ফুটবলে ভারতের স্বপ্নভঙ্গ: বিশ্বকাপে খেলতে না পারার কারণ কী

ফুটবল বিশ্বকাপে কি কোনোদিন খেলতে পারবে ভারত? বিশ্বকাপ শুরু হলেই ভারতীয় ফুটবল সমর্থকদের মনে এই প্রশ্ন ফিরে আসে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল আসরে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি ভারত। ভারতের পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল, যাদের ব্লু টাইগার্স নামে ডাকা হয়, তারা কখনোই এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বের প্রাথমিক ধাপের বেশি এগোতে পারেনি। তবে বিষয়টি কিছুটা বিদ্রূপাত্মকও। কারণ পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও গোয়ার মতো ফুটবলপ্রেমী রাজ্যগুলোতে বিশ্বকাপ ঘিরে ব্যাপক উৎসবের আমেজ দেখা যায়। এছাড়া ভারত থেকে অনেক সাংবাদিকও সরাসরি বিশ্বকাপ কভার করতে যান, যদিও প্রতিযোগিতায় ভারতের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। চারটি বিশ্বকাপ কভার করা এক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক মজা করে বলেন, প্রেস বক্সে প্রায়ই আমাদের জিজ্ঞেস করা হয় ভারত কি ফুটবল খেলে? বেশিরভাগ মানুষই ভারতকে ক্রিকেট খেলা দেশ হিসেবেই চেনে। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ চীনও আবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে ফিফা এই দুই দেশের বাজারের গুরুত্ব ভালোভাবেই বোঝে। তাই সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করতে ফিফা বিশেষ প্রতিনিধি দলও ভারতে পাঠিয়েছিল। ভারত কি কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলতে পার

ফুটবলে ভারতের স্বপ্নভঙ্গ: বিশ্বকাপে খেলতে না পারার কারণ কী

ফুটবল বিশ্বকাপে কি কোনোদিন খেলতে পারবে ভারত? বিশ্বকাপ শুরু হলেই ভারতীয় ফুটবল সমর্থকদের মনে এই প্রশ্ন ফিরে আসে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল আসরে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি ভারত।

ভারতের পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল, যাদের ব্লু টাইগার্স নামে ডাকা হয়, তারা কখনোই এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বের প্রাথমিক ধাপের বেশি এগোতে পারেনি।

তবে বিষয়টি কিছুটা বিদ্রূপাত্মকও। কারণ পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও গোয়ার মতো ফুটবলপ্রেমী রাজ্যগুলোতে বিশ্বকাপ ঘিরে ব্যাপক উৎসবের আমেজ দেখা যায়। এছাড়া ভারত থেকে অনেক সাংবাদিকও সরাসরি বিশ্বকাপ কভার করতে যান, যদিও প্রতিযোগিতায় ভারতের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

চারটি বিশ্বকাপ কভার করা এক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক মজা করে বলেন, প্রেস বক্সে প্রায়ই আমাদের জিজ্ঞেস করা হয় ভারত কি ফুটবল খেলে? বেশিরভাগ মানুষই ভারতকে ক্রিকেট খেলা দেশ হিসেবেই চেনে।

শুধু ভারত নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ চীনও আবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে ফিফা এই দুই দেশের বাজারের গুরুত্ব ভালোভাবেই বোঝে। তাই সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করতে ফিফা বিশেষ প্রতিনিধি দলও ভারতে পাঠিয়েছিল।

ভারত কি কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলতে পারবে?

ভারতের সাবেক অধিনায়ক এবং দেশটির অন্যতম সেরা ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়া মনে করেন, এটি অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য কোনো শর্টকাটও নেই।

তিনি বলেন, হ্যাঁ, ভারত অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে পারে। এখন ৪৮ দলের বিশ্বকাপে এশিয়ার জন্য আটটি সরাসরি স্থান রয়েছে। উজবেকিস্তান ও জর্ডানের মতো দলও খেলছে। তবে এর জন্য অনেক কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন।”

ভুটিয়ার মতে, ভারতের মতো বড় দেশে প্রতিভার অভাব নেই। অভাব রয়েছে সঠিক কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।

তিনি বলেন, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলীয় খেলা। কিন্তু আমাদের শক্তিশালী তৃণমূল কর্মসূচি নেই। তাই ফল পেতে সময় লাগবে।

শিশুদের ফুটবলে আনতে হবে

১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতের ব্রোঞ্জজয়ী দলের সদস্য শাইয়াম থাপা মনে করেন, ফুটবলের উন্নয়নের জন্য শিশুদের এই খেলায় বেশি করে যুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, আমি নিজে বহু বছর যুব একাডেমি চালিয়েছি। যত বেশি শিশু ফুটবল খেলবে, তত বেশি প্রতিভা পাওয়া যাবে। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন কী করেছে?

থাপার মতে, বর্তমানে অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের সন্তানদের ফুটবলের বদলে ক্রিকেটে পাঠাচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেকে আশা করেন, ছেলে একদিন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) খেলে বড় চুক্তি পাবে। কিন্তু ফুটবলেও ভালো ক্যারিয়ার ও আয় সম্ভব—এটা তাদের বুঝতে হবে।

ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

এবারের বিশ্বকাপে এশিয়া থেকে জায়গা পাওয়া নয়টি দল হলো অস্ট্রেলিয়া, ইরান, জাপান, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব এবং ইরাক।

এর মধ্যে জর্ডান ও উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে।

বর্তমান ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে উজবেকিস্তান ৫২তম, জর্ডান ৬৩তম। অন্যদিকে ভারত নেমে গেছে ১৩৬তম স্থানে।

এই পরিসংখ্যানই ভারতীয় ফুটবলের চ্যালেঞ্জের গভীরতা তুলে ধরে।

উন্নতির বদলে অনিশ্চয়তা

২০২২ সালে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) সভাপতি হওয়ার পর সাবেক ফুটবলার কাইলাম চৌবে বলেন, আমি এমন স্বপ্ন বিক্রি করবো না যে ভারত আট বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে খেলবে। আমি শুধু বলবো, বর্তমান অবস্থা থেকে ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো।

কিন্তু প্রায় চার বছর পর অনেকেই মনে করেন, ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে ফেডারেশন সমালোচনার মুখেই বেশি পড়েছে।

২০১৪ সালে চালু হওয়া ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) একসময় ভারতীয় ফুটবলের বড় আশা ছিল। ব্যবসায়ী, বলিউড তারকা ও ক্রিকেট ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ততায় এটি জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল।

কিন্তু বর্তমানে লিগটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বাণিজ্যিক অংশীদার না পাওয়ায় সর্বশেষ মৌসুম শুরু হতে বড় দেরি হয়। পরে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে বাধ্য হয় ফেডারেশন।

ভিশন ২০৪৭ এখন প্রশ্নের মুখে

চৌবের ভিশন-২০৪৭ পরিকল্পনায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুকে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু এখন অনেকের কাছে এটি ভুলে যাওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতো মনে হচ্ছে।

২০২৩ সালে ভারত কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্ট এবং দক্ষিণ এশীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে তারা আবার ফিফার শীর্ষ ১০০-এ ফিরেছিল।

কিন্তু সেই অগ্রগতি স্থায়ী হয়নি।

ভারত প্রথমবারের মতো ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের তৃতীয় ধাপে ওঠার আশা জাগিয়েও ব্যর্থ হয়। এরপর আগামী এশিয়ান কাপেও জায়গা করে নিতে পারেনি।

আপাতত লক্ষ্য এশিয়ান কাপ

ভারতের সাবেক অধিনায়ক সুনিল সেট্রি মনে করেন, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত এশিয়ান কাপে খেলা। এতে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ হবে। যখন আমরা এশিয়ার সেরা ১৫-২০ দলের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, তখনই বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবা উচিত।

বিদেশে জন্ম নেওয়া ভারতীয়দের সুযোগ?

বর্তমানে এআইএফএফ এমন একটি নীতির জন্য চেষ্টা করছে, যাতে বিদেশে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের (ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া বা ওসিআই কার্ডধারী) জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়া যায়।

এখন বিদেশি পাসপোর্টধারী কোনো ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলারকে ভারতের হয়ে খেলতে হলে তার বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া রায়ান উইলিয়ামস সেই পথেই ভারতের হয়ে খেলতে নেমে এরই মধ্যে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।

বিশ্বকাপের এবারের আসরেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত চারজন খেলোয়াড় অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন—কাতারের তাহসিন মোহাম্মদ, অস্ট্রেলিয়ার নিশান ভেলুপিল্লাই, নিউজিল্যান্ডের সারপ্রীত সিং এবং কঙ্গোর স্যামুয়েল মুতুসামি।

তবে আপাতত ভারতের বিশ্বকাপে খেলা সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে। ততদিন ভারতীয় ফুটবল সমর্থকদের দূর থেকেই মেসি, রোনালদো ও নেইমারদের খেলা উপভোগ করতে হবে।

আর ছোট্ট দেশ কুরাসাও যখন বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারে, তখন ভারত কেন পারে না—এই প্রশ্নটিই বারবার ফিরে আসবে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow