বাকস্বাধীনতা, সত্য এবং নতুন বাংলাদেশের পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশ এক অদ্ভুত সময় পার করছে। একদিকে বহু বছরের দমন, বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের স্মৃতি; অন্যদিকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবর্তন কি শুধু ক্ষমতার বদল, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন? সবই তো বললাম, এবার আসুন ভালো কথা বলি। ড. ইউনূস তার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিলেন- যদি দেশ আগের মতোই চলে, তাহলে পরিবর্তনের দরকার কী। দীর্ঘদিন জাতি কথা পর্যন্ত বলতে পারেনি; তাই মানুষ যেন মন খুলে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরির কথাও তিনি বলেছিলেন। আজ বাস্তবতা হলো, মানুষ কথা বলছে। সমালোচনা করছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন মত দিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি সত্য বলছি, নাকি শুধু উচ্চস্বরে বলছি? বাকস্বাধীনতা : সুযোগ না বিপদ? ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে নাগরিকদের ঐক্

বাকস্বাধীনতা, সত্য এবং নতুন বাংলাদেশের পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশ এক অদ্ভুত সময় পার করছে। একদিকে বহু বছরের দমন, বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের স্মৃতি; অন্যদিকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবর্তন কি শুধু ক্ষমতার বদল, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন?

সবই তো বললাম, এবার আসুন ভালো কথা বলি।

ড. ইউনূস তার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিলেন- যদি দেশ আগের মতোই চলে, তাহলে পরিবর্তনের দরকার কী। দীর্ঘদিন জাতি কথা পর্যন্ত বলতে পারেনি; তাই মানুষ যেন মন খুলে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরির কথাও তিনি বলেছিলেন।
আজ বাস্তবতা হলো, মানুষ কথা বলছে। সমালোচনা করছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন মত দিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি সত্য বলছি, নাকি শুধু উচ্চস্বরে বলছি?

বাকস্বাধীনতা : সুযোগ না বিপদ?

ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি; এবার সবাই অংশ নেবে।

এমন বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই একটি মুক্ত পরিবেশের প্রত্যাশা তৈরি করে।

কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্বাচনের সময় আইনি ও নীতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে নাগরিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অন্যদিকে সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারও কখনও কখনও ভিন্নমত দমনের অভিযোগের মুখে পড়েছে।

অর্থাৎ স্বাধীনতার অনুভূতি ও নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা একই সঙ্গে উপস্থিত।

ভাষার স্বাধীনতা বনাম ভাষার দায়িত্ব

আজ বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান— মানুষ আগের চেয়ে বেশি কথা বলছে। আমরা যার যা খুশি মনের আনন্দে বলে যাচ্ছি। প্রতিদিন মিথ্যা বলতে বলতে যেন সত্য বলার অভ্যাসটাই হারিয়ে ফেলছি।

আমরা সরাসরি ড. ইউনূসকে ‘সুদখোর’ থেকে শুরু করে যা খুশি তাই বলছি। প্রশ্ন হলো, এটি কি সাহস, নাকি সীমা ভুলে যাওয়া?
বাংলায় একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে-
‘হাতি গিলতে গিয়ে এখন বাঘ গিলছি।’
অর্থাৎ ছোট সীমা ভেঙে এখন বড় সীমাও অতিক্রম করছি।
গণতন্ত্রে বাকস্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়; বরং সত্য বলার সাহস এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি।
এখন কখনো কখনো না ভেবেই কথা বলছি।
এই দুই চরমতার মাঝখানেই গণতন্ত্রের ভাষা।

রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন বিশ্বাস

বাংলাদেশ এখন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে। নির্বাসিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, আর অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরেও পক্ষপাত ও প্রতিশোধের অভিযোগ উঠছে।
পরিবর্তন শুরু হয়েছে, কিন্তু তা এখনো স্থিতিশীল নয়।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি বিশ্বাসের কাঠামো।
বিশ্বাস তৈরি হয় তিনটি স্তম্ভে-
১. মুক্ত মত
২. ন্যায়সঙ্গত আইন
৩. গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
এই তিনটির যেকোনো একটি দুর্বল হলে রাষ্ট্র অস্থির হয়।

১২ ফেব্রুয়ারির পর কী?
সামাজিক মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে-১২ তারিখের পর হয়তো বর্তমান বাকস্বাধীনতা থাকবে না। কিন্তু কী ধরনের স্বাধীনতা আসবে, সেটাও স্পষ্ট নয়।
এই আশঙ্কার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো-
আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছি, যা স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে পারে?
রাষ্ট্র স্বাধীনতা দিতে পারে।
কিন্তু সেই স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখে নাগরিকরাই।

নতুন প্রজন্ম : আশার শক্তি না অস্থিরতার ঝুঁকি?

বাংলাদেশের তরুণরাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তারা শুধু প্রতিবাদ করতে জানে না; নৈতিক প্রশ্নও তোলে।
কিন্তু একই সঙ্গে ডিজিটাল যুগ একটি ঝুঁকিও তৈরি করেছে-তথ্য, গুজব এবং মতামত একই গতিতে ছড়ায়। ফলে স্বাধীনতা যদি দায়িত্বহীন হয়, তা দ্রুত বিশৃঙ্খলায় পরিণত হতে পারে।
ইতিহাস বলে, বিপ্লবের চেয়েও কঠিন কাজ হলো স্থিতিশীলতা তৈরি করা।
স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়।
স্বাধীনতা মানে সত্য বলার সাহস।
আমরা যখন ব্যক্তিগত আক্রমণকে মতপ্রকাশ ভাবি, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আর যখন যুক্তিকে সামনে আনি, তখন রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত শুধু নেতা রাষ্ট্রকে বদলায় না।
রাষ্ট্রকে বদলায় নাগরিকের চরিত্র।

স্বস্তি ফেরানোর পথ কোথায়?
জাতির জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের কয়েকটি নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মতপ্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে।
ব্যক্তি আক্রমণ নয়, নীতি নিয়ে বিতর্ক করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।
তরুণদের শুধু আন্দোলনে নয়, প্রতিষ্ঠান গড়ায় যুক্ত করতে হবে।
ক্ষমতাকে অস্থায়ী এবং রাষ্ট্রকে স্থায়ী হিসেবে ভাবতে হবে।
সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট রাজনৈতিক নয়, নৈতিক। আমরা দীর্ঘদিন ভয়ে কথা বলিনি। এখন কখনো কখনো না ভেবেই কথা বলছি।
তাই আসুন, সব বিভাজন ছেড়ে অন্তত একজন মানুষ হিসেবে সত্য কথা বলি এবং সৎভাবে চলি।

পরিশেষে
বাংলাদেশ আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে স্বাধীনতা ও দায়িত্বের ভারসাম্যই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। নির্বাচন শুধু সরকার বদলাবে না; এটি নির্ধারণ করবে আমরা কেমন জাতি হতে চাই।
তাই আসুন, আমরা একটি ছোট কিন্তু কঠিন সিদ্ধান্ত নিই-
মিথ্যার স্বাধীনতা নয়, সত্যের স্বাধীনতা চাই।
অরাজক কণ্ঠ নয়, দায়িত্বশীল কণ্ঠ চাই।
নতুন বাংলাদেশের প্রশ্ন তাই একটাই-
আমরা কি শুধু কথা বলার স্বাধীনতা চাই,
নাকি সত্য বলার সাহসও রাখি?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর শুধু রাজনীতিবিদদের হাতে নয়।
উত্তরটি লিখবে বাংলাদেশের মানুষই।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow