বাংলাদেশ এমন একজন রাষ্ট্রপতি পেতে যাচ্ছে, যিনি বাংলাদেশপন্থি
এহসান মাহমুদ বৃহস্পতিবার। কিছুক্ষণ পরেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে। সেই সময়ে স্যারের সচিবালয়ের কক্ষে যাই। স্যারের দীর্ঘদিনের সহকারী ইউনুস ভাই লোকজন সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্যারের সঙ্গে নানা ধরনের লোকজন দেখা করতে আসছেন। সচিবালয়ের লোক, দলের লোক, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কয়েকজন এসেছেন। শেষ মুহূর্তে তাদের দাবি, অনুরোধ জানাচ্ছেন, আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছেন। ইউনুস ভাই লোকজনকে সহায়তা করছেন। স্যার প্রতিদিনের মতো মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনছেন, কাগজে স্বাক্ষর করছেন, কুশল জানতে চাইছেন। একবার মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে আমাকে দেখে সহজ গলায় বললেন, ‘কী খবর এহসান? বসো।’ আমি দূরের সোফায় বসি। ইউনুস ভাই বারবার ঘড়ি দেখছেন। সাড়ে বারোটায় মিটিংয়ে যেতে হবে স্যারের। ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে বারোটায় পৌঁছেছে। আমি দূরের সোফায় বসে দেখছি, স্যার হাতে একবার টিস্যু তুলে নিলেন। কপালে কিছুক্ষণ পরপর চাপ দিচ্ছেন। দূর থেকে দেখে মনে হলো কিছু একটা মুছতে চেষ্টা করছেন। একজন অফিস স্টাফ আমার এবং স্যারের জন্য চা নিয়ে এলেন। দেখলাম স্যার চায়ের কাপ ধরছেন না। যেহেতু সাড়ে বারোটা
এহসান মাহমুদ
বৃহস্পতিবার। কিছুক্ষণ পরেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে। সেই সময়ে স্যারের সচিবালয়ের কক্ষে যাই। স্যারের দীর্ঘদিনের সহকারী ইউনুস ভাই লোকজন সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্যারের সঙ্গে নানা ধরনের লোকজন দেখা করতে আসছেন। সচিবালয়ের লোক, দলের লোক, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কয়েকজন এসেছেন। শেষ মুহূর্তে তাদের দাবি, অনুরোধ জানাচ্ছেন, আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছেন। ইউনুস ভাই লোকজনকে সহায়তা করছেন।
স্যার প্রতিদিনের মতো মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনছেন, কাগজে স্বাক্ষর করছেন, কুশল জানতে চাইছেন। একবার মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে আমাকে দেখে সহজ গলায় বললেন, ‘কী খবর এহসান? বসো।’ আমি দূরের সোফায় বসি।
ইউনুস ভাই বারবার ঘড়ি দেখছেন। সাড়ে বারোটায় মিটিংয়ে যেতে হবে স্যারের। ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে বারোটায় পৌঁছেছে। আমি দূরের সোফায় বসে দেখছি, স্যার হাতে একবার টিস্যু তুলে নিলেন। কপালে কিছুক্ষণ পরপর চাপ দিচ্ছেন। দূর থেকে দেখে মনে হলো কিছু একটা মুছতে চেষ্টা করছেন। একজন অফিস স্টাফ আমার এবং স্যারের জন্য চা নিয়ে এলেন। দেখলাম স্যার চায়ের কাপ ধরছেন না।
যেহেতু সাড়ে বারোটায় স্যারের বের হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যাওয়ার কথা, সেজন্য দ্রুত চা শেষ করে আমি ১২টা ১০ মিনিটের দিকে স্যারের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াই। এই সময়ে স্যারের মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন এসে কক্ষে জড়ো হন। ইউনুস ভাই স্যারকে বললেন, সবাই স্যারের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইছেন। স্যারের মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন স্যারকে ঘিরে দাঁড়ালেন। স্যার আমার দিকে তাকালেন। আমি স্যারের পিএসের মোবাইল দিয়ে সবার ছবি তুলে দিলাম। সবার ছবি তোলা হলে ইউনুস ভাই তার মোবাইল দিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার এই ছবিটি তুলে দিলেন।
স্যারকে সালাম জানিয়ে একে একে সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। স্যার তারপরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, ‘বসো।’ আমি স্যারের ঠিক মুখোমুখি একটি চেয়ারে বসলাম। ইউনুস ভাই কক্ষের দরজা লাগিয়ে দিলেন, যাতে আর কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন। স্যার ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলেন, ইউনুস ভাই স্যারের ব্লেজারটি হাতে তুলে দিলেন। স্যার আবার চেয়ারে বসলেন কিছুটা ঝুঁকে। এবার দেখলাম তার কপালে একটি জায়গায় ক্ষতচিহ্নের মতো। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘একটি ছোট্ট আঁচিল হয়েছিল, লেজার করিয়েছি।’ এবার বুঝতে পারলাম দূর থেকে টিস্যু দিয়ে তিনি বারবার কী চাপ দিচ্ছিলেন। আঁচিলের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে স্যার কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছেন বলে একবার মনে হলো। অস্বস্তি কাটানোর জন্য নাকি আমার কুশল জানার জন্য ঠিক বুঝতে পারলাম না, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব ঠিক আছে তো পরিস্থিতি? অপেক্ষা কর।’
কথা শেষ করেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ধীরে ধীরে লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন। লিফটের সামনে প্রচুর লোকজন জমে আছে। সবাই স্যারকে সালাম জানালেন, বিদায় জানালেন। স্যার হাত তুলে সকলের জবাব দিলেন। লিফটে প্রবেশ করে বাইরে থাকা আমাদের দিকে ইশারা করে ভেতরে ডাকলেন। ইউনুস ভাই আমিসহ আরও দুই-একজন উঠতে পারলাম লিফটে। লিফটের মধ্যে স্যারের ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়াতে হলো। লিফট নিচে নামতে শুরু করলেই একবার মনে হলো স্যার জোরে শ্বাস নিলেন। সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবন থেকে তিনি গাড়িতে উঠে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এক নম্বর ভবনের দিকে চলে গেলেন। লিফট থেকে নেমে গাড়িতে ওঠার এই সামান্য দূরত্বটুকু হেঁটে অতিক্রম করতে স্যার যতটুকু সময় নিলেন, ঠিক ততটুকু সময় তিনি মাথা নিচু করে নিজের মধ্যেই মগ্ন ছিলেন বলে দেখা গেল। বিগত কয়েক বছরে স্যারের কাছাকাছি থেকে যতটুকু দেখার সুযোগ পেয়েছি, এটুকু বুঝেছি যে, এই সময়টা তিনি আসলে অতীত ভ্রমণ করেন! অর্থাৎ কতটা পথ পেছনে তিনি রেখে এলেন!
স্যারের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনটির কথা মনে পড়ল। স্যারের সেই উত্তরার বাসা। তারপরে কত মাস পেরিয়ে গেল! বছর পেরিয়ে গেল! আমরা যারা পারিবারিকভাবে কোনো প্রকার রাজনৈতিক পরিবারের লোক ছিলাম না, শিক্ষাজীবনে কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সক্রিয় ছিলাম না, বিপরীতে ‘আই হেট পলিটিক্স’ ধারণা নিয়ে বয়স বৃদ্ধি করেছিলাম কেবল, সেই জেনারেশনের একজন হয়ে কীভাবে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল পরিবর্তনের লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলাম, সেটা নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর খুঁজে পেলাম। এই সাহসের নাম, অনুপ্রেরণার নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার প্রতি আমার ব্যক্তিগত ঋণের বাইরে আরও যে ঋণ রয়ে গেছে, সেটা সম্ভবত আমাদের এই জেনারেশনের ঋণ। রাজনীতিকে ঘৃণা করা একটি জেনারেশন রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠার পেছনে একজন মির্জা আলমগীরের অবদান আমরা বহুকাল স্মরণ রাখবো।
বহুকাল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসেবে অযোগ্য, অথর্ব এবং বাংলাদেশবিরোধী লোকজন যেভাবে ছিল, তাতে করে নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য তা কোনো গর্বের ঘটনা ছিল না। মির্জা আলমগীরকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে নাগরিকদেরও আরও সম্মানিত করার সুযোগ এনে দিলো।
বাংলাদেশ এমন একজন রাষ্ট্রপতি পেতে যাচ্ছে, যিনি বিগত প্রায় ৪ দশক বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সব সময় বাংলাদেশপন্থি ছিলেন। যিনি ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আন্তরিক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাই- সময়ের এই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য।
মির্জা আলমগীর যেই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হলেন, সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়লো মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কথা। মির্জা আলমগীরকে যেই মুহূর্তে বিএনপির মহাসচিব করা হয়েছিল; সেই সময়ে বিএনপিতে আরও অনেক নেতা ছিলেন, মহাসচিব হওয়ার মতো। কিন্তু খালেদা জিয়া ভরসা রাখলেন মির্জা আলমগীরের প্রতি।
আজ বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এসে প্রমাণিত হলো, বেগম খালেদা জিয়া মির্জা আলমগীরকে বাছাই করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যার ফলে মির্জা আলমগীরের মতো প্রফেসর অব পলিটিক্স একজনকে আমরা পাচ্ছি রাষ্ট্রপতি হিসেবে। এই মুহূর্তটি দল হিসেবে বিএনপি এবং তার লাখো কোটি সমর্থকদের জন্য আনন্দের। পাশাপাশি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য গর্বের। আমাদের এই গর্বের অংশীদার হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
লেখক: কবি, ঔপন্যাসিক ও কলামিস্ট।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক আইডি থেকে নেওয়া)
এসইউ
What's Your Reaction?


