচ্ছে, যা পরবর্তীতে ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, একদিকে ভ্যাট আইনের অধীনে রপ্তানি সুবিধা প্রদান করা হলেও, অন্যদিকে আয়কর আইনের আওতায় একই কার্যক্রমকে কার্যত করযোগ্য সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি দেশীয় শিল্পের জন্য একটি নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। কারণ, এই ধরনের সরবরাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যেখানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে হয়। অতিরিক্ত করের চাপ তাদের ব্যয় কাঠামো বৃদ্ধি করে, মুনাফার মার্জিন সংকুচিত করে এবং তারল্য সংকটের সৃষ্টি করে। এর ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংক ঋণ সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হয়, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে তোলে।
দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বর্তমানে সরকারি কাজ করলেও, এই ধরনের নীতিমালার কারণে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক ইপিসি কনট্রাক্টর তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখলেও সরাসরি রপ্তানিকারকদের মতো সুবিধা পাচ্ছেন না। এতে করে একদিকে তাদের প্রণোদনা কমছে, অন্যদিকে দেশের রপ্তানি সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও রপ্তানির বহুমুখীকরণ কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত, সেখানে এ ধরনের নীতিগত অসামঞ্জস্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কর ব্যবস্থায় অস্পষ্টতা ও ভিন্নমুখী ব্যাখ্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ প্রবাহ নিরুৎসাহিত করে। এখন সময় এসেছে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—এই তিন বিভাগের মধ্যে অভিন্ন সংজ্ঞা ও নীতিমালা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই অর্থনৈতিক কার্যক্রম যেন ভিন্ন আইনের আওতায় ভিন্নভাবে বিবেচিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য।
নীতিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গেলে কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়বে, করদাতাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। সর্বোপরি, এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক