বজ্রপাত-জোঁকের ভয়ে মিলছে না শ্রমিক, ধান নিয়ে দিশাহারা কৃষক
একদিকে জোঁক, অন্যদিকে বজ্রপাত—এ দুই ভয় জেঁকে বসেছে ধান কাটা শ্রমিকদের মনে। প্রাণভয়ে তারা জমিতে নামতে চাচ্ছেন না। এতে হবিগঞ্জে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সংকট মেটাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে তাদের কোনো উদ্যোগই তেমন কাজে আসছে না। জেলায় পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। এতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ২১২ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সাড়ে ২২ হাজার। ফসল হারিয়ে কৃষিজীবী মানুষের মাঝে হাহাকার বিরাজ করছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েকদিন রোদের দেখা পেয়ে কৃষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে পচন ধরা, চারা গজানো ধান শুকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। যে যেভাবে পারছেন ধান শুকিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করার চেষ্টায় আছেন। কেউবা রাস্তা, কেউ খলা, কেউ বাড়ির উঠানে ধান নাড়ছেন। কথা হয় বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বাসিন্দা হরেন্দ্র সরকারের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ধান যা কেটে এনেছিলাম তার সবগুলোতেই চারা উঠে গেছে। আর খরচ করতে চাই না। জমিতে থেকেই ধান পচুক।’ তিনি বলেন, ‘ধান কাটা শ্রমিক পাইনি। শ্রমিকরা আগে পানিতে নামেনি বজ্রপাত আতংকে। এখন নামতে চায় না জোঁকের ভয়ে।’ লাখাই উপজেলার গোয়াখারা গ্রামের বাসিন্দা
একদিকে জোঁক, অন্যদিকে বজ্রপাত—এ দুই ভয় জেঁকে বসেছে ধান কাটা শ্রমিকদের মনে। প্রাণভয়ে তারা জমিতে নামতে চাচ্ছেন না। এতে হবিগঞ্জে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সংকট মেটাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে তাদের কোনো উদ্যোগই তেমন কাজে আসছে না।
জেলায় পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। এতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ২১২ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সাড়ে ২২ হাজার। ফসল হারিয়ে কৃষিজীবী মানুষের মাঝে হাহাকার বিরাজ করছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েকদিন রোদের দেখা পেয়ে কৃষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে পচন ধরা, চারা গজানো ধান শুকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। যে যেভাবে পারছেন ধান শুকিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করার চেষ্টায় আছেন। কেউবা রাস্তা, কেউ খলা, কেউ বাড়ির উঠানে ধান নাড়ছেন।
কথা হয় বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বাসিন্দা হরেন্দ্র সরকারের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ধান যা কেটে এনেছিলাম তার সবগুলোতেই চারা উঠে গেছে। আর খরচ করতে চাই না। জমিতে থেকেই ধান পচুক।’
তিনি বলেন, ‘ধান কাটা শ্রমিক পাইনি। শ্রমিকরা আগে পানিতে নামেনি বজ্রপাত আতংকে। এখন নামতে চায় না জোঁকের ভয়ে।’
লাখাই উপজেলার গোয়াখারা গ্রামের বাসিন্দা কৃষক ইলিয়াছ মিয়া বলেন, ‘কাটা ধান স্তূপ করে রেখেছি। এগুলো অনেক আগেই গোলায় তোলার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে পারিনি। সব ধানে চারা গজিয়েছে। পচন ধরেছে।’
একই কথা বলেন কৃষক বাবুল মিয়া। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকের অভাবে নিজেই বুকসমান পানিতে নেমে কিছু ধান কেটে এনেছিলাম। সরকারি গোদামে এ ধানকে এখন মানহীন বলা হচ্ছে। এবার আগাম বৃষ্টি শুধু আমাদের জমিই নেয়নি (জমি ডুবে যাওয়া), দরদাম করার ক্ষমতাও কেড়ে নিয়েছে।’
কৃষক ভিংরাজ মিয়া বলেন, ‘শুনছি কৃষি অফিস শ্রমিক জোগারের চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোথায়? অতিরিক্ত টাকা দিয়েওতো কোথাও কোনো শ্রমিক মিলছে না। আমাদের এলাকার বা বাইরের যে শ্রমিকরা রয়েছে, তারা আগে বজ্রপাত আতংকে ক্ষেতে নামেনি। এখন জোঁক ও চুলকানির ভয়ে নামে না। এবার বুঝেছি শুধু টাকা দিয়ে সব করা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘যে ক’কের (এক কের সমান ৩০ শতাংশ) জমির ধান নিজেই কেটেছি, এসব ধান আবার এখন সরকারি গোদামেও নিচ্ছে না। নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু দালালের মাধ্যমে ঠিকই সেই ধান নিচ্ছে। তাই সংসারের খরচ আর ঋণের চাপে অনেক আগেই কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে দিয়েছি। শুধু আমি নই, অধিকাংশ কৃষকই ফরিয়াদের কাছে কম দামে ধান বিক্রির চেষ্টা করছেন।’
আরও পড়ুন:
‘মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’
অর্ধেক ধান পানির নিচে, বাকিটুকু তুলতে বাধা ‘আকাশছোঁয়া’ নৌকার দাম
দুর্যোগ-দরপতনে দিশাহারা কৃষক
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে জানান হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল।
তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষকদের পাশে আছি। আমাদের মাঠ কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সবাই কৃষকদের পাশে আছেন। আমি নিজেও প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে কৃষকদের খোঁজ নিতে ছুটে যাচ্ছি।’
শ্রমিক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিক সংকট মেটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করছি। কৃষকদের যারাই সহযোগিতা চাচ্ছেন, তাদেরকেই শ্রমিক জোগাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা দেবেন। কৃষকদের আমাদেরকে যেভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতে হবে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বজ্রপাতে এবছর তিনজন মারা গেছেন। অন্যান্য বছর এসময়ে অনেক বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা যেতেন। এবছর সে তুলনায় অনেক কম মৃত্যু হয়েছে। মানুষ সচেতন হচ্ছেন। আমরা চেষ্টা করছি সে সংখ্যা যেন শূন্যে নামিয়ে আনতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘হাওরে ছোট ছোট ছাউনি যদি নির্মাণ করা যায়, তাহলে আশা করা যায় বজ্রপাত থেকে কৃষকরা রক্ষা পাবেন। বজ্রপাতের সময় তারা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। প্রচণ্ড রোদে ক্লান্তি হলে বিশ্রামও নিতে পারবেন।’
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এক লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আবাদ করা হয় এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০৪ হেক্টর জমি কম আবাদ হয়েছে। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। আবাদকৃত জমির মধ্যে এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে ৪৪ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমির ধান। এর মধ্যে হাওর এলাকায় কাটা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৩৫ হেক্টর এবং নন হাওর এলাকায় ১৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর। এখনো কাটা বাকি আছে ৭৮ হাজার ৯০৫ হেক্টর জমির ধান।
১০ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে পুরোপুরি নিমজ্জিত রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪৩ হাজার ২৩০.৪৪ মেট্রিক টন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অংকে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১১ কোটি ৮২ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২২ হাজার ৬৭২ জন।
এসআর/জেআইএম
What's Your Reaction?