প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন: কগনিটিভ আর্কিটেকচার ও সার্বভৌমত্বের নবায়ন

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত জটিল এক ‘রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন’ বা State Reconstruction-এর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় প্রহরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতি আর কেবল প্রথাগত ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এখন ‘অ্যালগরিদমিক প্রজ্ঞা’ (Algorithmic Intelligence) এবং ‘উপাত্তের সার্বভৌমত্ব’ (Data Sovereignty)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত।  বিগত দেড় দশকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যে ‘এককেন্দ্রিক বয়ান’ রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত করা হয়েছিল, তার নিবিড় ব্যবচ্ছেদ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, অবকাঠামোগত কিছু প্রসারণ ঘটলেও প্রকৃত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা (State Capability) এবং প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন (Technological Autonomy) অর্জনে এক প্রকার নীতিগত স্থবিরতা এবং ‘সিস্টেমিক এন্ট্রপি’ (Systemic Entropy) বা সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়েছে। ১. নীতিগত বিচ্যুতি ও যান্ত্রিকীকরণের সীমাবদ্ধতা বিগত পনের বছরে বাংলাদেশে যা বাস্তবায়িত হয়েছে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মেকানাইজেশন অব ব্যুরোক্রাসি’ (Mechanization of Bureaucracy) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটি মূলত একটি ‘অ্যানালগ-ট

প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন: কগনিটিভ আর্কিটেকচার ও সার্বভৌমত্বের নবায়ন

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত জটিল এক ‘রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন’ বা State Reconstruction-এর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় প্রহরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতি আর কেবল প্রথাগত ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এখন ‘অ্যালগরিদমিক প্রজ্ঞা’ (Algorithmic Intelligence) এবং ‘উপাত্তের সার্বভৌমত্ব’ (Data Sovereignty)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। 

বিগত দেড় দশকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যে ‘এককেন্দ্রিক বয়ান’ রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত করা হয়েছিল, তার নিবিড় ব্যবচ্ছেদ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, অবকাঠামোগত কিছু প্রসারণ ঘটলেও প্রকৃত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা (State Capability) এবং প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন (Technological Autonomy) অর্জনে এক প্রকার নীতিগত স্থবিরতা এবং ‘সিস্টেমিক এন্ট্রপি’ (Systemic Entropy) বা সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়েছে।

১. নীতিগত বিচ্যুতি ও যান্ত্রিকীকরণের সীমাবদ্ধতা

বিগত পনের বছরে বাংলাদেশে যা বাস্তবায়িত হয়েছে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মেকানাইজেশন অব ব্যুরোক্রাসি’ (Mechanization of Bureaucracy) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটি মূলত একটি ‘অ্যানালগ-টু-ডিজিটাল’ রূপান্তর মাত্র, যার অন্তরালে কোনো শক্তিশালী অ্যালগরিদমিক ডিটারমিনিজম (Algorithmic Determinism) বা প্রজ্ঞানির্ভর নীতিনির্ধারণী ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। এই দীর্ঘ সময়ের নীতি-দর্শনে প্রধানত তিনটি মৌলিক সংকট বিদ্যমান ছিল:

•    ভোক্তা-মানসিকতা ও কারিগরি পরাধীনতা: বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিদেশি প্রোপাইটারি (Proprietary) সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আমদানির সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে এক ধরণের ‘টেকনোলজিক্যাল কলোনিয়ালিজম’ (Technological Colonialism) বা প্রযুক্তিগত উপনিবেশবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশীয় সক্ষমতায় কোনো ‘ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইকোসিস্টেম’ গড়ে না ওঠায় রাষ্ট্র আজ বিদেশি ভেন্ডরদের ওপর কৌশলগতভাবে জিম্মি।

•    উপাত্তের নৈরাজ্য ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি: নাগরিকদের ব্যক্তিগত উপাত্ত একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। অথচ গত দেড় দশকে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা বা ‘ডেটা সলিডারিটি’র ক্ষেত্রে কোনো নিশ্ছিদ্র বর্ম তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এই অদূরদর্শিতা রাষ্ট্রের এপিস্টেমিক অটোনমি (Epistemic Autonomy) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতাকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

•    প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়িষ্ণুতা ও সমন্বয়হীনতা: আইসিটি প্রশাসনে বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্য থাকায় ইন্টারঅপারেবিলিটি (Interoperability) নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে সরকারি তথ্যভাণ্ডারগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে, যা সমন্বিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম।

২. জাতীয় কগনিটিভ আর্কিটেকচার: একটি ‘সফটওয়্যার-ডিফাইনড স্টেট’

বর্তমান সংস্কারমুখী সরকারের জন্য রাষ্ট্রের আধুনিকায়ন কেবল কিছু যান্ত্রিক মানোন্নয়ন নয়; এটি হতে হবে একটি ‘সফটওয়্যার-ডিফাইনড স্টেট’ (Software-Defined State)। রাষ্ট্রকে এখন কেবল ‘তথ্য-চালিত’ (Data-driven) হলে চলবে না, বরং হতে হবে ‘প্রজ্ঞা-অভিযোজিত’ (Wisdom-adaptive)।

একটি কগনিটিভ আর্কিটেকচার (Cognitive Architecture) সমৃদ্ধ রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আগাম সংকট মোকাবিলায় (Predictive Governance) সক্ষম হয়। গত পনের বছরে এই ধরণের কোনো ‘ইন্টেলিজেন্ট এজেন্ট’ বা ‘ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’ স্থাপিত না হওয়ায় রাষ্ট্র আজ রিয়েল-টাইম নীতিনির্ধারণে পিছিয়ে আছে। আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পূর্বশর্ত হলো সরকারের প্রতিটি স্তরকে একটি ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার (Distributed Ledger) এবং বুদ্ধিমান সিস্টেমের মাধ্যমে সুসংহত করা।

৩. বৈশ্বিক সাইবার স্থিতিস্থাপকতা: জিরো-ট্রাস্ট ডকট্রিন

বর্তমানে বৈশ্বিক যুদ্ধের রণক্ষেত্র আর কেবল ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ‘বাইট-লেভেল কিল চেইন’ (Byte-level Kill Chain)-এর লড়াই। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (Critical Information Infrastructure) বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে একটি ‘জিরো-ট্রাস্ট ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডকট্রিন’ (Zero-Trust National Security Doctrine) গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এর মূল নির্যাস হলো—রাষ্ট্রের নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরে বা বাইরে কোনো ট্রাফিককেই প্রশ্নহীনভাবে নিরাপদ (Implicit Trust) ভাবা হবে না। প্রতিটি ডিজিটাল ট্রানজাকশন এবং ‘ডেটা ইন মোশন’ (Data in Motion)-কে একটি সার্বভৌম মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আনা অপরিহার্য।

৪. রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠনে ৫-স্তম্ভের কৌশলগত পথনকশা

একটি আধুনিক ও বুদ্ধিমান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে নীতিনির্ধারকদের নিম্নোক্ত পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে:

•    সার্বভৌম এআই ও জাতীয় এলএলএম (Sovereign LLM): বিদেশি এআই মডেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব ভাষাগত ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে প্রশিক্ষিত ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ তৈরি করা অপরিহার্য। এটি নীতিনির্ধারণে পক্ষপাতহীন এবং উপাত্ত-নির্ভর দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।

•    সার্বভৌম জাতীয় ক্লাউড (National Cloud Strategy): বিদেশি পাবলিক ক্লাউড পরিকাঠামোয় জাতীয় তথ্য গচ্ছিত রাখা কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক। নিজস্ব ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’ এবং সার্বভৌম ক্লাউড তৈরি করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

•    সাইবার কমান্ড ও ডিজিটাল রেজিলিয়েন্স: সশস্ত্র বাহিনীর সমান্তরালে একটি দক্ষ সাইবার কমান্ড গড়ে তোলা জরুরি। এটি কেবল আক্রমণ প্রতিহত করবে না, বরং রাষ্ট্রের ডিজিটাল স্থায়িত্ব বা সাইবার রেজিলিয়েন্স (Cyber Resilience) নিশ্চিত করবে।

•    ব্লকচেইন-ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্ট গভর্ন্যান্স: সরকারি কেনাকাটা, টেন্ডার এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় ‘ইমিউটেবল রেকর্ড’ (Immutable Record) নিশ্চিত করতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। এটিই হবে পদ্ধতিগত দুর্নীতি নির্মূলের প্রধান হাতিয়ার।

•    ইনটেলেকচুয়াল ক্যাপিটাল পুল (Global Knowledge Network): বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিশেষজ্ঞ গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে একটি ‘মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব’ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

৫. মেধাভিত্তিক সার্বভৌমত্বের পুনর্জাগরণ

রাষ্ট্রীয় আধুনিকায়ন কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা হতে পারে না; এটি রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে একবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক ও মেধাভিত্তিক মহাপ্রকল্প। গত দেড় দশকে যে নীতিগত ও কারিগরি শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ করার জন্য প্রয়োজন অসীম সাহসিকতা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কগনিটিভ ট্রান্সফরমেশন (Cognitive Transformation)।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই জটিল সমীকরণে সেই রাষ্ট্রই নেতৃত্ব দেবে যার মেধা-কাঠামো (Cognitive Infrastructure) সুরক্ষিত এবং আধুনিক। সময় এসেছে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি বুদ্ধিমান, সুরক্ষিত এবং প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলার। এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা পূরণে মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: ড. মোহাম্মদ রাইসউদ্দিন আহমেদ 

অধ্যাপক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক আইসিটি নীতি বিশেষজ্ঞ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow