বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের উত্তরাধিকার ও চ্যালেঞ্জ : একটি নীতিগত পুনর্বিবেচনা
বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস কোনো আকস্মিক উত্থানের গল্প নয়; এটি দীর্ঘ নীতিগত বিবর্তন, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং সময়োপযোগী সংস্কারের ফল। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক ও ব্যক্তি খাতনির্ভর কাঠামোয় উত্তরণের যে যাত্রা, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়পর্বে মোড় নিয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক বাস্তববাদিতার ভিত্তি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই ভিত্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে দৃঢ় করেন। এখন জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে-এই উত্তরাধিকার ধারণ করে বর্তমানের জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কী ধরনের নীতিপথ গ্রহণ করা হবে? স্বনির্ভরতার ভিত্তি : জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ১৯৭৫-৮১ সময়কাল ছিল পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের অধ্যায়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। উচ্চফলনশীল বীজ, সার ও সেচ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হয়। ‘খাল কাটা’ কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক
বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস কোনো আকস্মিক উত্থানের গল্প নয়; এটি দীর্ঘ নীতিগত বিবর্তন, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং সময়োপযোগী সংস্কারের ফল। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক ও ব্যক্তি খাতনির্ভর কাঠামোয় উত্তরণের যে যাত্রা, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়পর্বে মোড় নিয়েছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক বাস্তববাদিতার ভিত্তি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই ভিত্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে দৃঢ় করেন। এখন জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে-এই উত্তরাধিকার ধারণ করে বর্তমানের জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কী ধরনের নীতিপথ গ্রহণ করা হবে?
স্বনির্ভরতার ভিত্তি : জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৭৫-৮১ সময়কাল ছিল পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের অধ্যায়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। উচ্চফলনশীল বীজ, সার ও সেচ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হয়। ‘খাল কাটা’ কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত গতি আনে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তি খাতে হস্তান্তরের মাধ্যমে বেসরকারীকরণের সূচনা হয়। তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ উন্মুক্তকরণ-এই নীতিগুলো পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়। অর্থনীতি ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বাজারমুখী অভিযাত্রায় অগ্রসর হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর : খালেদা জিয়ার সংস্কারপর্ব
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া অর্থনীতিকে কাঠামোগত রূপান্তরের পথে এগিয়ে নেন। তার অন্যতম শক্তি ছিল-দক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া এবং রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করা।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন ছিল যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও এটি বাস্তবায়িত হয় এবং রাজস্ব কাঠামো আধুনিক হয়। উন্নয়ন বাজেটে দেশীয় সম্পদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। যদিও এখনো কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি, তবুও ভ্যাট রাজস্ব ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
আমদানি কোটা বাতিল ও শুল্ক যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে বাণিজ্য উদারীকরণ বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করে। রপ্তানি প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। ২০০৩ সালে নমনীয় বিনিময় হার চালু হওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নতুন বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স সীমিত রাখা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সামাজিক খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়-প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের উপবৃত্তি, দরিদ্রবান্ধব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত শক্ত করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃতি পায়; ২০০৫ সালে Goldman Sachs ‘Next 11’ তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে।
তবে সীমাবদ্ধতাও ছিল। দুর্নীতির অভিযোগ, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ সংকট পরবর্তী সময়ের জন্য চাপ তৈরি করে। অর্থাৎ সংস্কারের সাফল্যের পাশাপাশি সুশাসনের ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি।
বর্তমান বাস্তবতা : বহুমাত্রিক সংকট
আজকের বাংলাদেশ অর্থনীতির আকারে বড়, কিন্তু চ্যালেঞ্জও বহুগুণে জটিল। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ও পুনঃতপশিলীকরণ সংস্কৃতি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে। তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক চাহিদা সংকোচন, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজার সুবিধার অনিশ্চয়তায় চাপে আছে। বিদেশি বিনিয়োগ নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতায় প্রত্যাশিত গতিতে আসছে না। ফরেন রিজার্ভ আমদানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের চাপে অস্থির। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়বৈষম্য সামাজিক চাপ বাড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সরকার গঠনের চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক নির্বাচনে দুই শতাধিক আসনে জয়লাভের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে। দেড় দশকের বেশি সময় পর তারেক রহমান সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে সামনে রয়েছে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল করার কঠিন কাজ।
প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকর করা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপের বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানোতে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কৌশলগত ভারসাম্য জরুরি। ইউরোপীয় বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি যেন দলীয় একচ্ছত্রতায় পরিণত না হয়-গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
করণীয় : নীতিগত অগ্রাধিকার
নতুন সরকার যদি সংস্কারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়, তবে কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার পেতে হবে-
১. ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
২. প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করা।
৩. রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নে জোর দেওয়া।
৪. পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট উন্নয়ন।
৫. কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করা।
৬. দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
৭. প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন।
উপসংহার
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-অজনপ্রিয় হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সাফল্যের ভিত্তি গড়ে তোলে। জিয়াউর রহমান স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; খালেদা জিয়া সেই স্বপ্নকে কাঠামোগত রূপ দেন। আজ সেই উত্তরাধিকার নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ ভিন্ন মাত্রার-প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি। ইতিহাস বলছে, যেখানে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, সেখানে সাফল্যের সম্ভাবনাও বেশি।
সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখানো- এই পথেই বাংলাদেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
লেখক : ম্যানেজিং পার্টনার ও সিইও, শফিকুল আলম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস।
চেয়ারম্যান, বিজ সলুশনস পিএলসি।
What's Your Reaction?