রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের বারবাকপুর গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে প্রতিবন্ধী মুদি দোকানি জাকির হোসেন। জন্মগতভাবে দুই পা অচল তার। তিন বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে আসে। মাকে নিয়ে দুজনের সংসার চালাতে হাল ধরেন মুদি দোকানের। তবে স্থানীয়রা বাকি নিতে নিতে তার দোকানটি এখন প্রায় শূন্য করে ফেলেছে। একরকম পথে বসেছেন জাকির হোসেন।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে জেলা সদরের বারবাকপুর গ্রামে জাকিরের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, পুরো দোকানটি মালামাল শূন্য। আছে শুধু কয়েক প্যাকেট চিপস। তা বিক্রি করার জন্যই বসে আছেন জাকির।
জানা গেছে, বাকি টাকা আদায় করতে গিয়ে বারবার অমানবিকতার শিকার হচ্ছেন তিনি। দোকানে পণ্যের অভাব এবং দেনাদারদের ঋণ না দেওয়ার কারণে প্রতিমাসে তাকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জীবিকার দাগিতে হামাগুড়ি দিয়েই চলতে হয় তাকে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জাকির মুদি দোকানের বেচাকেনার আয় দিয়ে মাকে দিনযাপন করতে চায়। কিন্তু দেনাদারদের কারণে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাই সমাজের বিত্তবান এবং সরকারের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানানো হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী জাকির হোসেন কালবেলাকে জানান, তার দোকানে আগে ভালো বেচাকেনা হতো। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর এলাকার লোকজন বাকি নিয়ে তার দোকান খালি করে দিয়েছে। টাকা চাইতে গেলে অনেকেই তাকে গালাগাল করে। সামাজিক সহায়তা কিংবা সমাধান না পাওয়ায় তিনি এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এমন অবস্থায় তিনি সরকারের কাছে সাহায্য চেয়ে আবেদন করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক বেপারি কালবেলাকে বলেন, প্রতিবন্ধীকতা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হয় তাকে। কারও কাছে হাত পেতে বা ভিক্ষা করে নয় ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাওয়া এই প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ী এখন নিঃস্ব। তার পাশে দাঁড়ায় না কেউ। এমনকি বাড়িয়েও দেয় না হাত।
রাজ্জাক নামে আরেক বাসিন্দা কালবেলাকে বলেন, ছোট্ট এ মুদি দোকানের আয় দিয়েই কোনোমতে ডাল ভাত খেয়ে চলছিল জাকিরের সংসার। কিন্তু দেনাদারদের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে লোকসান গুনতে গুনতে এখন খুবই করুণ অবস্থা জাকিরের।
আবুল কালাম আজাদ নামে আরেক বাসিন্দা কালবেলাকে বলেন, ‘আসলে ওই দোকানদার প্রথমে ভালোই মাল উঠিয়েছিল দোকানে। কিন্তু কিছু মানুষ বাকি খেয়ে দোকানটা শেষ করে দিয়েছে। আর ও প্রতিবন্ধী হওয়ায় অনেকেই সুযোগ পায় ওর দোকানে টাকা না দিয়ে খেত। আমরা চাই ওর একটা আর্থিক সহযোগিতা করা হোক ও যেন দোকানটা আবার পুনরায় সাজাতে পারে। যাদের কাছে টাকা পাওনা আছে তারা যেন অবিলম্বে ওর টাকাটা ফেরত দেয়। সবাই আমরা এটাই চাই।’
স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা ইব্রাহিম কালবেলাকে বলেন, ‘তার দোকানে একটা সময় অনেক মাল ছিল এবং বেচাকেনা হতো। গ্রামের মানুষ তাকে দুর্বল পেয়ে বাকি খেয়ে খেয়ে দোকান একদম খালি করে ফেলেছে। তার প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই। সরকার যেন এ প্রতিবন্ধী ছেলেটাকে সহযোগিতা করে এটাই আমরা চাই।’
আলীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কার সিদ্দিক কালবেলাকে বলেন, ‘সমাজের বিত্তবানদের একটু সহযোগিতাই পারে জাকিরের মতো প্রতিবন্ধী-উদ্যমী ও আগ্রহীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে। এই প্রতিবন্ধী জাকিরের পাশে দাঁড়ানো হবে। তার বকেয়া তুলে দেওয়াসহ আগামীতে তার নামে একটি কার্ডেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’
প্রতিবন্ধী জাকিরের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারিয়া হক কালবেলাকে জানান, ‘তিনি জাকিরের পাশে দাঁড়াবেন এবং দেনাদারদের টাকা পরিশোধ করার জন্য ব্যবস্থা নেবেন।’