বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের দুঃসময় কাটছেই না

লোহার তৈরি এক বিশাল ভাসমান খাঁচা, চারপাশে অন্তহীন নীল জলরাশি আর মাথার ওপর প্রতিনিয়ত বয়ে যাওয়া মিসাইল আর যুদ্ধের সাইরেন; এই নিয়েই কেটে গেছে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস। বৈশ্বিক রাজনীতির নির্মম মারপ্যাঁচে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ জন নাবিকের জীবন থেকে যেন স্বাভাবিক সময়টাই হারিয়ে গেছে।  গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার পর তাদের চোখেমুখে স্বস্তির যে আলো উঁকি দিয়েছিল, তা-ও এখন আবার মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণায়। তাই চুক্তি হলেও কাটছে না এই সমুদ্র-যোদ্ধাদের বন্দিদশার দুঃসময়। বর্তমানে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে আছে। সেখান থেকে মাত্র ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে হরমুজ প্রণালি। এই সামান্য পথটুকু পার হতে পারলেই দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে জাহাজটি। কিন্তু চুক্তির পর খুলেও হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ ঘোষণা করায় সেই অনিশ্চিত অপেক্ষার প্রহর যেন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম রোববার দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপে কালবেলাকে বলেন, ‘আ

বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের দুঃসময় কাটছেই না

লোহার তৈরি এক বিশাল ভাসমান খাঁচা, চারপাশে অন্তহীন নীল জলরাশি আর মাথার ওপর প্রতিনিয়ত বয়ে যাওয়া মিসাইল আর যুদ্ধের সাইরেন; এই নিয়েই কেটে গেছে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস। বৈশ্বিক রাজনীতির নির্মম মারপ্যাঁচে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ জন নাবিকের জীবন থেকে যেন স্বাভাবিক সময়টাই হারিয়ে গেছে। 

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার পর তাদের চোখেমুখে স্বস্তির যে আলো উঁকি দিয়েছিল, তা-ও এখন আবার মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণায়। তাই চুক্তি হলেও কাটছে না এই সমুদ্র-যোদ্ধাদের বন্দিদশার দুঃসময়।

বর্তমানে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে আছে। সেখান থেকে মাত্র ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে হরমুজ প্রণালি। এই সামান্য পথটুকু পার হতে পারলেই দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে জাহাজটি। কিন্তু চুক্তির পর খুলেও হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ ঘোষণা করায় সেই অনিশ্চিত অপেক্ষার প্রহর যেন আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম রোববার দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপে কালবেলাকে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সবাই সুস্থ আছি। এখন শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান নিয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষা করছি। বর্তমানে জাহাজটি যে অবস্থানে রয়েছে, সেখান থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব প্রায় ৮০ নটিক্যাল মাইল। স্বাভাবিক গতিতে এই পথ অতিক্রম করতে জাহাজটির আনুমানিক ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।’

হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে সর্বশেষ যে তথ্য রয়েছে, তা অনুযায়ী স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রণালি একটু খুললেও আবার বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি মিললেই জাহাজটি তার পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। আপাতত আমরা এখানেই আছি।’

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। এর পরদিনই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলা শুরু হলে পুরো পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যায়। বন্দরে ভেড়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় জাহাজটি থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল আঘাত হানে। চোখের সামনে আগুনের সেই লেলিহান শিখা আর মাথার ওপর দিয়ে একের পর এক ড্রোন ও রকেট উড়ে যাওয়ার আতঙ্ক সঙ্গী করেই শুরু হয় এই ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকের দুঃস্বপ্নের দিনগুলো।

এরপর থেকে গত সাড়ে তিন মাসে অন্তত তিনবার সমুদ্রের এই মরণফাঁদ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছে জাহাজটি, কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে চরম হতাশা।

প্রথম দফায় জেবেল আলী বন্দর থেকে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও আকাশজুড়ে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর ড্রোন হামলার আশঙ্কায় আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড জাহাজটিকে মাঝপথ থেকে ফিরে আসার পরামর্শ দেয়। বাধ্য হয়ে আবার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসে ‘জয়যাত্রা’।

দ্বিতীয় দফায় গত ৮ এপ্রিল এক সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে নোঙর তুলে হরমুজ প্রণালির দিকে ছুটছিল জাহাজটি। কিন্তু সেবারও মেলেনি পারাপারের সবুজ সংকেত।

সবশেষ গত ১৭ এপ্রিল ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর থেকে বুকভরা আশা নিয়ে ফের যাত্রা শুরু করেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু ভাগ্য এবারও সহায় হয়নি। পরদিন হরমুজ প্রণালির দোরগোড়ায় পৌঁছেও অনুমতি না পেয়ে শূন্য হাতে আবার সেই মিনা সাকার বন্দরেই ফিরে আসতে হয় জাহাজটিকে। এভাবে বারবার আশা জাগিয়েও ব্যর্থ হওয়া এই নাবিকদের মনোবলকে এখন অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে।

সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুঃসময় সহজে কাটার নয়। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, ‘চুক্তি হওয়া মানেই পথ খুলে যাওয়া নয়। যুদ্ধের সময়ে এই সরু চ্যানেলে যে তিন স্তরের মাইন পাতা হয়েছিল, সেগুলো আগে পুরোপুরি অপসারণ করতে হবে। তাছাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ শ জাহাজ সেখানে জট পাকিয়ে আছে। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও প্রায় এক মাস লাগতে পারে।’

‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানির অধীনে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজটিতে ৩৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন সার রয়েছে। হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে পারলে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা রয়েছে ‘বাংলার জয়যাত্রার’।

বিএসসি’র এমডি কমডোর মাহমুদুল মালেক কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এসে অপেক্ষায় আছে। হরমুজ প্রণালি খুললে অতিক্রম করবে বলে আমরা আশা করছি। জাহাজের নাবিকদের সাথে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তারা সবাই ভালো আছেন। তাদের খাবার, পানিসহ সবকিছু মজুদ করা আছে।’

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow