প্রশংসায় ভাসছে পাকিস্তান, ইরান যুদ্ধে নীরব কেন ভারত?

ইরান যুদ্ধ ঘিরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে দেশটির ভেতরে এখন তীব্র বিতর্ক চলছে। মূল প্রশ্ন—ভারত কি সতর্ক কৌশল নিচ্ছে, নাকি অতিরিক্ত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে? ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ব্যর্থ আলোচনার পর সমালোচকরা অভিযোগ করছেন, ভারত তার অর্থনৈতিক শক্তি, প্রবাসী প্রভাব ও কূটনৈতিক পুঁজি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। বরং তাদের পর্দার আড়ালের শান্ত কূটনীতির কারণে দৃশ্যমান ভূমিকা চলে গেছে পাকিস্তানের হাতে। অন্তত বাহ্যিকভাবে উচ্চঝুঁকির এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ। নীরব কূটনীতি নাকি সীমাবদ্ধতা? সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনায় মূলত জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরও ছিল আশ্বাস ও সমন্বয়কেন্দ্রিক, সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়। আরও পড়ুন>>যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ/ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে পাকিস্তান?‘যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা নিয়ে’ ইরানে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানপাকিস্তান আমাকে চায়, আমি হয়তো সেখানে যাবো: ট্রাম্প বাহ্যিকভা

প্রশংসায় ভাসছে পাকিস্তান, ইরান যুদ্ধে নীরব কেন ভারত?

ইরান যুদ্ধ ঘিরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে দেশটির ভেতরে এখন তীব্র বিতর্ক চলছে। মূল প্রশ্ন—ভারত কি সতর্ক কৌশল নিচ্ছে, নাকি অতিরিক্ত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে?

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ব্যর্থ আলোচনার পর সমালোচকরা অভিযোগ করছেন, ভারত তার অর্থনৈতিক শক্তি, প্রবাসী প্রভাব ও কূটনৈতিক পুঁজি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। বরং তাদের পর্দার আড়ালের শান্ত কূটনীতির কারণে দৃশ্যমান ভূমিকা চলে গেছে পাকিস্তানের হাতে। অন্তত বাহ্যিকভাবে উচ্চঝুঁকির এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ।

নীরব কূটনীতি নাকি সীমাবদ্ধতা?

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনায় মূলত জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরও ছিল আশ্বাস ও সমন্বয়কেন্দ্রিক, সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়।

আরও পড়ুন>>
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ/ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে পাকিস্তান?
‘যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা নিয়ে’ ইরানে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান

পাকিস্তান আমাকে চায়, আমি হয়তো সেখানে যাবো: ট্রাম্প

বাহ্যিকভাবে এটি সতর্কতা বা নিষ্ক্রিয়তা মনে হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতারই প্রতিফলন।

ভারতের যত সমস্যা

উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি হলো চাপের মুখে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখার একটি আদর্শ উদাহরণ। নয়াদিল্লি সম্পর্কের এমন এক জালে আটকে রয়েছে যা তাকে একই সঙ্গে বিভিন্ন দিকে টানে।

ভারত প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত; জ্বালানি এবং চাবাহারের মাধ্যমে কানেক্টিভিটির জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল; প্রতিরক্ষার বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত; আবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিকের জীবিকার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিকভাবে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

এই বাস্তবতায় একদিকে ঝুঁকলে অন্যদিকে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। যেমন—ইরানকে সমর্থন দিলে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সমর্থন করলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার লাইফলাইন হুমকির মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এগিয়ে আসারও নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে—ব্যর্থ হলে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে। অন্য কথায়, যা দ্বিধা বলে মনে হচ্ছে, তা আসলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার চড়া মূল্য।

বাহ্যিক পরিস্থিতির কারণে ভারতের কৌশলী হওয়ার জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে এসেছে। চীন-পাকিস্তান কৌশলগত অংশীদারত্ব মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের আঞ্চলিক সক্রিয়তার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান নতুন করে সম্পৃক্ত হওয়া ভারতের জন্য কূটনৈতিক অস্বস্তি এবং আঞ্চলিক ভাবমূর্তিকে জটিল করে তুলছে।

তাছাড়া, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি প্রবাহের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ভারত জ্বালানি সংকটের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সীমাবদ্ধতা যেকোনো সাহসী নীতিগত পরিবর্তনের পথে বাধা হিসেবে কাজ করে।

পাকিস্তানের ‘দৃশ্যমান’ সক্রিয়তা

পাকিস্তানের দৃশ্যমান সক্রিয়তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কৌশলগত মডেল থেকে উদ্ভূত। ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মাঝে ভৌগোলিক অবস্থান, তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা, সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা যোগসূত্র এবং চীনের সমর্থন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ এমন এক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে যা অন্য কোথাও আয়োজন করা কঠিন হতো।

পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার চেষ্টাগুলো কোনো স্বায়ত্তশাসিত শক্তির চেয়ে বরং বাহ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমেই বেশি কার্যকর হয়েছে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ভূমিকা একজন সহায়তাকারীর, ফলাফল নির্ধারণকারীর নয়। এর প্রভাব মূলত ধার করা—যা তার নিজস্ব অর্থনৈতিক বা কৌশলগত ওজনের চেয়ে বাহ্যিক সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই টিকে আছে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মূল্য

ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতি অনুসরণ করে আসছে। এর মানে হলো, কোনো শক্তির ব্লকে সম্পূর্ণভাবে না গিয়ে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা। কিন্তু এই নীতি অনেক সময় দ্ব্যর্থতার মতো দেখাতে পারে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন যখন অতিমাত্রায় প্রসারিত হয়, তখন তা কৌশলগত অস্পষ্টতায় পর্যবসিত হতে পারে।

অবশ্য এমন কিছু পরিস্থিতি আসতে পারে যেখানে ভারতকে আরও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। হরমুজ প্রণালিতে যদি ক্রমাগত বিঘ্ন ঘটে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়, তবে তা সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে এবং একটি কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় প্রবাসীদের নিয়ে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হলেও সক্রিয় কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হবে। আর যদি এই সংঘর্ষ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-উপসাগরীয় ব্লক বনাম ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে ভারতের পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন নিজের মূল স্বার্থ রক্ষায় ভারতকে কোনো এক দিকে ঝুঁকতেই হবে। এমনকি এমন পরিস্থিতিতেও ভারত সম্ভবত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন পুরোপুরি বিসর্জন দেবে না, বরং বড়জোর একে নতুন করে সাজাবে।

ততদিন পর্যন্ত ভারত সম্ভবত তার বর্তমান পথেই থাকবে—সতর্ক এবং পর্যবেক্ষণশীল, কিন্তু সরাসরি হস্তক্ষেপকারী নয়। এই সংযমের পেছনে আরেকটি কারণ আছে, যা খুব একটা আলোচিত হয় না: অনিশ্চয়তা।

মার্কিন নীতি, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে, এতটাই অসংলগ্ন ছিল যে দৃশ্যমান কোনো কূটনৈতিক ভূমিকা নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে প্রক্রিয়ার ফলাফল এবং বয়ান হঠাৎ বদলে যেতে পারে, সেখানে ভারত নিজেকে জড়াতে আগ্রহী নয়।

সামনে কী?

বর্তমানে পাকিস্তানের ওপর হয়তো স্পটলাইট রয়েছে, কিন্তু ভারতের স্বার্থ অনেক গভীরে। ভারত আপাতত একটি দীর্ঘমেয়াদি খেলা খেলছে—যেখানে দৃশ্যমানতার চেয়ে নমনীয়তা এবং লোকদেখানো অবস্থানের চেয়ে সুদৃঢ় অবস্থানই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

এটি বিজ্ঞতা নাকি একটি হারানো সুযোগ ছিল, তা কেবল তখনই পরিষ্কার হবে যখন এই সংকট সংঘর্ষ থেকে মীমাংসার দিকে এগোবে। তখনই আসল প্রভাব কার্যকর হবে—কেবল বাহ্যিক প্রাসঙ্গিকতা নয়।

তবে এই সংঘর্ষ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে ভারতীয় অর্থনীতি আরও বেশি উন্মুক্ত ও অরক্ষিত হয়ে পড়বে। তখন ভারতের সামনে হয়তো নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ বেশিদিন থাকবে না।

লেখক: রঘু গুরুরাজ, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং অবসরপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র কর্মকর্তা
সূত্র: এশিয়া টাইমস

কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow