প্রসঙ্গ রথযাত্রা

‘রথযাত্রা’ হিন্দুদের জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রাচীন ভারতবর্ষে বিষ্ণু, শিব, সূর্য, ভগবতী প্রভৃতি দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের মধ্যে রথযাত্রা উৎসব প্রচলিত ছিল। বৌদ্ধ ও জৈনদের মধ্যেও বুদ্ধ এবং পার্শ্বনাথ ও মহাবীরকে নিয়ে রথযাত্রা যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। হিন্দু অথবা জৈন অথবা বৌদ্ধ; কোন সম্প্রদায় সর্বপ্রথম রথযাত্রা প্রবর্তন করেছিল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন, হিন্দুরাই তার প্রথম প্রবর্তক, কেউ জৈনদের, কেউবা বৌদ্ধদের ওই কৃতিত্বদানের পক্ষপাতী। প্রবর্তন যারাই করুক না কেন, বর্তমানে ভারতবর্ষে ‘রথযাত্রা’ বলতে আমরা পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বুঝি। অন্যসব রথযাত্রা উৎসব জগন্নাথের রথযাত্রায় যেন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, অথবা বলা যায় জগন্নাথের রথ অন্য সব রথকে যেন গ্রাস করে ফেলেছে।  আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে পুরীতে জগন্নাথের মূল রথযাত্রা মহাসমারোহে প্রতি বছর উদযাপিত হলেও ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ওই একই তারিখে এ উৎসব যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথের রথযাত্রার প্রবর্তনকাল জানা না গেলেও সেটি যে অন্ততপক্ষে দুই হাজার বছরের প্রাচীন, সে বিষয়

প্রসঙ্গ রথযাত্রা
‘রথযাত্রা’ হিন্দুদের জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রাচীন ভারতবর্ষে বিষ্ণু, শিব, সূর্য, ভগবতী প্রভৃতি দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের মধ্যে রথযাত্রা উৎসব প্রচলিত ছিল। বৌদ্ধ ও জৈনদের মধ্যেও বুদ্ধ এবং পার্শ্বনাথ ও মহাবীরকে নিয়ে রথযাত্রা যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। হিন্দু অথবা জৈন অথবা বৌদ্ধ; কোন সম্প্রদায় সর্বপ্রথম রথযাত্রা প্রবর্তন করেছিল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন, হিন্দুরাই তার প্রথম প্রবর্তক, কেউ জৈনদের, কেউবা বৌদ্ধদের ওই কৃতিত্বদানের পক্ষপাতী। প্রবর্তন যারাই করুক না কেন, বর্তমানে ভারতবর্ষে ‘রথযাত্রা’ বলতে আমরা পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বুঝি। অন্যসব রথযাত্রা উৎসব জগন্নাথের রথযাত্রায় যেন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, অথবা বলা যায় জগন্নাথের রথ অন্য সব রথকে যেন গ্রাস করে ফেলেছে।  আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে পুরীতে জগন্নাথের মূল রথযাত্রা মহাসমারোহে প্রতি বছর উদযাপিত হলেও ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ওই একই তারিখে এ উৎসব যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথের রথযাত্রার প্রবর্তনকাল জানা না গেলেও সেটি যে অন্ততপক্ষে দুই হাজার বছরের প্রাচীন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মহাপুরাণগুলির মধ্যে পদ্মপুরাণ ও স্কন্দপুরাণে সুস্পষ্টভাবে পুরুষোত্তমক্ষেত্রে বা পুরীতে জগন্নাথের রথযাত্রার উল্লেখ ও বর্ণনা থেকে আমরা ওই সিদ্ধান্তে আসতে পারি। উপাস্য বা দেববিগ্রহকে নিয়ে রথযাত্রা উৎসব প্রবর্তনের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? মন্দিরে তো বিগ্রহ নিত্য পূজিত হতেন, কখনো কখনো তাকে কেন্দ্র করে বিশেষ উৎসব-নুষ্ঠানাদিও পালিত হতো। তার ওপর আবার বিগ্রহকে নিয়ে রথভ্রমণ কেন? আমাদের মনে হয়, প্রথমত উপাস্যকে ভক্ত ও সাধকগণের নানাভাবে সম্ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই বিচিত্র উৎসবটির সূচনা হয়।  দ্বিতীয়ত, বিশেষ তিথিতে বা পর্ব উপলক্ষে মন্দিরে সমারোহ ও পূজার্চনার ব্যাপকতা নিশ্চয়ই থাকত, কিন্তু তা ছিল দৈনন্দিন পূজার্চনা ও আনুষ্ঠানিক বিধিবদ্ধতারই সম্প্রসারণ মাত্র। আনুষ্ঠানিক বিধিবদ্ধতা ও প্রাত্যহিক পূজার্চনা থেকে ভক্ত ও উপাসকদের মনে অবসাদ ও একঘেয়েমি আসা স্বাভাবিক। রথযাত্রা সেক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল বৈচিত্র্য সংযোজন করেছিল সন্দেহ নেই। তৃতীয়ত, প্রাত্যহিক পূজার্চনা এবং মন্দিরকেন্দ্রিক অন্যান্য উৎসব-নুষ্ঠানগুলি অপেক্ষা রথযাত্রার মধ্যে একটি ভিন্ন ধরনের চমৎকারিত্ব ও জাঁকজমকের ব্যাপার রয়েছে। সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করার পক্ষে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। চতুর্থত, রথযাত্রার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের সঙ্গে ব্যষ্টির আনন্দকে সর্বজনীন আনন্দে বিস্তৃত করার একটি আকান্দ্বা নিহিত ছিল বলে মনে হয়। মন্দিরে যে নিত্য পূজার্চনা, তাতে পূজক ও মুষ্টিমেয় ভক্ত অংশগ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে তা নিছকই মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তিবিশেষের অনুষ্ঠান। বিশেষ বিশেষ পর্ব উপলক্ষে যে মন্দিরকেন্দ্রিক উৎসব-অনুষ্ঠানের সমারোহ হতো, সেখানে অনেক মানুষ অংশগ্রহণ করলেও তাতে সমাজের অভিজাত সম্প্রদায় এবং উচ্চবর্ণেরই ছিল অংশগ্রহণের অধিকার। পূজা ও মহোৎসবের অঙ্গনে গণমানুষের কোনো স্থান ছিল না।  কিন্তু রথযাত্রায় রাজাধিরাজ ও ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে দীনদরিদ্র, অন্ত্যজ মানুষ সবাই উৎসবের আনন্দ সমভাগে ভাগ করে নিত। স্বার্থপরতার গণ্ডিকে ভেঙে অপর সকলের মধ্যে আনন্দকে প্রসারিত করে দেওয়ার যে বাসনা আমাদের পূর্বপুরুষগণের মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল, রথযাত্রার মধ্যে তাকে রূপদান করার একটি সচেতন প্রয়াসই আমরা লক্ষ্য করি।  আমাদের পূর্বপুরুষগণ যে সমাজে ধর্মীয় বিশেষ অধিকারের অবসান চাইতেন এবং উচ্চ-নীচ সকলকে নিয়ে একটি মিলিত সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, রথযাত্রার মধ্যে তার ইঙ্গিত আমরা পাই। উৎসবকে সর্বজনীন করার এই যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াস আমরা প্রাচীন ভারতবর্ষে দেখি, তা সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রাচীনত্বের দাবি করতে পারে কি না পণ্ডিতগণ গবেষণা করে দেখতে পারেন। সেইসঙ্গে তারা এও অনুসন্ধান করতে পারেন যে, ধর্মকে কেন্দ্র করে, ধর্মকে মাধ্যম করে ভারতবর্ষের মানুষ সাম্যকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার এই যে চিন্তাভাবনা ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল, তার চেয়ে প্রাচীনতর কোন চিন্তাভাবনা ও পদ্ধতির সংবাদ পৃথিবীর অন্যত্র রয়েছে কি না। পঞ্চমত, রথযাত্রার মতো একটি জনপ্রিয় উৎসব-নুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষগণ ধর্মকে সরলীকৃত ও সহজগ্রাহ্য করতে প্রয়াস করেছিলেন। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছিল : রথ হলো ভ্রাম্যমাণ মন্দির। যে-মন্দির অচল, যে-বিগ্রহ স্থাণু সেই মন্দির এবং সেই বিগ্রহ যেন মানুষের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত। সেই ভ্রাম্যমাণ মন্দির ও সচল বিগ্রহকে দেখে ধন্য হও, কৃতার্থ হও।  জনারণ্যে, প্রকাশ্য জনপথে ঈশ্বরের আগমন উপলক্ষে আনন্দ কর। এই উৎসবে অংশগ্রহণে বর্ণের কোনো ভেদ নেই, অর্থ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠারও কোনো স্থান নেই। দেবতার এই আনন্দযজ্ঞে আসাধারণের নির্বিচার নিমন্ত্রণ। শুধু এতে অংশগ্রহণেই তোমরা পরম গতির অধিকারী হবে, রথস্থ দেববিগ্রহকে শুধু দর্শনেই যাবতীয় সাধনার লক্ষ্য যে ঈশ্বরের পদস্পর্শ লাভ, তা তোমরা সুনিশ্চিতভাবে প্রাপ্ত হবে। এই ভাবটি রথযাত্রার মতো জনপ্রিয়, বর্ণময়, দৃষ্টি-আকর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খুব সহজে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবেশ করানো যে সম্ভব হয়েছিল, আজ দুহাজার বছর পর পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব দর্শন করে আমরা তা বুঝতে পারি। ধর্ম যে একটি সহজ বিষয়, দার্শনিক জটিলতা-কণ্টকিত দুর্বোধ্য কোনো ব্যাপার নয়, এটি সাধারণ মানুষকে বোঝানো প্রয়োজন; এই বিষয়টি অনুভব করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষগণ। তারা জানতেন, ধর্মকে দুর্বোধ্য করে সাধারণের নাগালের বাইরের ব্যাপার করে রাখলে সমাজই দুর্বল হয়ে পড়বে।  কারণ, ধর্মই তো মানুষকে ধারণ করে রাখে, ধর্ম সমাজকে পুষ্টি যোগায়, পরিবারকে শাশ্বত মূল্যবোধের ওপর স্থাপন করে মহাবিনষ্টি থেকে তাকে রক্ষা করে। ধর্মের মূল হলো ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস এই জগৎ-সংসাররূপ রথ যে প্রতিনিয়ত যথাযথ গতিবান রয়েছে সে তারই অঙ্গুলিহেলনে; তাতে বিশ্বাস। তাকে জানলে, তাকে পেলে, মানুষ সকল দুঃখ থেকে মুক্তিলাভ করে। ধর্মভাবনা ও ঈশ্বরভাবনাকে এবং তৎসম্পর্কিত আনন্দ-উৎসবকে স্ত্রী-পুরুষ, বালক-যুবা-বৃদ্ধ, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমবেতভাবে সম্ভোগ করার অপর কোন কার্যকরী পদ্ধতি রথযাত্রা ভিন্ন হিন্দুধর্মে আর নেই। খ্রিষ্টান ধর্মে এবং ইসলাম ধর্মে সমবেত প্রার্থনা ও উপাসনার ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু হিন্দুধর্মে ওইরকম কোনো অনুষ্ঠান নেই। মনে হয়, সমবেত প্রার্থনার প্রয়োজন মেটাতে রথযাত্রার উদ্ভব হয়ে থাকবে। [পরবর্তীকালে শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত নাম-সংকীর্তন আনুষ্ঠানিকভাবেই হিন্দুধর্মে সমবেত প্রার্থনা সংযোজিত করেছিল] রথ যেন ভ্রাম্যমাণ মন্দির এবং রথস্থ বিগ্রহ যেন চলমান মন্দির, বিগ্রহ; এই বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। রথকে স্পর্শ করার জন্য, রথস্থ বিগ্রহকে দর্শন করার জন্য বিশেষ করে পুরীতে রথযাত্রাকালে অগণিত মানুষ যে উদগ্র ব্যগ্রতা প্রকাশ করে, তা দেখে অবাক হতে হয়। পদ্মপুরাণের রথযাত্রা প্রকরণে বলা হয়েছে: ‘রথস্থিতং ব্রজন্তং তং মহাবেদী- মহোৎসবে। যে পশ্যন্তি মুদা ভক্ত্যা বাসস্তেষাং হরেঃ পদে।’ রথযাত্রার মহোৎসবে রথে গমনকারী তাকে (অর্থাৎ জগন্নাথদেবকে) যারা প্রীতি ও ভক্তির সঙ্গে দর্শন করেন, তারা হরি; পাদপদ্মে আশ্রয়লাভ করেন। পূজার্চনার প্রয়োজন নেই, ব্রত-উপবাসের প্রয়োজন নেই, ধ্যান-ভজনেরও প্রয়োজন নেই। শুধু রথস্থ দেববিগ্রহকে দর্শন করলেই হলো। শুধু একটি শর্ত–দর্শনের সঙ্গে যেন প্রীতি ও ভক্তি সংযুক্ত থাকে। ভক্তজনবাঞ্ছিত হরির পাদপদ্মে বাস তাতেই নিশ্চিত। শুধু কি হরির পাদপদ্মে বাস? জীবনের লক্ষ্য যে মুক্তিলাভ অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে পুনরাবর্তনের নিঃশেষ বিরতি; তাও সম্ভব হয় রথস্থ বিগ্রহকে দর্শন করলে। স্কন্দপুরাণের উৎকলখণ্ডে বলা হয়েছে: ‘রথস্থং (পাঠান্তরে ‘রথে তু’/‘রথে চ’) বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।’ রথস্থিত বামন অর্থাৎ বিষ্ণুকে (অর্থাৎ জগন্নাথদেবকে) দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। কিন্তু বাস্তবিক কি তা হতে পারে? এত অনায়াসে ঈশ্বরের নিত্যসান্নিধ্য প্রাপ্তি এবং সুদুর্লভ মুক্তিলাভ সম্ভব? রথের মধ্যে বিগ্রহকে দেখলেই যদি বৈকুণ্ঠবাস ও মুক্তিলাভ সম্ভব হতো, তাহলে তো প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের মুক্তি ও পরম গতি লাভ হয়ে যেত। অবশ্য সত্যকারের ভক্তিদৃষ্টি থাকলে তা নিশ্চয়ই সম্ভব। তবে রথযাত্রার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তা নয়। তবে তা কি? রথ ও রথস্থ বিগ্রহ হলো প্রকৃতপক্ষে প্রতীকী এবং তার মাধ্যমে বেদান্তের একটি গভীর দার্শনিক ভাবনা ও একটি সমুচ্চ ধর্মীয় তত্ত্বকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কঠোপনিষদে (১।৩।৩) বলা হচ্ছে : ‘আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু।’ হৃদিস্থিত আত্মাকে রথি এবং দেহযন্ত্রকে রথ বলে জানবে। দেহরূপ রথে ভগবানকে বসাও, দেহের মধ্যে দেহীরূপ আত্মাকে দর্শন কর, তুমিই যে তিনি তা উপলব্ধি কর। সেই অভিজ্ঞতার আনন্দই হলো প্রকৃত রথযাত্রার আনন্দ। সেই অভিজ্ঞতা লাভ হলে ভক্তিমার্গের সাধক ভগবানের দর্শন পাবেন, ভগবানের নিত্যসান্নিধ্য লাভ করে ধন্য হবেন জ্ঞানমার্গের সাধক আত্মসাক্ষাৎকার করবেন, মুক্তি বা ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করে জীবন সার্থক করবেন। ঘটাকাশ ভেঙে চিদাকাশে বিলীন হয়ে যাবে, নুনের পুতুল সমুদ্রে নিজের আকার হারিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে। স্থূল থেকে সূক্ষ্ম—দেহ থেকে আত্মার এই যাত্রাকে রথের গতি যেন প্রতীকায়িত করছে। ধর্ম মানুষকে গতির মন্ত্রেই উদ্বুদ্ধ করে। ধর্ম মানুষকে বলে, তুমি চল, চল, চল; চলতেই থাক। ‘চরৈবেতি’। যতক্ষণ তুমি সীমার বন্ধন থেকে বের হতে না পারছ, যতক্ষণ তুমি অসীমকে স্পর্শ করতে না পারছ, ততক্ষণ তুমি থামবে না। অসীমকে যখন পাবে তখনি; শুধু তখনি, তোমার জীবনরথের যাত্রা শেষ হবে৷ তখন তুমি উপলব্ধি করবে তুমিই তিনি, ‘তত্ত্বমসি’, আমিই তিনি–‘সোহম্’। উপলব্ধি করবে সকল বস্তুতেই তিনি বিরাজিত ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’ ‘ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়’। উপলব্ধি করবে, ‘হরিরেব জগৎ জগদেব হরিঃ।/হরিতো জগতো নহি ভিন্নতনুঃ৷’ হরিই জগত, জগতই হরি। হরি এবং জগত এক এবং অভিন্ন।  উপনিষদের ঋষির মতো তোমারও মর্মমূল থেকে উৎসারিত হবে সেই মহা-উন্সোষণ: ‘যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্ সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে৷’ (ঈশোপনিষদ্, ৬) –যিনি সকল প্রাণীকে নিজের মধ্যে এবং সকল প্রাণীর মধ্যে নিজেকে দেখেন, তিনি আর কাউকে ঘৃণা করেন না। সত্যিই তো। কে আর তখন কাকে ঘৃণা করবে, কে আর কাকে হিংসা করবে, কে আর কাকে আঘাত করবে? আমি কি আমাকে ঘৃণা করি, আমি কি আমাকে হিংসা করি, আমি কি নিজেকে আঘাত করি? সকলের মধ্যেই যে আমি, আমার মধ্যেই যে সকলে এই উপলব্ধিতেই জীবনের চরিতার্থতা, সাধনার পরিপূর্ণতা। চারণ-সন্ন্যাসী শ্রীচৈতন্য পুরীর পথে পথে হাঁটছেন। গৃহ-পথ, বৃক্ষ-লতা, মানুষ-পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, সরোবর-সমুদ্র যা দেখছেন তার মধ্যেই তিনি জগন্নাথকে দেখছেন, দেখছেন তার প্রিয়তম কৃষ্ণকে। বলছেন, ‘যাঁহা যাঁহা নেত্র পড়ে তাঁহা তাঁহাকৃষ্ণ স্ফুরে।’ আবার শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখি; চোর, সাধু সকলের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখছেন। একজন মানুষকে, একটি পতঙ্গকে কেউ আঘাত করলে তিনি যন্ত্রণায় চিৎকার করছেন, ঘাসের ওপর কেউ হাঁটলে তিনি ব্যথা পাচ্ছেন। শ্রীচৈতন্য এবং শ্রীরামকৃষ্ণ তখন তাদের দৃষ্টিকে নিজেদের সীমিত দৃষ্টির বাইরে নিয়ে গেছেন। তাই তারা সর্বত্র দেখছেন পুরুষোত্তমকে এবং স্বয়ংও হয়ে উঠেছেন পুরুষোত্তমের জীবন্ত বিগ্রহ। শ্রীচৈতন্য এবং শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও উপলব্ধিতে আমরা রথযাত্রার তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে প্রকটিত হতে দেখি। বস্তুত, অদ্বৈত অনুভূতিতেই রথযাত্রার সমাপ্তি। লেখক: অধ্যক্ষ ও সম্পাদক রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow