বছরের শুরুতে ইবাদত-বন্দেগির নতুন বিন্যাস

সময়ের পরিক্রমায় আমরা একটি বছর শেষ করে নতুন আরেকটি বছরে উপনীত। একটি বছরের বিদায় মানে নতুন দিনের আগমন, নতুন সম্ভাবনার সূচনা। সচেতন ব্যক্তিরা নতুন বছরকে স্বাগত জানায় নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশায়। নিজেকে নতুন করে উপস্থাপনের বাসনায়। তবে, নতুন বছরের স্বপ্নপূরণে প্রয়োজন বিগত বছরের সঠিক মূল্যায়ন। ফেলে আসা দিনগুলোর হালখাতা মেলানো। একজন মুসলিম হিসেবে গত এক বছর আমার কী করার ছিল, কী করেছি; কতটুকু আমল করা দায়িত্ব ছিল, কতটুকু করতে পেরেছি—ইত্যাদি হিসাব মেলাতে হবে অতীত জীবনের ডায়েরি খুলে। জীবনের ডায়েরিতে ধরা পড়বে অসংখ্য ভুল। প্রভুর দরবারে সেসব ভুলের ক্ষমাপ্রার্থনা করা বর্ষবিদায়ের প্রথম কাজ। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের আত্মার হিসাব নাও নিজেদের হিসাব দেওয়ার আগে, তাকে ওজন করো নিজেদের ওজন দেওয়ার আগে।’ বিদায়ী বছরে কী কী ব্যর্থতা ছিল, নতুন বছরে এসব ব্যর্থতা কীভাবে দূর করা যাবে, নতুন বছর ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য কী করতে পারি, প্রতিটি সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারব কি না, একজন মুসলিম ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে কী দাবি রাখে— এসব নিয়ে পরিকল্পনায় বসা দ্বিতীয় কাজ।

বছরের শুরুতে ইবাদত-বন্দেগির নতুন বিন্যাস

সময়ের পরিক্রমায় আমরা একটি বছর শেষ করে নতুন আরেকটি বছরে উপনীত। একটি বছরের বিদায় মানে নতুন দিনের আগমন, নতুন সম্ভাবনার সূচনা। সচেতন ব্যক্তিরা নতুন বছরকে স্বাগত জানায় নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশায়। নিজেকে নতুন করে উপস্থাপনের বাসনায়। তবে, নতুন বছরের স্বপ্নপূরণে প্রয়োজন বিগত বছরের সঠিক মূল্যায়ন। ফেলে আসা দিনগুলোর হালখাতা মেলানো। একজন মুসলিম হিসেবে গত এক বছর আমার কী করার ছিল, কী করেছি; কতটুকু আমল করা দায়িত্ব ছিল, কতটুকু করতে পেরেছি—ইত্যাদি হিসাব মেলাতে হবে অতীত জীবনের ডায়েরি খুলে। জীবনের ডায়েরিতে ধরা পড়বে অসংখ্য ভুল। প্রভুর দরবারে সেসব ভুলের ক্ষমাপ্রার্থনা করা বর্ষবিদায়ের প্রথম কাজ। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের আত্মার হিসাব নাও নিজেদের হিসাব দেওয়ার আগে, তাকে ওজন করো নিজেদের ওজন দেওয়ার আগে।’

বিদায়ী বছরে কী কী ব্যর্থতা ছিল, নতুন বছরে এসব ব্যর্থতা কীভাবে দূর করা যাবে, নতুন বছর ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য কী করতে পারি, প্রতিটি সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারব কি না, একজন মুসলিম ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে কী দাবি রাখে— এসব নিয়ে পরিকল্পনায় বসা দ্বিতীয় কাজ। যদিও মুমিনের আত্মপর্যালোচনা শুধু বর্ষকেন্দ্রিক বা সময়কেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। বরং মুমিন প্রতিদিন তার আমলের হিসাব নেয় এবং গতকালের চেয়ে আগামীকালকে বেশি উপকারী ও ফলপ্রসূ করার চেষ্টা করে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব মানুষ প্রভাতে উপনীত হয় এবং নিজের সত্তাকে বিক্রি করে। আল্লাহর কাছে বিক্রি হয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করে, নতুবা শয়তানের কাছে বিক্রি হয়ে নিজেকে ধ্বংস করে।’ (মুসলিম: ৩/১০০)।

ইমানদার মুসলিমের প্রথম পরিকল্পনা হওয়া চাই ‘আমল’ বিষয়ে। জানুয়ারির প্রথম দিন থেকে আমার নামাজ, রোজাসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো কীভাবে পালন করব, দৈনন্দিন কতটুকু কোরআন তেলাওয়াত করতে পারি, নফল নামাজ কত রাকাত পড়তে পারি, নফল রোজা কয়টা রাখতে পারি, পরোপকার কীভাবে করতে পারি, দান-সদকা কীভাবে বাড়াতে পারি ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা করা। একই সঙ্গে নিজে বদভ্যাসগুলো ছাড়ার পরিকল্পনাও করা চাই। মিথ্যা বলা, গিবত করা, অন্যের ক্ষতি করা, দুর্নীতি করা ইত্যাদি থেকেও যেন আগামী এক বছর বেঁচে থাকতে পারি—সে অনুযায়ী ভাবনা স্থির করা। সর্বোপরি চিন্তা করা এ বছর যেমনই কেটেছে, আগামী বছর যেন আমার আমলের খাতা নেকের দ্বারা আরও উজ্জ্বল হয়, আরও সমৃদ্ধ হয়। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন সময়ের যথাযথ গুরুত্ব ও মূল্যায়ন করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো, আগামী দিনের জন্য মানুষ কী পেশ করেছে, সে যেন তা দেখে নেয়। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা করছ, সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা হাশর: আয়াত ১৮)

সময় জীবনের অমূল্য সম্পদ। সময়কে হেলায়ফেলায় কাটিয়ে দিলে পরজগতে আক্ষেপের সীমা থাকবে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সেখানে তারা (অপরাধীরা) চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের আবার দুনিয়ায় প্রেরণ করুন। আগে যা করেছি, তা আর করব না। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদের এতটা সময় দিইনি, যাতে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীরাও আগমন করেছিল। অতএব, আজাব আস্বাদন করো। জালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা ফাতির: ৩৭)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে নিজের জীবনের হিসাব নেয় এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করে।’ (মুস্তাদরাক)। ইবনে ওমর (রা.) বলতেন, ‘তুমি সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার অপেক্ষা করো না এবং সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকাল পর্যন্ত জীবিত থাকার আশা করো না। আর সুস্থ থাকা অবস্থায় অসুস্থ সময়ের জন্য আমল করে নাও এবং জীবন থাকতে মৃত্যু-পরবর্তী সময়ের পুঁজি সংগ্রহ করো।’ (বুখারি)।

তা ছাড়া প্রতিটি ভালো কাজের নিয়ত করা চাই। সঠিক পরিকল্পনা সফলতার পথ দেখায় আর খাঁটি নিয়ত কাজের গতি বৃদ্ধি করে। কাজের শুরুতে নিয়তের গুরুত্ব দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই প্রতিটি কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি: ১/১)। অন্য হাদিসে আছে, ‘মুমিন বান্দার নিয়ত তার কর্মের চেয়ে উত্তম।’ (বাইহাকি: ১/৮)। তাই নতুন বছরকে সামনে রেখে আমাদের নিয়ত ঠিক করতে হবে। পরিকল্পনা সাজাতে হবে। কাজের গতি বৃদ্ধি এবং সঠিকতার জন্য প্রয়োজনে বড়দের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তাদের সঙ্গে নিজের চিন্তা শেয়ার করে ভালোটা গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমরা জানি, ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর সময় খুবই অল্প। দেখতে দেখতে চলে যায় দিন। এ অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কিছু প্রস্তুত করতে হবে। জোগাড় করতে হবে পরকালের পাথেয়। পৃথিবী হচ্ছে পরকালের শস্যক্ষেত। পরকালের ফসল ফলার জন্যই মহান প্রভু আমাদের পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। যেদিন পৃথিবীতে পরকালের ফসল ফলানো যাবে না, সেদিন পৃথিবীরও কোনো মূল্য থাকবে না। মানুষের জীবন আল্লাহতায়ালার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এ আমানতের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয় করা হলো, আখিরাতে তার পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহতায়ালার কোনো আদেশ অমান্য করা কিংবা সময়কে অলসতায় নষ্ট করা এ আমানতের খেয়ানতের শামিল। খেয়ানতের পরিণতি যে ভয়াবহ, তা কোরআন-হাদিসে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ আল্লাহর দরবার থেকে এক পাও নড়তে পারবে না। এক. তার জীবন সম্পর্কে, সে কীভাবে তা অতিবাহিত করেছে। দুই. তার যৌবনকাল সম্পর্কে, সে কোন কাজে তা ব্যয় করেছে। তিন. তার সম্পদ সম্পর্কে, কীভাবে সে তা উপার্জন করেছে। চার. এবং উপার্জিত সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে। পাঁচ. সে যে জ্ঞান অর্জন করেছিল, সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে।’ (জামে তিরমিজি: ২৪১৬)। যেহেতু হিসাব অবশ্যম্ভাবী, তাই পরকালের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগে নিজের হিসাব নিজে করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

নতুন বছরের শুরুতে মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত গত বছরের জীবনচিত্র পর্যালোচনা করা। যদি দেখা যায়, সময়ের একটি বড় অংশ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় হয়েছে, তাহলে তার জন্য কৃতজ্ঞতা আদায় করা জরুরি। কারণ, কৃতজ্ঞতা নেয়ামত বৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। আর যদি গুনাহ, অবহেলা ও ত্রুটির হিসাব চোখে পড়ে, তবে বিলম্ব না করে ক্ষমা প্রার্থনা ও খাঁটি তওবা করে নেকির পথে ফিরে আসাই ইমানদারের কাজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করো। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপমোচন করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত।’ (সুরা তাহরিম: ৮)। তওবার পাশাপাশি নেক আমলে আত্মনিয়োগ করাও জরুরি। কেননা সৎকর্ম পাপের কালিমা মুছে দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই পুণ্যরাজি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ মানে, এটা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ।’ (সুরা হুদ: ১১৪)।

নতুন বছরে মুমিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আগামীর জন্য সুদৃঢ় সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। যাতে অবশিষ্ট জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় হয়। অহেতুক ব্যস্ততা, অর্থহীন বিনোদন কিংবা অলসতায় যেন একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হবে নিজের নফসকে সংযত রাখা এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। এ প্রসঙ্গে শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বুদ্ধিমান হলো সে, যে নিজের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম হলো সে, যে নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমার আশা পোষণ করে।’ (জামে তিরমিজি: ২৪৫৯)।

নতুন বছরে আমাদের জীবন কল্যাণের প্রাচুর্যে ভরে উঠুক। শান্তিময় হয়ে উঠুক দেশ ও জাতি। মহান আল্লাহর রহমতে পূর্ণ হোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow