প্রতিরাতে গভীর সমুদ্রে ঘটে বিস্ময়কর অভিবাসন, অবাক করা রহস্য উদঘাটন

প্রতিদিন সূর্য ডোবার পর সমুদ্রের গভীর অন্ধকার থেকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী পানির ওপরের স্তরে উঠে আসে খাবারের সন্ধানে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী অভিবাসন, যা শুধু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যই নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা প্রথম এই রহস্যময় ঘটনার সন্ধান পান। তখন তারা লক্ষ্য করেন, সমুদ্রের তলদেশ যেন দিনের বিভিন্ন সময়ে ওপরে-নিচে উঠানামা করছে। পরে জানা যায়, এটি আসলে তলদেশ নয়; বরং সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্তরে বসবাসকারী অসংখ্য প্রাণীর বিশাল দল, যারা রাতে খাদ্যের জন্য ওপরে উঠে আসে এবং দিনে আবার গভীরে ফিরে যায়। বিজ্ঞানীরা এই স্তরকে \'টোয়াইলাইট জোন\' বা মেসোপেলাজিক অঞ্চল নামে পরিচিত করেন। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২০০ মিটার থেকে ১ হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে সূর্যের আলো খুবই ক্ষীণ, আর গভীর অংশে পৌঁছালে সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে। তখন আলো বলতে থাকে শুধু কিছু সামুদ্রিক প্রাণীর জৈব আলোক বিচ্ছুরণ। গবেষকদের ধারণা, সমুদ্রের মোট মাছের প্রায় ৯৫ শতাংশ জীব

প্রতিরাতে গভীর সমুদ্রে ঘটে বিস্ময়কর অভিবাসন, অবাক করা রহস্য উদঘাটন

প্রতিদিন সূর্য ডোবার পর সমুদ্রের গভীর অন্ধকার থেকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী পানির ওপরের স্তরে উঠে আসে খাবারের সন্ধানে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী অভিবাসন, যা শুধু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যই নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা প্রথম এই রহস্যময় ঘটনার সন্ধান পান। তখন তারা লক্ষ্য করেন, সমুদ্রের তলদেশ যেন দিনের বিভিন্ন সময়ে ওপরে-নিচে উঠানামা করছে। পরে জানা যায়, এটি আসলে তলদেশ নয়; বরং সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্তরে বসবাসকারী অসংখ্য প্রাণীর বিশাল দল, যারা রাতে খাদ্যের জন্য ওপরে উঠে আসে এবং দিনে আবার গভীরে ফিরে যায়।

বিজ্ঞানীরা এই স্তরকে 'টোয়াইলাইট জোন' বা মেসোপেলাজিক অঞ্চল নামে পরিচিত করেন। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২০০ মিটার থেকে ১ হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে সূর্যের আলো খুবই ক্ষীণ, আর গভীর অংশে পৌঁছালে সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে। তখন আলো বলতে থাকে শুধু কিছু সামুদ্রিক প্রাণীর জৈব আলোক বিচ্ছুরণ।

গবেষকদের ধারণা, সমুদ্রের মোট মাছের প্রায় ৯৫ শতাংশ জীবভর (বায়োমাস) এই অঞ্চলে রয়েছে। এখানে প্রায় ১০ হাজার মিলিয়ন টন মাছের পাশাপাশি অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীর বসবাস।

প্রতিদিন রাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন জুপ্ল্যাঙ্কটন গভীর সমুদ্র থেকে ওপরে উঠে আসে। তারা পানির ওপরের স্তরে থাকা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন খেয়ে আবার সূর্য ওঠার আগেই নিচে ফিরে যায়, যাতে বড় শিকারিদের চোখ এড়িয়ে চলতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ডায়েল ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন (ডিভিএম) বা দৈনিক উল্লম্ব অভিবাসন বলে থাকেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক প্রাণীর একসঙ্গে চলাচল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রাণী অভিবাসন। এর মোট জীবভর প্রায় ১০ বিলিয়ন টন বলে ধারণা করা হয়।

গবেষকরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যতম ভিত্তি। টুনা, সোর্ডফিশসহ বড় অনেক মাছ এসব প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এদের চলাচলের ফলে সমুদ্রের বিভিন্ন স্তরের পুষ্টি উপাদানও আদান-প্রদান হয়।

এ ছাড়া জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও এই অভিবাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর এই প্রাণীগুলো সমুদ্রের ওপরের স্তর থেকে প্রায় ৬ গিগাটন কার্বন গভীর সমুদ্রে নিয়ে যায়। এই পরিমাণ কার্বন বিশ্বের সব ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে নির্গত বার্ষিক কার্বনের দ্বিগুণেরও বেশি।

গভীর সমুদ্রে পৌঁছানোর পর এই কার্বন শত শত থেকে হাজার হাজার বছর পর্যন্ত আটকে থাকতে পারে। ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ কম রাখতে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় সূর্যের আলো আরও গভীরে পৌঁছানো এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার পরিকল্পনা এই সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠছে।

এ কারণে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার সমুদ্রের মধ্যবর্তী এই স্তরে বাণিজ্যিক মাছ ধরা সম্প্রসারণে সাময়িক বিরতির আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রাণীবৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও ভালোভাবে না জেনে বড় পরিসরে আহরণ শুরু হলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং বৈশ্বিক জলবায়ু—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে গবেষণা চললেও সমুদ্রের এই রহস্যময় জগত সম্পর্কে এখনও অনেক কিছু অজানা। তাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই প্রাণী অভিবাসন এবং এর জলবায়ুগত গুরুত্ব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow