জীবননগরের দৌলতগঞ্জ। সীমান্ত ঘেঁষা একটি জনপদ। এখানকার মানুষ বহু বছর ধরে স্বপ্ন দেখছিল একদিন আবার চালু হবে তাদের প্রাণের স্থলবন্দর। সেই স্বপ্ন হয়ত পূর্ণ হতে পারত। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দিলো দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দর আর নেই।
জানা যায়, দেশভাগের পর দৌলতগঞ্জ (বাংলাদেশ) মাজদিয়া (ভারত) শুল্ক স্টেশন চালু হয়েছিল। যার নাম ছিল দৌলতগঞ্জ-মাজদিয়া স্থলবন্দর। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে অন্যান্য স্টেশন খুললেও বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগরের দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দর আর চালু হয়নি।
১৯৭২ সালে কাগজে-কলমে স্টেশনটি আবার চালুর ঘোষণা আসে। এরপর ১৯৯৮ ও ২০০৯ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থগিতাদেশও তুলে নেয়। ২০১৩ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর ঘোষণা করে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনও করেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। অতঃপর বছরের পর বছর এটি থেকে যায় শুধু সরকারি কাগজে আর মানুষের প্রত্যাশায়।
বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত
চলতি বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় দেশের চারটি স্থলবন্দর বন্ধ রাখার সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল জীবননগরের দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দরটিও। সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
মেনে নিলেও এলাকাবাসীর মুখে হতাশার ছাপ
দৌলতগঞ্জ এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বলেন, এই বন্দরটি চালু হলে জীবননগরবাসীর ভাগ্য বদলে যেত। সীমান্ত বাণিজ্য বাড়লে বাজার জমে উঠত, ব্যবসা বাড়ত।
মিঠুন মাহমুদ নামের একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর আর চালু হয়নি বন্দরটি। ছোট থেকে আমরা শুধু শুনেছি, কাগজে-কলমে বন্দর চালু আছে। বাস্তবে কখনো হয়নি। এবার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটালো।
ডাবলু নামের এক তরুণ হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এখানে কর্মসংস্থানের কত সুযোগ তৈরি হতে পারত। সরকারের উচিত সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা।
চুয়াডাঙ্গা চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহারিন হক মালিক, স্থানীয় একটি পত্রিকার প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপনসহ কয়েকজন বলেন, দৌলতগঞ্জ বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সীমান্ত ঘেঁষা এলাকার কৃষিপণ্য আমদানি-রপ্তানির পথ সংকুচিত হলো। দেশের কৃষিপণ্য ভারতে সহজে পাঠানো যেত এই পথে।
তারা বিকল্প হিসেবে দর্শনা রেলবন্দরকে আধুনিকীকরণ করা ও দর্শনায় পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর দ্রুত চালুর পরামর্শ দেন।
২০১৩ সালে দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়েছিল। কিন্তু সেদিন থেকে এটি টিকেছিল কেবল কাগজে-কলমে। বাস্তবে কোনো কার্যক্রমই হয়নি। ফলে যেভাবে কাগজে বন্দরটির জন্ম হয়েছিল, সেভাবেই কাগজে-কলমেই তার মৃত্যু হলো। জীবননগরবাসীর জন্য দৌলতগঞ্জ বন্দর রয়ে গেল কেবল স্মৃতির নাম, সম্ভাবনার অপমৃত্যুর প্রতীক।
এমএন/এমএস