রোমান্টিক সম্পর্ক নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বন্ধুত্বও আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখের জন্য সমান—অনেক সময় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নতুন বন্ধুত্ব তৈরি করা কেন যেন খুব কঠিন হয়ে যায়। কেন এমন হয়?
একদিকে আছে বাস্তব সমস্যা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ, পরিবার, দায়িত্ব—সব মিলিয়ে জীবন অনেক জটিল হয়ে ওঠে। নতুন মানুষের সঙ্গে সময় দেওয়া বা সম্পর্ক গড়ার জন্য আলাদা শক্তি ও সময় বের করাই কঠিন হয়ে যায়।
অন্যদিকে, আমরা নিজের মতো করে ‘সেট’ হয়ে যাই। নতুন মানুষের কাছে নিজেকে খুলে দেওয়া, দুর্বলতা দেখানো—এসব আর আগের মতো সহজ থাকে না।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, আমাদের আবেগের জগৎ। বড় হওয়ার পর আমরা অনেক সময় ভাবি, এখন আর এসব ‘আবেগের সমস্যা’ থাকার কথা নয়। ফলে সেগুলো উপেক্ষা করি।
এই কারণেই হয়তো ‘বন্ধু বানানোর উপায়’ নিয়ে লেখা পড়তে গিয়েও অস্বস্তি লাগে। মনে হয় এগুলো তো ছোটবেলাতেই শেখার কথা! কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবন খুব একটা সহজ সূত্রে চলে না।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বন্ধুত্ব করা কেন এত কঠিন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভেতরের অনেক পুরোনো আবেগ, অভিজ্ঞতা আর হতাশা একটার ওপর আরেকটা জমতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের নানা চাপ ও প্রত্যাশা। সব মিলিয়ে নতুন সম্পর্ক তৈরি করা তখন স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব গড়ার পথে কয়েকটি সমস্যা বেশি কাজ করে,
প্রত্যাখ্যানের ভয়
নতুন কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে গেলে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি থাকেই। আর এই ভয়টা বড়দের ক্ষেত্রে খুব তীব্র হয়।
নতুন বন্ধু বানাতে গিয়ে নার্ভাস লাগা স্বাভাবিক; বরং এটা সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ। কিন্তু সমাজ আমাদের শেখায় প্রত্যাখ্যান মানেই ব্যর্থতা, যা যে কোনো মূল্যে এড়াতে হবে।
কিন্তু সত্যটা হলো, কেউ আপনার বন্ধু হতে না চাইলে সেটার মানে এই নয় যে আপনার কোনো মূল্য নেই। বরং এর মানে, আপনাদের দুজনের মধ্যে মিল নেই। এটা কষ্টের হলেও ভালো খবর—কারণ এতে আপনি এমন মানুষের খোঁজে এগোতে পারেন, যারা আপনাকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করবে।
নিজের দুর্বলতা লুকানোর চেষ্টা
গভীর বন্ধুত্ব গড়তে হলে নিজেকে যেমন, তেমনভাবেই তুলে ধরতে হয়, ভালো দিকের পাশাপাশি দুর্বল দিকগুলোও। এটা ভয়ংকর মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব তৈরি হয় এই খোলামেলার মধ্য দিয়েই।
অনেক সময় দেখা যায়, কেউ নিজের সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই জানিয়ে দেয়। এতে অদ্ভুতভাবে সম্পর্কটা আরও স্বচ্ছ হয়। কারণ তখন দুজনেই বুঝে যায়—এই বন্ধুত্বে কী আশা করা যায়, আর কী যায় না।
সব মানুষের সঙ্গে সব ধরনের বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। সেটা মেনে নেওয়াই পরিণত মনোভাব।
নতুন মানুষের জন্য সময় না রাখা
বন্ধুত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো একসঙ্গে সময় কাটানো। ছোটবেলায় স্কুল-কলেজে আমরা বাধ্য হয়েই একই মানুষের সঙ্গে অনেক সময় থাকতাম। তাই বন্ধুত্ব তৈরি হতো স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে সবাই আলাদা—নিজের পরিবার, চাকরি, দায়িত্ব, ব্যস্ততা নিয়ে।
তাই এই বয়সে বন্ধুত্ব গড়তে হলে ইচ্ছাকৃতভাবে সময় বের করতে হয়। নিয়মিত দেখা করা, আড্ডার পরিকল্পনা করা, কোনো গ্রুপ বা ক্লাবে যুক্ত হওয়া—এসব করতে হয় সচেতনভাবে।
প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বন্ধু বানানোর ৪টি কার্যকর কিন্তু একটু ভিন্নধর্মী নীতি
আগে নিজের যত্ন নিন
শুনতে স্বার্থপর লাগতে পারে, কিন্তু নিজের আগ্রহ, শখ ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলে আপনি নিজেই আরও আকর্ষণীয় মানুষ হয়ে ওঠেন। যারা নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ও ইতিবাচক, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাদের দিকে টানে। নিজেকে গুছিয়ে নিলে বন্ধুত্বেও ভারসাম্য আসে।
প্রত্যাখ্যানকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করুন
প্রত্যাখ্যান বন্ধুত্বের পথেরই অংশ। এটা থেকে শেখার চেষ্টা করুন। যত বেশি নিজেকে নতুন পরিস্থিতিতে রাখবেন, ততই মানসিকভাবে শক্ত হবেন। এতে ভুল মানুষগুলো বাদ পড়বে, আর সঠিক মানুষগুলো ধীরে ধীরে জীবনে আসবে।
কম কিন্তু গভীর বন্ধুত্ব বেছে নিন
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার দরকার নেই। অল্প কয়েকজন এমন মানুষ থাকলেই যথেষ্ট, যারা আপনাকে বোঝে এবং সমর্থন করে। অনেক পরিচিতের চেয়ে কয়েকজন প্রকৃত বন্ধু অনেক বেশি মূল্যবান।
অন্যদের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করবেন না
সুস্থ সম্পর্ক মানে কোনো শর্ত জুড়ে না দেওয়া। যখন আমরা প্রত্যাশা নিয়ে মানুষের কাছে যাই, তখন সেটি চাপ তৈরি করে। বরং নিঃস্বার্থভাবে সময়, সাহায্য বা মনোযোগ দিন। এতে এমন মানুষই আপনার কাছে আসবে, যারা সেটার মূল্য বোঝে।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে বন্ধুত্ব গড়া কঠিন, এটাই সত্য। কিন্তু অসম্ভব নয়। ধৈর্য, সততা আর নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া থাকলে, যে কোনো বয়সেই অর্থবহ ও সুন্দর বন্ধুত্ব তৈরি করা সম্ভব।
সূত্র : MARK MANSON