বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, উত্তরণে চাই সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা
নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলা, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ নেতৃত্ব ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের সুযোগও তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন প্রেক্ষাপটে তারা কোন ধরনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে এবং শুরুতেই কোন নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হতে হবে তা নিয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে? নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো আমি মূলত চারটি স্তরে দেখি। প্রথমত, তারা যে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে, তা মোকাবিলা করা। বর্তমানে বিনিয়োগের গতি ন
নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলা, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ নেতৃত্ব ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের সুযোগও তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন প্রেক্ষাপটে তারা কোন ধরনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে এবং শুরুতেই কোন নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হতে হবে তা নিয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে?
নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো আমি মূলত চারটি স্তরে দেখি। প্রথমত, তারা যে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে, তা মোকাবিলা করা। বর্তমানে বিনিয়োগের গতি নিম্নমুখী। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দুর্বলতা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি। একই সঙ্গে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যার পেছনে আস্থার ঘাটতি ও নীতিগত অস্পষ্টতা কাজ করছে। এগুলোই হবে তাদের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ।
রাজস্ব বাড়াতে হলে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি হ্রাস—এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। অপ্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো সমাধান নয়। বরং প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো ও কর ব্যবস্থা আধুনিক করা জরুরি
দ্বিতীয়ত, ইতোমধ্যে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন, পুঁজিবাজার এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে—সেগুলো যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। ধারাবাহিকতা রক্ষা না করলে সংস্কারের সুফল পাওয়া যাবে না। তাই নতুন সরকারকে এগুলো শুধু অব্যাহতই নয়, আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আরও পড়ুন
রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই ব্যাংক খাত সংস্কার সম্ভব
নতুন সরকারের সামনে যত কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন রাষ্ট্রনায়কের সামনে যত চ্যালেঞ্জ
তৃতীয়ত, সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে, বিশেষ করে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন। এতদিন আমরা বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার বা প্রেফারেন্স সুবিধা পেয়েছি, কিন্তু গ্র্যাজুয়েশনের পর আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তিতে টিকে থাকতে হবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও এখন জটিল। বিভিন্ন দেশ, যেমন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র, নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই পরিবেশে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
চতুর্থত, নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে—যেমন সর্বজনীন মিডডে মিল, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি—এসব বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ, আমাদের রাজস্ব আহরণ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। ফলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যথায় ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করবে।
ক্ষমতায় বসার পর সরকারকে একটি বাজেট দিতে হবে। এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কী ধরনের দিকনির্দেশনা থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
বাজেট হবে এই সরকারের প্রথম বড় নীতিগত বার্তা। আমার মতে, তারা প্রথমে বর্তমান বাজেটকে ছয় মাসের বাস্তব পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সংশোধন করে একটি রিভাইজড বাজেট দিতে পারে। এরপর একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করতে হবে।
এই বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে দেশীয় শিল্প ও বিনিয়োগ কীভাবে চাঙা করা যায়। এজন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। প্রণোদনা কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। শুল্ক ও কর ব্যবস্থায় যৌক্তিকীকরণ আনতে হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি ও থিংক ট্যাংক যখন সরকারের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করবে, তখন সেটি ইতিবাচকভাবে নেওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার, বিরোধীদল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম—সবাই মিলে একটি জবাবদিহিতামূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে
একই সঙ্গে ব্যয়ের দিকেও বড় ধরনের চাপ থাকবে। সরকার যদি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে চায়, তবে তার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ—এসব ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে আয় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে।
রাজস্ব বাড়াতে হলে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি হ্রাস—এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। অপ্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো সমাধান নয়। বরং প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো ও কর ব্যবস্থা আধুনিক করা জরুরি।
উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও আমি মনে করি অযথা আকার বাড়ানোর চেয়ে চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত, সাশ্রয়ী ও সুশাসনের ভিত্তিতে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোই হবে বেশি কার্যকর পদক্ষেপ।
প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা উচিত বলে মনে করেন?
প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাজস্ব বোর্ড, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যদি যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সেগুলো কার্যকর হবে।
প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোতে দক্ষ, সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী ওভারসাইট ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। সংসদীয় কমিটিগুলো যদি সক্রিয়ভাবে কাজ করে এবং সেখানে বিরোধীদলের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে। একটি সক্রিয় সংসদই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।
মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
এটি অবশ্যই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা থাকবে, মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিরা থাকবেন যারা সৎ, আত্মবিশ্বাসী, উদ্ভাবনী চিন্তাসম্পন্ন এবং দায়িত্বশীল। তারা যেন নিজেদের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন এবং অধীনস্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করেন।
মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি ও থিংক ট্যাংক যখন সরকারের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করবে, তখন সেটিকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার, বিরোধীদল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম—সবাই মিলে একটি জবাবদিহিতামূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সংসদীয় তদারকি শক্তিশালী হলে এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে সরকার জনগণের যে আস্থা নিয়ে ক্ষমতায় আসবে, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে।
আইএইচও/এএসএ
What's Your Reaction?