বউয়ের শপিং লিস্ট: আমার বাজেট অফসাইডে

সামছুল আলম শিমুল সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বউ আদুরে গলায় বললো, চলো না, আজ একটু শপিংয়ে যাই! অনেক দিন তো কোথাও যাওয়া হয় না। বউয়ের মায়াময় মুখটা দেখে মনে হলো, এই মুহূর্তে অফিস-টফিস সব বাদ দিয়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু সমস্যা হলো, পকেট প্রায় ফাঁকা। তার ওপর অফিসে আজ জরুরি কাজ। তবে আশার কথা, গতকাল এক বন্ধু জানিয়েছে সে আজ রাতেই বিকাশ করে ধারের টাকা ফেরত দেবে। টাকা নিয়েছিল এক বছর আগে, আর বলেছিল এক সপ্তাহের মধ্যেই দিয়ে দেবে। এতদিনে টাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই মৃতপ্রায় আশাই আবার জেগে উঠেছে। মনে মনে ভাবলাম, এই টাকা দিয়েই বউয়ের শপিংয়ের শখ পূরণ করব। এক ঢিলে দুই পাখি-বউ খুশি হবে, আমিও হিরো বনে যাব। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, তুমি যখন বলছ, তখন কি আর না করা যায়! তুমি তুলেছ আর আমি ফেলেছি-এমন কখনো হয়েছে নাকি? তবে আজ কয়েকটা সমস্যা আছে। বউ কপাল কুঁচকে বললো, সমস্যা? আবার কয়েকটা? আরও পড়ুন হৃদির বিশ্বকাপ দর্শন / ব্রাজিলও আমার, আর্জেন্টিনাও আমার আমি বললাম, প্রথম সমস্যা, অফিসে জরুরি কাজ আছে। ফিরতে একটু দেরি হবে। দ্বিতীয় সমস্যা, আজ আর্জেন্টিনার ম্যাচ। কোন

বউয়ের শপিং লিস্ট: আমার বাজেট অফসাইডে

সামছুল আলম শিমুল

সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বউ আদুরে গলায় বললো, চলো না, আজ একটু শপিংয়ে যাই! অনেক দিন তো কোথাও যাওয়া হয় না। বউয়ের মায়াময় মুখটা দেখে মনে হলো, এই মুহূর্তে অফিস-টফিস সব বাদ দিয়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু সমস্যা হলো, পকেট প্রায় ফাঁকা। তার ওপর অফিসে আজ জরুরি কাজ।

তবে আশার কথা, গতকাল এক বন্ধু জানিয়েছে সে আজ রাতেই বিকাশ করে ধারের টাকা ফেরত দেবে। টাকা নিয়েছিল এক বছর আগে, আর বলেছিল এক সপ্তাহের মধ্যেই দিয়ে দেবে। এতদিনে টাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই মৃতপ্রায় আশাই আবার জেগে উঠেছে। মনে মনে ভাবলাম, এই টাকা দিয়েই বউয়ের শপিংয়ের শখ পূরণ করব। এক ঢিলে দুই পাখি-বউ খুশি হবে, আমিও হিরো বনে যাব।

তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, তুমি যখন বলছ, তখন কি আর না করা যায়! তুমি তুলেছ আর আমি ফেলেছি-এমন কখনো হয়েছে নাকি? তবে আজ কয়েকটা সমস্যা আছে।

বউ কপাল কুঁচকে বললো, সমস্যা? আবার কয়েকটা?

আমি বললাম, প্রথম সমস্যা, অফিসে জরুরি কাজ আছে। ফিরতে একটু দেরি হবে। দ্বিতীয় সমস্যা, আজ আর্জেন্টিনার ম্যাচ। কোনোভাবেই মিস করা যাবে না। তাই আজ শপিংয়ের সময় বের করা কঠিন।

বউয়ের মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, কাল যেন আবার কোনো অজুহাত না আসে।
আমি বুক চাপড়ে বললাম, মেসি পেনাল্টি মিস করতে পারে, কিন্তু কালকের শপিং মিস হবে না!

আমার ফুটবলপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে বউও আমাকে খুশি করার চেষ্টা করল। সাবধানে বাসায় এসো। রাতে কিন্তু আমরা একসঙ্গে খেলা দেখব। আমি একটু অবাক হলাম। বিয়ের এত বছরে বউকে কখনো ফুটবল নিয়ে আগ্রহী দেখিনি। সে যে আমাকে খুশি করার জন্যই এমন বলছে, এটা বুঝতে ভিএআর-এর দরকার নেই। মনে মনে সেই বন্ধুটাকে ধন্যবাদ দিলাম, যে এক সপ্তাহের ধার এক বছর পর হলেও ফেরত দিতে রাজি হয়েছে।

রাতে খেলা দেখার আয়োজন ছিল রাজকীয়। ড্রয়িংরুমের পর্দা বদলে আকাশি-সাদা করা হয়েছে। ফ্লাস্কভর্তি কফি, সোফায় নেক পিলো, আর হাফ টাইমে গরম করে খাওয়ার জন্য নুডলসও প্রস্তুত। রাত এগারোটায় খেলা শুরু হলো আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া।

খেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আমি পুরোপুরি ম্যাচে ডুবে গেলাম। উত্তেজনায় কখনো হাত নাড়ছি, কখনো খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দিচ্ছি, কখনো আবার রেফারির বংশপরিচয় নিয়ে গবেষণা করছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম, বউও খুব মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখছে। চোখ একদম টিভির দিকে স্থির।

আমি খুশি হয়ে বললাম, দেখে নিও, আজ অস্ট্রিয়া কেঁদে কুল পাবে না। অন্তত দুই হালি গোল খাবে। মেসির স্পিডটা দেখছ?

বউ চোখ না সরিয়েই বললো, কাল অস্ট্রিয়ার জার্সির মতো একটা লাল শাড়ি কিনব। সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ি আর লিপস্টিকও লাগবে।

আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম। আমি ভাবছি গোল, আর বউ ভাবছে শাড়ি!

খেলার পাঁচ মিনিটের মাথায় আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পেয়ে গেল। আমি লাফিয়ে উঠলাম। মেসি শট নিল, কিন্তু মিস!
আমার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। মেসির না, নিজের।

ঠিক তখনই বউ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, অস্ট্রিয়ার গোলকিপারের জার্সির রংটা দেখেছ? কী সুন্দর! ওই রঙের একটা থ্রি-পিস কিনলে আমাকে দারুণ মানাবে।

আমি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। আমার কষ্ট পেনাল্টি মিসে, আর বউয়ের আনন্দ গোলকিপারের কালার্সে! খেলা চলতে লাগল। আর বউয়ের শপিং লিস্টও বাড়তে লাগল। কখনো কোনো খেলোয়াড়ের মোজার রং দেখে বলে, এই রঙের একটা হিজাব কিনব।

কখনো কোচের টি-শার্ট দেখে বলে, এমন একটা টি-শার্ট তোমার জন্যও কিনে দেব। কখনো লাইন্সম্যানের পতাকা দেখে বলে, ওই কম্বিনেশনের একটা ওড়না পাওয়া যাবে কি? এমনকি রেফারির হাতের স্মার্টওয়াচও তার নজর এড়াল না। এই ঘড়িটা আমার খুব দরকার।

আমি বুঝলাম, বউ ফুটবল দেখছে না। সে একটা চলন্ত শপিং মল দেখছে। ৯০ মিনিট শেষে মেসির দুই দুর্দান্ত গোলে আর্জেন্টিনা জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল। আর বউ মুখভর্তি হাসি নিয়ে তার শপিং লিস্ট হাতে ড্রয়িংরুম ছাড়ল।

আমার দল জিতেছে। আমি আনন্দে চিৎকার করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক তখনই মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই বন্ধুর নাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কাশির শব্দ। বন্ধু, একটা খারাপ খবর আছে।

আমার বুক ধক করে উঠলো। কী হয়েছে?
বন্ধু বললো, টাকাটা এই মাসেও দিতে পারছি না। আরেকটা বছর সময় দে...

কথা শেষ করেই সে ফোন কেটে দিল।আমি কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঠিক তখনই বউ এসে বললো, আচ্ছা, কাল তো আমরা শপিংয়ে যাচ্ছি, তাই না?

আমি তাকে উত্তর দেওয়ার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেলাম না। কারণ, ম্যাচ জিতলেও আমার বাজেট অফসাইডেই আটকে গেছে।

প্রিয় পাঠক, আপনিও অংশ নিতে পারেন আমাদের এ আয়োজনে। আপনার মজার (রম্য) গল্পটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়। লেখা মনোনীত হলেই যে কোনো শুক্রবার প্রকাশিত হবে।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow