বাংলাদেশিদের জন্য মার্কিন ভিসায় জামানত আরোপ, যা জানা প্রয়োজন
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন এক পাইলট প্রোগ্রামের অধীনে এখন থেকে নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের মার্কিন বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসা পাওয়ার জন্য ‘ভিসা বন্ড’ বা আর্থিক জামানত প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (আএনএ) এর ২২১ (জি) (৩) ধারার আলোকে ভিসা জামানতের তালিকায় দেশ অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেড ডিপার্টমেন্ট। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত, যা আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য কার্যকর হবে। তাই এই ভিসা বন্ড বা ভিসা জামানত সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে ইচ্ছুক বাংলাদেশি নাগরিকদের কিছু তথ্য জেনে সচেতন থাকা প্রয়োজন। না হলে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সম্ভাব্যতা হারানোর পাশাপাশি দালালের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সাধারণভাবে যা জানা যায় যুক্তরাষ্ট্র ভমণের জন্য ভিসা আবেদনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ভিসা সাক্ষাৎকার’ যা মার্কিন দূতাবাসের একজন কনস্যুলার অফিসার নিয়ে থাকেন। এই সাক্ষাৎকারের সময়েই কনস্যুলার অফিসার নির্ধারণ করবেন যে, আবেদনকারীকে কত টাকা জামানত দিতে হবে। এর পরিমাণ হতে পারে ৫ হাজার বা ১০ হাজার বা ১৫ হাজার মার্কিন
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন এক পাইলট প্রোগ্রামের অধীনে এখন থেকে নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের মার্কিন বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসা পাওয়ার জন্য ‘ভিসা বন্ড’ বা আর্থিক জামানত প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (আএনএ) এর ২২১ (জি) (৩) ধারার আলোকে ভিসা জামানতের তালিকায় দেশ অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেড ডিপার্টমেন্ট। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত, যা আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য কার্যকর হবে। তাই এই ভিসা বন্ড বা ভিসা জামানত সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে ইচ্ছুক বাংলাদেশি নাগরিকদের কিছু তথ্য জেনে সচেতন থাকা প্রয়োজন। না হলে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সম্ভাব্যতা হারানোর পাশাপাশি দালালের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সাধারণভাবে যা জানা যায়
যুক্তরাষ্ট্র ভমণের জন্য ভিসা আবেদনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ভিসা সাক্ষাৎকার’ যা মার্কিন দূতাবাসের একজন কনস্যুলার অফিসার নিয়ে থাকেন। এই সাক্ষাৎকারের সময়েই কনস্যুলার অফিসার নির্ধারণ করবেন যে, আবেদনকারীকে কত টাকা জামানত দিতে হবে। এর পরিমাণ হতে পারে ৫ হাজার বা ১০ হাজার বা ১৫ হাজার মার্কিন ডলার। এই অর্থ কোনো এজেন্ট বা তৃতীয় পক্ষের কাছে নয়, বরং সরাসরি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (Pay.gov) এর মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশ ছাড়া আগে থেকে কোনো টাকা জমা দেবেন না। এই বন্ড দিয়ে ভিসা পেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশটিতে প্রবেশ এবং সেখান থেকে প্রস্থানের সুবিধা পাবেন না ভ্রমণকারী। ভ্রমণকারীকে বাধ্যতামূলকভাবে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি, ভার্জিনিয়ার ওয়াশিংটন ডুলেস এবং বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থেকে একটি বেঁছে নিতে হবে। আবার খেয়াল রাখতে হবে যে, জামানত প্রদান করা ভিসা পাওয়াকে নিশ্চিত করে না।
ভিসা জামানত প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য
‘ওভারস্টে’ অর্থ্যাৎ ভ্রমণকারীর জন্য নির্ধারিত সময়সীমার বেশি অবস্থানকে কমাতে এই পাইলট প্রোগ্রাম চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রোগ্রামের মূল্য লক্ষ্য হলো নন-ইমিগ্র্যান্ট বি১/বি২ ভিসা আবেদনকারীদের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করা। এই জামানত আরোপের পেছনে আরও একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে।
ভিসা আবেদনের সময় যথেষ্ট আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণে ভুয়া দলিল প্রদানের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির দেশগুলোর নাগরিকদের মাঝে। তাদের অনেকেই আবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ওভারস্টে অবস্থায় অথবা রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের (অ্যাসাইলাম) আবেদনের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন সুবিধা নেন।
দেশটির ফেডারেল, স্টেট এবং সিটি গভর্নমেন্টের জটিল তবে সুরক্ষিত আইনি ব্যবস্থার কারণে আবেদনকারীকে এসব সুবিধা প্রদান অস্বীকারের আইন তৈরি অনেক দুরুহ। তাই এমন ভ্রমণকারীদের প্রবেশ কমানো এবং প্রবেশ করলেও তাদেরকে তাদেরই অর্থে সরকারি সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করতেই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই ভিসা জামানত প্রোগ্রাম কার্যকর করেছে।
‘ওভারস্টে’ বিষয়ক প্রতিবেদন ও বাংলাদেশের চিত্র
এই ওভারস্টে সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন গত জুলাইতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)। অর্থবছর ২০২৪ সালের ওপর নির্মিত ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সে বছর মোট ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৭ হাজার ১০৮ জন নন-ইমিগ্র্যান্ট দর্শনার্থীর যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। অর্থবছর ২০২৩ থেকে এই সংখ্যা ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। তবে এদের মাঝে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৮ জন ‘ওভারস্টে’ করেছেন অর্থ্যাৎ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাননি। ওভারস্টে এর হার এক দশমিক ১৫ শতাংশ। ওভারস্টে করা দর্শনার্থীদের মাঝে মাত্র ৫৫ হাজার ৫৯৪ জন অর্থ্যাৎ শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ ভিসার নির্ধারিত মেয়াদের পরে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন। তবে সিংহভাগ ৪ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ জন অর্থ্যাৎ ১ দশমিক ১৫ শতাংশ দর্শনার্থী যুক্তরাষ্ট্রেই থেকেই গেছেন বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছেড়ে যাননি।
এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন, যার তথ্য এই প্রতিবেদনেও এসেছে। ওই বছর ৩৮ হাজার ৫৯০ জন বাংলাদেশির যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার কথা ছিল। তবে ২ হাজার ২১৩ জন নির্ধারিত সময়ের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেননি। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশিদের মাঝে ওভারস্টের হার ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এদের মাঝে নির্ধারিত সময়ের পর অর্থ্যাৎ ওভারস্টে করে দেশ ছেড়েছেন ৫১ জন। আর বাকি ২ হাজার ১৬২ জনই ভিসায় নির্ধারিত সময়ের পরেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গেছেন।
এই নিয়ম কাদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক?
যারা আর্থিকভাবে দুর্বল
>> যারা পর্যটন, আত্মীয়-বন্ধুদের জন্য ভিসা চান তাদের জন্য ৫–১৫ হাজার ডলার জামানত দেওয়া খুব কঠিন হতে পারে।
>> অনেক পরিবারে এটিকে ভিসা আবেদনই অসম্ভব করার মতো বাধা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
যারা নিয়ম পালনে অসাবধান
>> যারা ভিসা পেয়ে যাওয়ার পরেও সঠিক সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে না পারেন, তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
>> ওভারস্টে-এর হার যেসব দেশের ক্ষেত্রে বেশি, তাদের নাগরিকদের প্রভাব আরও বেশি।
পরিবার ভ্রমণ বা স্বল্প সময়ের সফরকারীরা
>> ছোট-খাটো ভ্রমণ, সমাবর্তন বা চিকিৎসাসহ সাধারণ উদ্দেশ্যে যারা যাচ্ছেন, তাদের জন্য এই অর্থ জমানো কঠিন।
কাদের দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই?
ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত যারা : যারা যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন তাদের জন্য এই প্রোগ্রামে দুশ্চিন্তার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ যেসব দেশের নাগরিক ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামের আওতায় ভিসা ছাড়া যেতে পারেন, তাদের জন্য এই জামানতের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের নাগরিক এই সুবিধা পান না, তাই বাংলাদেশের আবেদনকারীদের এই দুশ্চিন্তা থাকবে।
যাদের ইতিমধ্যেই ভিসা আছে : যারা ইতিমধ্যেই বৈধ বি১/বি২ ভিসা পেয়ে গেছেন এবং ভিসার মেয়াদ আছে তাদেরকে এই নিয়মের আওতায় পড়তে হবে না। তবে ভিসার মেয়াদের কোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করলে এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকালে তাদের ওপরও জামানত শর্ত কার্যকর হতে পারে।
নূন্যতম বন্ড প্রয়োজন নয় এমন ভিসা ক্যাটেগরি যাদের : স্টুডেন্ট ভিসা (এফ১), ওয়ার্ক ভিসা (ইবি-১, ইবি-২, ইবি-৩) ইত্যাদি এই নিয়মের আওতায় পড়ে না। এটা শুধু বি১/বি২ টুরিস্ট বা বিজনেস ভিসার জন্য।
আবার যারা ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য আবেদন করছেন, সহজ ভাষায় যাদেরকে গ্রিনকার্ড ভিসা বলে, তারাও এই জামানতের আওতামুক্ত।
জামানত ফেরত পাওয়ার নিয়ম কী?
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) যদি রেকর্ড করে যে, ভিসাধারী ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত অবস্থান-মেয়াদের শেষ তারিখের আগে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন, অথবা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভিসাধারী ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণই করেননি, অথবা ভিসাধারী ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রবেশ বন্দরে প্রবেশের জন্য আবেদন করেছেন কিন্তু প্রবেশের অনুমতি পাননি তাহলে তার দেওয়া ভিসা জামানত ফেরত দেওয়া হবে।
বাংলাদেশিদের জন্য এর সার্বিক প্রভাব কী?
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে সফরকারীদের খরচ বাড়বে। এখন থেকে ভিসা আবেদন করার আগে জামানতের টাকা প্রস্তুত রাখা লাগবে। এটা ভ্রমণ খরচের ওপর বড় চাপ ফেলবে। শিক্ষার্থীদেরকে ভিসার সময় এই প্রকল্পের আওতায় জামানত দিতে হবে না। তবে যেসব শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় অথবা সমাবর্তনের সময় মা-বাবা, ভাই-বোন বা অন্যান্য স্বজনদের আনতে চান, তাদের জন্য এটি অতিরিক্ত অর্থের বোঝা।
একইভাবে, ‘ফ্যামিলি রি-ইউনিয়ন’ বা স্বজনদের সাথে সাক্ষাতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি নাগরিকরা সহজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন না, কারণ টাকাটা আগে সংগ্রহে রাখতে হবে। এছাড়াও ওভারস্টে বা অন্য কোনো নিয়ম ভঙ্গ করলে ব্যক্তিগত অর্থ এবং ভবিষ্যতের ভিসা সুযোগে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
আর কোন কোন দেশের জন্য এই নিয়ম কার্যকর আছে?
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের হালানাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডা, বেনিন, ভুটান, বোতসোয়ানা, বুরুন্ডি, ক্যাবো ভারদে, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, কোটে লিভোরি, কিউবা, ডিজিবুতি, ডমিনিকা, ফিজি, গ্যাবন, গাম্বিয়া, গিনি, গিনি বিসৌ, কিরজিকিস্তান, নেপাল, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, তাজিকিস্তান, টোগো, টোঙ্গা, টুভালু, উগান্ডা, ভানুয়াতু, জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলার জন্য এই নিয়ম কার্যকর হবে।
এছাড়াও গত বছরের ২০ আগস্ট থেকে জাম্বিয়া এবং মালাওয়ি, ২৩ অক্টোবর থেকে মারিতানিয়া, সাও টোম ও প্রিন্সিপ এবং তানজানিয়া এবং চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নামিবিয়া এবং তুর্কমেনিস্তানে ভিসা আবেদন জামানত প্রদানের নিয়ম কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
What's Your Reaction?