প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব উন্নয়নে জোর ভোটারদের

ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে বগুড়ার দিকে এগোতেই চোখে পড়ে একসঙ্গে দুই দৃশ্য। একদিকে নতুন সাইনবোর্ড, উজ্জ্বল শোরুম, রাজনৈতিক ব্যানারে ভরা রাস্তা। অন্যদিকে খানাখন্দে ভরা সড়ক, বেহাল ড্রেনেজ, ফুটপাত দখল আর অগোছালো যানজট। শহরের প্রবেশমুখ থেকেই বোঝা যায় নির্বাচন সামনে, কিন্তু বহু পুরোনো সমস্যা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। বনানী, চারমাথা থেকে সাতমাথা বগুড়ার কেন্দ্রীয় এই অংশই শহরের হৃদপিণ্ড। এখানে দাঁড়ালে প্রথমে চোখে পড়ে ব্যস্ততা। ব্যাংক, বিপণিবিতান, হাসপাতাল, কোচিং সেন্টার। সব মিলিয়ে একটি বাণিজ্যিক শহরের চেহারা। কিন্তু একটু এগোলেই অন্য ছবি। ফুটপাতের জায়গা দখল করে দোকান, ভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছড়াছড়ি। পথচারীদের হাঁটার জায়গা নেই। যানজট যেন শহরের স্থায়ী পরিচয়। সাতমাথা এলাকায় চায়ের দোকান চালান আবদুল হালিম। তিনি বললেন, ‘ভাই বগুড়া শহর আগের চেয়ে অনেক বড় হইছে। কিন্তু রাস্তাঘাট, ড্রেন সব আগের মতোই রইছে। বৃষ্টি হইলে দোকানের সামনে হাঁটু পানি। ভোটের আগে সব দলের নেতারাই আসে কিন্তু পরে আর কেউ আসে না।’ বগুড়া পৌরসভা ও শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষায় শহরের বিস্

প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব উন্নয়নে জোর ভোটারদের

ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে বগুড়ার দিকে এগোতেই চোখে পড়ে একসঙ্গে দুই দৃশ্য। একদিকে নতুন সাইনবোর্ড, উজ্জ্বল শোরুম, রাজনৈতিক ব্যানারে ভরা রাস্তা। অন্যদিকে খানাখন্দে ভরা সড়ক, বেহাল ড্রেনেজ, ফুটপাত দখল আর অগোছালো যানজট। শহরের প্রবেশমুখ থেকেই বোঝা যায় নির্বাচন সামনে, কিন্তু বহু পুরোনো সমস্যা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।

বনানী, চারমাথা থেকে সাতমাথা বগুড়ার কেন্দ্রীয় এই অংশই শহরের হৃদপিণ্ড। এখানে দাঁড়ালে প্রথমে চোখে পড়ে ব্যস্ততা। ব্যাংক, বিপণিবিতান, হাসপাতাল, কোচিং সেন্টার। সব মিলিয়ে একটি বাণিজ্যিক শহরের চেহারা। কিন্তু একটু এগোলেই অন্য ছবি। ফুটপাতের জায়গা দখল করে দোকান, ভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছড়াছড়ি। পথচারীদের হাঁটার জায়গা নেই। যানজট যেন শহরের স্থায়ী পরিচয়।

সাতমাথা এলাকায় চায়ের দোকান চালান আবদুল হালিম। তিনি বললেন, ‘ভাই বগুড়া শহর আগের চেয়ে অনেক বড় হইছে। কিন্তু রাস্তাঘাট, ড্রেন সব আগের মতোই রইছে। বৃষ্টি হইলে দোকানের সামনে হাঁটু পানি। ভোটের আগে সব দলের নেতারাই আসে কিন্তু পরে আর কেউ আসে না।’
বগুড়া পৌরসভা ও শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষায় শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। অন্য ঋতুতে আবার ধুলাবালিতে নাকাল হয় বাসিন্দারা।

রাজনীতির কেন্দ্র, উন্নয়নে প্রশ্ন:
রাজনৈতিকভাবে বগুড়া বরাবরই আলোচিত জেলা। বড় বড় নেতার উত্থান এই জেলার মাটি থেকেই। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, রাজনীতির গুরুত্ব থাকলেও উন্নয়নের প্রশ্নে জেলা এখনও পিছিয়ে।

শহরের চকসূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়া রাজনীতির জেলা, কিন্তু উন্নয়নের দিক দিয়া সেই নামের সঙ্গে মিল নাই। বড় কোনো শিল্প নাই, বড় প্রকল্প নাই।’

প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব উন্নয়নে জোর ভোটারদের

গ্রামাঞ্চলেও একই সুর। শিবগঞ্জের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘রাস্তা-ঘাট কিছু হইছে, কিন্তু কৃষকের দামে লাভ নাই। সেচ খরচ বাড়ছে, সার-বীজের দাম বাড়ছে।’

শহরের মালতীনগর এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ঘরোত থ্যাকা ব্যার হওয়া যায় না। রাস্তা ডুবে যায়। আবার অন্যসময় ধুলা ইংকা করে উড়ে যে, ছোলপোলোক স্কুলত পাটাপ্যার পারি না।’

শহরের বড় সড়কগুলোর ফুটপাতের বেশির ভাগই দখলে। কোথাও অস্থায়ী দোকান, ‘কোথাও মোটরসাইকেল পার্কিং, কোথাও আবার ভ্যানগাড়ির সারি। ফলে মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেই হাঁটতে হয়।’

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন আশপাশের জেলাগুলো থেকে হাজারো রোগী এখানে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের সামনে দাঁড়ালেই বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ে। গাইবান্ধা থেকে আসা রোগীর স্বজন সেলিম উদ্দিন বললেন, রোগী নিয়ে হাসপাতালে ঢুকাইতে যুদ্ধ করতে হয়। গাড়ির ভিড়, রাস্তায় দালাল সব মিলায়ে অবস্থা খারাপ। বগুড়া রেলস্টেশনেও একই ছবি। যাত্রীদের বসার জায়গা কম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, স্টেশন চত্বরে অবৈধ দোকানের ছড়াছড়ি।

স্টেশনের পাশে ভ্যান চালান রহিম উদ্দিন। তিনি বললেন, এত বড় জেলা, কিন্তু স্টেশনের অবস্থা দেখেন। ভোট আলেই উন্নয়নের কথা কয়, পরে আর কিছু হয় না। একসময় বগুড়ায় ছোট-বড় শিল্পকারখানা ছিল। বিস্কুট, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মেটাল ওয়ার্কশপ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এসবের কারণে শহরটিকে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র বলা হতো। এখন সেই শিল্পের বড় অংশ বন্ধ বা সংকুচিত।

শহরের বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, অনেক প্লট ফাঁকা বা অর্ধেক চালু। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা, ঋণের জটিলতা ও বাজার সংকটের কারণে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একটি খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত কারখানার মালিক আব্দুল কাদের বলেন, শিল্প টিকাইতে নীতি সহায়তা লাগে। কিন্তু এখানে সবাই শুধু বাণিজ্য করে। নতুন বড় শিল্প আসেনি।

প্রতিশ্রুতির ঢল, ভোটারের চোখে হিসাবের খাতা:
নির্বাচন সামনে রেখে বগুড়ার সাতটি আসনেই এখন তুমুল প্রচারণা। শহরের মোড় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানেই মাইকিং, পথসভা, উঠান বৈঠক আর ছোট ছোট সমাবেশে সরগরম নির্বাচনি মাঠ। পোস্টারবিহীন নির্বাচনের কারণে প্রার্থীরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বার্তা, থিম সং এবং অনলাইন প্রচারণায় জোর দিচ্ছেন।

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে প্রচারণায় ব্যস্ত একাধিক প্রার্থী বলেন, এই অঞ্চলে নদীভাঙন, যোগাযোগ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য এই তিনটা সমস্যা সবচেয়ে বড়। আমরা সংসদে গেলে প্রথমেই এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবো।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে প্রার্থীদের ভাষ্য হলো, মানুষ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা কাজের হিসাব চায়। গত কয়েক বছরে এলাকার যে উন্নয়ন হয়নি, সেটাই এখন ভোটের বড় ইস্যু। তারা স্বীকার করেন যে শিবগঞ্জে শিল্প নেই, বড় কোনো বিনিয়োগ নেই। তরুণরা কাজের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন এখানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা দরকার।

বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে প্রার্থীরা মনে করেন, এই এলাকার রেল, সড়ক আর কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন দরকার। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, পাঁচ বছর ধরে মানুষের পাশে থাকতে হবে এই বার্তাই আমরা দিচ্ছি।

বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে প্রচারণা চালাতে গিয়ে এক প্রার্থী বলেন, এখানে অনেক সম্ভাবনা আছে, কিন্তু পরিকল্পনা নেই। সেচ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিলে এই এলাকা বদলে যেতে পারে।

বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পপার্ক দরকার। তরুণদের জন্য আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হলে বেকারত্ব দূর হবে।

বগুড়া-৬ (সদর) আসনে প্রচারণা চলছে সবচেয়ে বেশি জোরে। শহরের প্রধান সমস্যা যানজট, ড্রেনেজ আর ফুটপাত দখল। এগুলোর সমাধান দিতে চান সবাই। তারা মনে করেন, এটি করতে না পারলে উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের প্রকৃত বাণিজ্যকেন্দ্র বানাতে হলে বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প আনতে হবে। এ কারণে সব প্রার্থীই সেই পরিকল্পনা নিয়ে ভোট চাইছেন।

বগুড়া-৭ (শাজাহানপুর-গাবতলী) আসনে এক প্রার্থী বলেন, গ্রামের রাস্তা, সেচ আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এই তিনটা বিষয় নিয়েই আমরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছি।

তবে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির মাঝেও ভোটারদের কণ্ঠে আগের মতো উচ্ছাস নেই। বরং শোনা যাচ্ছে হিসাব চাওয়ার সুর। সাতমাথা এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার শুধু মার্কা দেইখা ভোট দিলে হবে না। কে এলাকার জন্য কাজ করবে, সেটা চিন্তা করতে হবে। আগেও অনেক কথা শুনছি, কাজ কম দেখছি।’

শেরপুর উপজেলার তরুণ ভোটার তানভীর হোসেন বলেন, আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি শুধু রাজনীতি করবেন না, কাজও দেখাবেন। চাকরি নাই, শিল্প নাই এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

শাজাহানপুরের গৃহবধূ রুনা বেগম বলেন, ভোটের আগে সবাই আসে। পরে আর কেউ আসে না। এবার আমরা কাজ দেখে ভোট দিতে চাই।

দুপচাঁচিয়ার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের কথা কেউ সংসদে তোলে না। সার, ডিজেল, সেচ সবকিছুর দাম বাড়ে। আমরা চাই, যে এমপি হবে সে কৃষকের কথা বলুক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বগুড়ার নির্বাচনে এবার বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান ইস্যু। ভোটাররা আগের মতো আবেগ বা দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর না করে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও এলাকার জন্য কাজের পরিকল্পনা দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন।

বিশেষ করে এবার বগুড়ার সাতটি সংসদীয় আসনে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, বাম দল ও কয়েকটি ছোট দলের প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী জেলা হিসেবে বগুড়ার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পারিবারিক ও রাজনৈতিক শিকড়ও এ জেলায় প্রোথিত। সে কারণেই প্রতিটি নির্বাচনে বগুড়া বিএনপির জন্য প্রতীকী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বগুড়া-১ থেকে বগুড়া-৭ প্রতিটি আসনেই একাধিক পরিচিত মুখ বিশেষ করে তারেক রহমান নিজে প্রার্থী থাকায় ভোটের লড়াই জমে উঠছে। এছাড়া প্রায় সব আসনেই সাবেক এমপি, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা এবং প্রভাবশালী স্থানীয় রাজনীতিকদের কারণে হেভিওয়েট লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই জেলায় মোট ভোটার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৬৭২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৯৮৩টি। আর মোট ভোট কক্ষ থাকছে (বুথ) ৫ হাজার ৫৭৭টি। অর্থাৎ সাতটি আসনে গড়ে প্রতি আসনে ভোটার রয়েছে চার লাখের বেশি। জেলার শহরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলো তুলনামূলক ছোট হলেও গ্রামীণ আসনগুলোতে কেন্দ্র ও বুথ সংখ্যা বেশি।

এমএন/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow