প্রযুক্তির অদৃশ্য ফাঁদ: সুবিধা নাকি পরাধীনতা?
আমির হোসেন আমার সকাল শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে। ঠিক আপনারও আমার মতোই রুটিন। কিন্তু সে অ্যালার্ম বাজে আমার হাতের মুঠোয় থাকা ওই যন্ত্রটায়, যাকে আমরা স্মার্টফোন বলি। চোখ কচলাতে কচলাতে প্রথম কাজই হলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করা, মেসেজ চেক করা। আর শুধু আমি কেন, আশপাশে যতজন মানুষ দেখি, প্রায় সবারই একই রুটিন। ব্যাপারটা এতই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, কেউ আলাদা করে আর ভাবিও না। কিন্তু একটু থামুন তো! সত্যি করে বলুন, শেষ কবে আপনি একটা পুরো দিন কাটিয়েছেন আপনার ফোনটা ছাড়া? বা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া অফিস করেছেন? ভাবতে গেলে কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হয় না? এই যে আমাদের জীবন, কর্মক্ষেত্র, বিনোদন, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও প্রযুক্তির জালের ভেতর এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, এর নামই তো প্রযুক্তি-নির্ভরতা। কিন্তু এটা কি কেবলই সুবিধা? নাকি আমরা অজান্তেই এক অদৃশ্য শেকলের বাঁধনে বাঁধা পড়ছি? আমার তো মনে হয়, আমরা একটা বিরাট গোলকধাঁধার মুখে দাঁড়িয়ে। আরও পড়ুন বিশ্বকাপের পর হালান্ড-মেসি-ইয়ামাল-ভোজিনহা কার ফলোয়ার কত বাড়লো? ধরুন, আপনি হয়তো ভাবছেন, ‘কী বলছেন ভাই! প্রযুক্তি ছাড়া কি এখন এক পাও চলা যায়? সব তো সহজ করে
আমির হোসেন
আমার সকাল শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে। ঠিক আপনারও আমার মতোই রুটিন। কিন্তু সে অ্যালার্ম বাজে আমার হাতের মুঠোয় থাকা ওই যন্ত্রটায়, যাকে আমরা স্মার্টফোন বলি। চোখ কচলাতে কচলাতে প্রথম কাজই হলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করা, মেসেজ চেক করা। আর শুধু আমি কেন, আশপাশে যতজন মানুষ দেখি, প্রায় সবারই একই রুটিন। ব্যাপারটা এতই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, কেউ আলাদা করে আর ভাবিও না।
কিন্তু একটু থামুন তো! সত্যি করে বলুন, শেষ কবে আপনি একটা পুরো দিন কাটিয়েছেন আপনার ফোনটা ছাড়া? বা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া অফিস করেছেন? ভাবতে গেলে কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হয় না? এই যে আমাদের জীবন, কর্মক্ষেত্র, বিনোদন, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও প্রযুক্তির জালের ভেতর এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, এর নামই তো প্রযুক্তি-নির্ভরতা।
কিন্তু এটা কি কেবলই সুবিধা? নাকি আমরা অজান্তেই এক অদৃশ্য শেকলের বাঁধনে বাঁধা পড়ছি? আমার তো মনে হয়, আমরা একটা বিরাট গোলকধাঁধার মুখে দাঁড়িয়ে।
ধরুন, আপনি হয়তো ভাবছেন, ‘কী বলছেন ভাই! প্রযুক্তি ছাড়া কি এখন এক পাও চলা যায়? সব তো সহজ করে দিয়েছে।’ কথা সত্যি। একটা সময় ছিল যখন জরুরি খবর পাঠাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হতো। এখন হোয়াটসঅ্যাপে এক নিমেষে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে খবর চলে যায়। গুগল ম্যাপ না থাকলে কত নতুন শহরে পথ হারাতে হতো, তার ইয়ত্তা নেই। ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানোটা এখন স্মৃতি। কেনাকাটা? সে-তো, দরজায় পৌঁছে যায়। ক্লাস? জুম বা গুগল মিটে। অফিস? ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট থাকলেই ব্যস। হাতের মুঠোয় দুনিয়ার খবর, বিনোদন, জ্ঞান সবই তো আছে। এই সুবিধাগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। অস্বীকার করলে তো নিজেকেই বোকা প্রমাণ করা হবে।
কিন্তু মুশকিলটা হলো, এই সুবিধার আড়ালে আমরা কখন যে এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম, তা টেরও পেলাম না। একবার ভাবুন, আপনার ইন্টারনেট সংযোগটা যদি হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কেমন লাগবে? প্রথম দিকে হয়তো বিরক্তি, তারপর অস্থিরতা। জরুরি কাজ আটকে যাবে, প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হবে, বিনোদনের উৎস শুকিয়ে যাবে। আর যদি পুরো একদিন বা দু'দিন এমন হয়? আমার তো মনে হয়, অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারানোর উপক্রম হবে! এই যে সামান্য একটা যন্ত্র বা ইন্টারনেট চলে গেলে আমাদের জীবনযাত্রা থমকে যায়, এর নামই তো চরম নির্ভরতা। এটা কি আর শুধু সুবিধা ভোগ করা? এটা তো একরকমের পরাধীনতা।
আজকালকার বাচ্চাদের দিকে তাকান। একটা ছোট্ট শিশুও মায়ের হাতের ফোনটা না পেলে খাবার খেতে চায় না। কার্টুন বা গেমে মজে না থাকলে ওর মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। আমরা বাবা-মায়েরা হয়তো ভাবছি, ‘আহ, বেশ তো, বাচ্চারা শান্তিতে আছে।’ কিন্তু আমরা কি ওদের এক চরম শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছি না? বাস্তব জগতের খেলাধুলা, মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া, প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যতা, এই সবকিছু থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের কল্পনাশক্তির উড়ান বাধা পাচ্ছে, সামাজিক দক্ষতাগুলো ঠিকভাবে বিকশিত হচ্ছে না। এবং এর জন্য আসলে দায়ী কে? আমরাই তো, যারা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি ওই স্ক্রিনটা।
অফিসের কথাই ধরুন। ই-মেইল, অনলাইন মিটিং, প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার, সবই তো কাজের গতি বাড়িয়েছে। কিন্তু এর একটা উল্টো দিকও আছে। কাজের সময়সীমা বলে কিছু থাকছে না। ২৪/৭ আপনি আপনার বস বা সহকর্মীদের কাছে ‘এভেইলেবল’। ছুটি নিয়েও মুক্তি নেই, কারণ ল্যাপটপটা তো আপনার সঙ্গেই আছে। কাজের চাপ বাড়ছে, মানসিক অবসাদ বাড়ছে। আর সত্যি বলতে কি, আমরা নিজেদের দক্ষতাগুলোকেও প্রযুক্তির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি। ছোটখাটো হিসাবনিকাশ, বানান যাচাই, তথ্য সংগ্রহ, সবকিছুর জন্য আমরা যন্ত্রের ওপর ভরসা করছি। আমাদের নিজেদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে কিনা, সে প্রশ্নটা কি আমরা কখনো করি?
আরেকটা ভয়ঙ্কর দিক হলো, আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য। আমরা হাসি মুখে সব উজাড় করে দিচ্ছি বিভিন্ন অ্যাপ আর ওয়েবসাইটে। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, কার সঙ্গে কথা বলছি, সবই তো রেকর্ড হচ্ছে। একটা অ্যাপ ইনস্টল করার সময় শর্তাবলী না পড়েই ‘অ্যালো’ করে দিই সবকিছুর অ্যাক্সেস। এই তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কি যথেষ্ট সচেতন? হ্যাকিং, ডাটা চুরি, এগুলোর খবর তো রোজই শুনি। কিন্তু আমরা কি পাত্তা দিই? হয়তো দিই না। কারণ ওই যে, সুবিধার মোহে আমরা অন্য সব কিছু ভুলে যাই।
সামাজিক সম্পর্কগুলোও কেমন যেন বদলে গেছে। একসঙ্গে বসে গল্প করার বদলে সবাই নিজের নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত। পাশের মানুষটা কী করছে, তা জানার চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ার ‘বন্ধুদের’ খবর বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে একাকিত্ব বাড়ছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে কানেক্টিভিটিও বাড়ছে। এই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! লাইক, শেয়ার, কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে আমরা নিজেদের মূল্য বিচার করছি। ভার্চুয়াল জগতের একটা ছবি হয়তো হাজারো ফিল্টার দিয়ে সুন্দর করে পোস্ট করলাম, কিন্তু বাস্তব জীবনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা নিয়ে হয়তো সন্তুষ্ট নই। এই যে একটা দ্বৈত জীবন, এটা কি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? একদমই না। বরং এটা চরম এক অস্থিরতা তৈরি করে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রযুক্তি কিন্তু নিজেই ভালো বা মন্দ নয়। ছুরি দিয়ে একজন সার্জন জীবন বাঁচাতে পারেন, আবার একজন খুনী তা দিয়ে হত্যাও করতে পারে। ব্যাপারটা হলো, আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি। আমরা কি এর রাশ টেনে ধরতে পারছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের চালাচ্ছে? আমার তো মনে হয়, লাগামটা এখন প্রযুক্তির হাতেই। আমরা যেন এক গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছি, যেখানে বেরোনোর পথটা আমরা খুঁজছি না, বরং আরও গভীরে প্রবেশ করছি।
ভবিষ্যতের কথা ভাবুন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন আরও উন্নত হবে, তখন কী হবে? ড্রাইভারহীন গাড়ি, রোবট শেফ, স্বয়ংক্রিয় ফ্যাক্টরি, এগুলো কি আমাদের কাজ কেড়ে নেবে? নাকি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করবে? প্রশ্নটা জটিল। কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার, যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে প্রযুক্তির ওপর আমাদের এই অন্ধ নির্ভরতা একসময় আমাদেরকেই অকেজো করে তুলবে। আমাদের নিজস্ব বুদ্ধি, বিচার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, এ সবকিছুই যন্ত্রের হাতে তুলে দিয়ে আমরা কেবল দর্শক হয়ে বসে থাকব।
আমি কোনোভাবেই প্রযুক্তির বিরোধিতা করছি না। কারণ আমিও এর সুবিধা ভোগ করি। কিন্তু একটা প্রশ্ন নিজেকে করি, আর আপনাদেরও করতে বলি: আমরা কি সত্যিই প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছি, নাকি এটা আমাদের গ্রাস করে ফেলছে? আমাদের কি একটা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ এর খুব দরকার নেই? মাঝে মাঝে ফোনটা বন্ধ করে প্রিয়জনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, একটা বই পড়া, প্রকৃতির কোলে হেঁটে আসা এই সহজ কাজগুলোও কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?
আসলে, প্রযুক্তি নির্ভরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজেদের মানসিকতা বদলাতে হবে। বুঝতে হবে, যন্ত্র কেবলই একটা যন্ত্র। সে আমাদের জীবন সহজ করতে পারে, কিন্তু জীবনের সংজ্ঞাটা সে দিতে পারে না। জীবনের সৌন্দর্যটা লুকিয়ে আছে বাস্তবতার গভীরে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগে, প্রকৃতির ছোঁয়ায়। তাই আসুন, প্রযুক্তির সুবিধা নিন, কিন্তু এর কাছে নিজেদের সঁপে দেবেন না। অদৃশ্য এই শেকলটা ভাঙতে হবে, মুক্তির স্বাদ পেতে হবে। নয়তো একদিন দেখা যাবে, আমরা স্বাধীন হয়েও পরাধীনতার এক নতুন জালে আটকা পড়েছি। ভাবুন তো একবার। এই ভাবনাটা সত্যি আমার ভেতরে একটা অস্বস্তি জাগায়। আর আপনাদের জাগায় না?
লেখক: এসইও বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং কন্টেন্ট রাইটার।
কেএসকে
What's Your Reaction?

