ফুটবলপ্রেমীদের কাছে একটি নতুন নাম আরলিং হালান্ড

হাটে-মাঠে-ঘাটে এখন একটিই আলোচনা-সমালোচনা, বিশ্বকাপ ফুটবল। বাবা, দাদা, ছেলে-বুড়ো- আবালবৃদ্ধবনিতা সবার মুখে এখন একটিই গল্প- ফুটবল। এদের সবার মধ্যে একটি নতুন গল্প নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আরলিং হালান্ড। বিশ্ব ফুটবলে হালান্ড ও তার বাবা আলফইঞ্জের গল্পটি অন্যতম আলোচিত ও নাটকীয় একটি অধ্যায়। এটি একই সাথে ক্যারিয়ার ধ্বংসের এক নির্মম ট্র্যাজেডি এবং মাঠের ভেতরে-বাইরে ফুটবলের নান্দনিকতায় মোড়ানো এক মধুর প্রতিশোধের গল্প। এই গল্পের শুরু আরলিং হালান্ডের বাবা আলফইঞ্জ হালান্ডকে দিয়ে- যিনি নিজেও ছিলেন একজন লড়াকু পেশাদার ফুটবলার। প্রিমিয়ার লিগে নটিংহ্যাম ফরেস্ট, লিডস ইউনাইটেড এবং ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবের রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ডে খেলা আলফইঞ্জ নরওয়ে জাতীয় দলের হয়েও ৩৪টি ম্যাচ খেলেছিলেন। মাঠের লড়াকু ফুটবলার হিসেবে তার বেশ সুনাম ছিল। তবে তার এই সুন্দর ক্যারিয়ারে কালো মেঘ হয়ে দেখা দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি অধিনায়ক রয় কিন। ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলার সময় আলফইঞ্জের সঙ্গে রয় কিনের একটি মাঠের সংঘর্ষ হয়। বল দখলের লড়াইয়ে রয় কিন আলফইঞ্জকে ফাউল করতে গিয়ে নিজেই

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে একটি নতুন নাম আরলিং হালান্ড

হাটে-মাঠে-ঘাটে এখন একটিই আলোচনা-সমালোচনা, বিশ্বকাপ ফুটবল। বাবা, দাদা, ছেলে-বুড়ো- আবালবৃদ্ধবনিতা সবার মুখে এখন একটিই গল্প- ফুটবল। এদের সবার মধ্যে একটি নতুন গল্প নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আরলিং হালান্ড।

বিশ্ব ফুটবলে হালান্ড ও তার বাবা আলফইঞ্জের গল্পটি অন্যতম আলোচিত ও নাটকীয় একটি অধ্যায়। এটি একই সাথে ক্যারিয়ার ধ্বংসের এক নির্মম ট্র্যাজেডি এবং মাঠের ভেতরে-বাইরে ফুটবলের নান্দনিকতায় মোড়ানো এক মধুর প্রতিশোধের গল্প।
এই গল্পের শুরু আরলিং হালান্ডের বাবা আলফইঞ্জ হালান্ডকে দিয়ে- যিনি নিজেও ছিলেন একজন লড়াকু পেশাদার ফুটবলার। প্রিমিয়ার লিগে নটিংহ্যাম ফরেস্ট, লিডস ইউনাইটেড এবং ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবের রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ডে খেলা আলফইঞ্জ নরওয়ে জাতীয় দলের হয়েও ৩৪টি ম্যাচ খেলেছিলেন। মাঠের লড়াকু ফুটবলার হিসেবে তার বেশ সুনাম ছিল।

তবে তার এই সুন্দর ক্যারিয়ারে কালো মেঘ হয়ে দেখা দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি অধিনায়ক রয় কিন।
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলার সময় আলফইঞ্জের সঙ্গে রয় কিনের একটি মাঠের সংঘর্ষ হয়। বল দখলের লড়াইয়ে রয় কিন আলফইঞ্জকে ফাউল করতে গিয়ে নিজেই হাঁটুতে মারাত্মক চোট পান এবং ব্যথায় মাটিতে কাতরাতে থাকেন। আলফইঞ্জ ভেবেছিলেন রয় কিন ফাউল থেকে বাঁচতে বা পেনাল্টি পাওয়ার জন্য অভিনয়ন করছেন। তিনি কিনের ওপর ঝুঁকে চিৎকার করে বলেন, ভণ্ডামি বন্ধ করো, ভং না ধরে উঠে দাঁড়াও! সেই ইনজুরির কারণে রয় কিনকে প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল। আলফইঞ্জের সেই চিৎকারকে কিন ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মনে মনে ফুঁসতে থাকেন।
ঠিক এর  চার বছর পর, ২০০১ সালের এপ্রিলে আসে সেই ভয়াবহ দিন। আলফইঞ্জে ততদিনে ম্যানচেস্টার সিটির অধিনায়ক। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ডার্বি ম্যাচ চলাকালীন ম্যাচের ৮৬ মিনিটে রয় কিন তার সেই সুযোগ পেয়ে যান। বলের দিকে কোনো নজর না দিয়ে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আলফইঞ্জের ডান হাঁটুতে বুট দিয়ে সরাসরি একটি হিংস্র ট্যাকল করেন। আলফইঞ্জে বাতাসে উড়ে গিয়ে মাঠে আছড়ে পড়েন এবং রয় কিনকে সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখানো হয়।

মাঠ ছাড়ার আগে রয় কিন মাটিতে পড়ে থাকা আলফইঞ্জের দিকে ঝুঁকে ঠিক চার বছর আগের সেই কথার প্রতিশোধ নিয়ে কিছু একটা বলে যান। পরে কিন তার আত্মজীবনীতে স্বীকারও করেছিলেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই আলফইঞ্জকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন।
এই ফাউলের পর আলফইঞ্জে আর কখনোই আগের মতো করে ফুটবল খেলতে পারেননি। যদিও আঘাতটি ডান হাঁটুতে লেগেছিল, কিন্তু শরীরের ভর সামলাতে গিয়ে পরবর্তীতে তার বাম হাঁটুতেও অস্ত্রোপচার করতে হয়। ফলশ্রুতিতে, মাত্র ৩০ বছর বয়সে ২০০৩ সালে আলফইঞ্জেকে ফুটবল থেকে চিরতরে অবসর নিতে হয়।

আলফইঞ্জের ফুটবল ক্যারিয়ার রয় কিনের কারণে অকালে শেষ হয়ে গেলেও, নিয়তি হয়তো পর্দার আড়ালে অন্য একটি মহাকাব্যিক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। বাবার অবসরের সময় ছোট আরলিংয়ের বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। মাঠ থেকে ছিটকে পড়া বাবা ঘরে বসেই গড়ে তোলেন এক ভবিষ্যৎ বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারকে। তবে আরলিং হাল্যান্ডের প্রতিশোধের ধরনটি কোনো মারামারি বা হিংস্রতার ছিল না, সেটি ছিল নিখাদ ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের গল্প।

২০২২ সালে আরলিং হালান্ড তার বাবার সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন, যে ক্লাবের জার্সি গায়ে খেলার সময় তার বাবার ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হয়েছিল। এরপর বাবার শত্রু ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে মাঠে নেমে হাল্যান্ড একের পর এক গোল উৎসব শুরু করেন। নিজের প্রথম ম্যানচেস্টার ডার্বিতেই তিনি দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে সিটিকে ৬-৩ ব্যবধানে জেতান। ওল্ড ট্রাফোর্ডে গিয়েও ইউনাইটেডকে একাই ধসিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি তিনি। এখানেই শেষ নয়, ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই হালান্ড উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ এবং এফএ কাপ (ট্রেবল) জেতেন যা একসময় রয় কিনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সবচেয়ে বড় অহংকার ছিল।
আজ আলফইঞ্জে হালান্ড গ্যালারিতে বসে তৃপ্তির হাসি নিয়ে দেখেন, কীভাবে তার নিজের রক্ত সেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করছে, যারা একসময় তার ক্যারিয়ার কেড়ে নিয়েছিল। ফুটবল মাঠে রয় কিন আলফইঞ্জেকে শারীরিকভাবে আঘাত করে তার ক্যারিয়ার শেষ করেছিলেন, আর আলফইঞ্জের ছেলে আরলিং হালান্ড গোলবন্যা বইয়ে দিয়ে, ট্রফি জিতে এবং ফুটবল বিশ্বের রাজমুকুট মাথায় পরে সেই অন্যায়ের সবচেয়ে সুন্দর ও ঐতিহাসিক প্রতিশোধ নিয়েছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow