বাগদাদের পতন ও একটি সভ্যতার ধ্বংসলীলা
ভাবুন তো, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর বাগদাদে। ভোরের আলো মাত্র ফুটেছে। দজলা নদীর বুক চিরে বাণিজ্যিক জাহাজ ভেসে আসছে। বাজারে মসলার গন্ধ, মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি, আর শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ছে জ্ঞানপিপাসু মানুষের পদচারণা। কেউ যাচ্ছে বায়তুল হিকমায়, কেউ নিযামিয়া মাদ্রাসায়, কেউ আবার কোনো গ্রন্থাগারে যাচ্ছে নতুন অনূদিত পাণ্ডুলিপি পড়তে। এ যেন শুধু একটি শহর নয়—এ যেন পৃথিবীর মস্তিষ্ক। এমন একটি নগরী, যেখানে মানুষের সম্পদ পরিমাপ হতো জ্ঞানের নিক্তিতে। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম দিনে সেই শহরের বুক চিরে নেমে এলো ধ্বংসের এমন ঝড়, যার অভিঘাত আজও মানবসভ্যতা ভুলতে পারেনি। বাগদাদের জন্মই হয়েছিল এক অসাধারণ স্বপ্ন নিয়ে। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর এমন একটি রাজধানী গড়তে চেয়েছিলেন, যা হবে নিরাপদ, সুপরিকল্পিত এবং বিশ্বের কেন্দ্রস্থল। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিনি দজলা নদীর তীরে স্থান নির্বাচন করেন। তার নির্দেশে নির্মিত হয় ইতিহাসের বিখ্যাত গোলাকার নগরী—সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম পরিকল্পিত বৃত্তাকার রাজধানী। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছিল রাজপ্রাসাদ ও জামে মসজিদ; চারদিকে চারটি প্রধান প
ভাবুন তো, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর বাগদাদে। ভোরের আলো মাত্র ফুটেছে। দজলা নদীর বুক চিরে বাণিজ্যিক জাহাজ ভেসে আসছে। বাজারে মসলার গন্ধ, মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি, আর শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ছে জ্ঞানপিপাসু মানুষের পদচারণা। কেউ যাচ্ছে বায়তুল হিকমায়, কেউ নিযামিয়া মাদ্রাসায়, কেউ আবার কোনো গ্রন্থাগারে যাচ্ছে নতুন অনূদিত পাণ্ডুলিপি পড়তে।
এ যেন শুধু একটি শহর নয়—এ যেন পৃথিবীর মস্তিষ্ক। এমন একটি নগরী, যেখানে মানুষের সম্পদ পরিমাপ হতো জ্ঞানের নিক্তিতে। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম দিনে সেই শহরের বুক চিরে নেমে এলো ধ্বংসের এমন ঝড়, যার অভিঘাত আজও মানবসভ্যতা ভুলতে পারেনি।
বাগদাদের জন্মই হয়েছিল এক অসাধারণ স্বপ্ন নিয়ে। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর এমন একটি রাজধানী গড়তে চেয়েছিলেন, যা হবে নিরাপদ, সুপরিকল্পিত এবং বিশ্বের কেন্দ্রস্থল। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিনি দজলা নদীর তীরে স্থান নির্বাচন করেন। তার নির্দেশে নির্মিত হয় ইতিহাসের বিখ্যাত গোলাকার নগরী—সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম পরিকল্পিত বৃত্তাকার রাজধানী। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছিল রাজপ্রাসাদ ও জামে মসজিদ; চারদিকে চারটি প্রধান প্রবেশদ্বার, শক্তিশালী দুর্গপ্রাচীর এবং সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
কিন্তু বাগদাদের প্রকৃত শক্তি তার প্রাচীর কিংবা সৈন্যবাহিনী ছিল না। তার শক্তি ছিল কলম, তার শক্তি ছিল জ্ঞান, তার শক্তি ছিল বিদ্যা।
হারুনুর রশীদের যুগে প্রতিষ্ঠিত এবং মামুনের সময় পূর্ণ বিকাশ লাভ করা বায়তুল হিকমা ছিল মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র। পৃথিবীর নানা ভাষা থেকে গ্রন্থ সংগ্রহ করে এখানে আরবিতে অনুবাদ করা হতো। মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, পারসি—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পণ্ডিতেরা একসঙ্গে কাজ করতেন। গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, দর্শন, ভূগোল, ইতিহাস—কোনো বিদ্যাই সেখানে অবহেলিত ছিল না। শূন্যের ব্যবহারকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলা খাওয়ারিজমির মতো মনীষীরাও এই পরিবেশেই কাজ করেছেন। বাগদাদের আলো তখন এশিয়া পেরিয়ে ইউরোপের অন্ধকার যুগেও আলোকরশ্মি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় নিযামিয়া মাদ্রাসা। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসত বাগদাদে। একজন তরুণ ছাত্রের কাছে তখন বাগদাদে পড়তে যাওয়া ছিল আজকের দিনে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেয়েও বড় স্বপ্ন।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের একটি নির্মম সত্য বারবার মনে করিয়ে দেয়—কোনো সভ্যতার পতন বাইরে থেকে শুরু হয় না; শুরু হয় ভেতর থেকেই।
আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের শেষ যুগে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিলাসিতা, দলীয় বিভাজন এবং দূরদর্শিতার অভাব রাষ্ট্রকে ক্রমশ দুর্বল করে তোলে। যে নগরী একসময় জ্ঞানের মাধ্যমে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেখানে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে করে দেয়।
এদিকে মধ্য এশিয়ার প্রান্তর থেকে উঠে আসছিল এক ভয়ংকর শক্তি—মোঙ্গল। চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরি হালাকু খান একের পর এক মুসলিম জনপদ ধ্বংস করতে করতে এগিয়ে আসছিল বাগদাদের দিকে। খোরাসান, বুখারা, সমরকন্দ, নিশাপুর—অসংখ্য শহর তখন আগুনে পুড়েছে, রক্তে ভেসেছে। সেই আগুনের শিখা একসময় এসে পৌঁছাল ইসলামী বিশ্বের রাজধানীর সামনে।
১২ মহররম, ৬৫৬ হিজরি। শুরু হলো অবরোধ।
দিনের পর দিন প্রাচীর ভাঙতে লাগল মোঙ্গলদের বিশাল যুদ্ধ-যন্ত্র। অবশেষে শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ল। এরপর যা ঘটল, তা শুধু যুদ্ধ ছিল না—তা ছিল একটি সভ্যতার ওপর পরিচালিত সংগঠিত হত্যাযজ্ঞ।
মানুষ কূপের ভেতর লুকিয়েছে, কবরের ভেতর আশ্রয় নিয়েছে, ঘরের ছাদে উঠে প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছে। কিন্তু মৃত্যু যেন সর্বত্র তাদের অপেক্ষায় ছিল। মসজিদে আশ্রয় নেওয়া ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, সাধারণ ব্যবসায়ী, নারী, শিশু—কেউ রেহাই পায়নি। অলিগলি রক্তে ভেসে যায়। মাসের পর মাস অনেক মসজিদে আজান বন্ধ থাকে।
চল্লিশ দিন ধরে চলেছিল হত্যা ও লুটপাট।
শহরের বাতাস মৃতদেহের দুর্গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে। রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলেন আট লক্ষ, কেউ বলেন আঠারো লক্ষ, আবার কেউ বলেন বিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। সঠিক সংখ্যা হয়তো আজও অজানা।
বায়তুল হিকমার অমূল্য পাণ্ডুলিপি, শত শত বছরের গবেষণা, বিরল গ্রন্থ—সব দজলা নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। ইতিহাসে বিখ্যাত সেই বর্ণনা আজও মানুষকে শিহরিত করে—বইয়ের কালি মিশে দজলার পানি কালো হয়ে গিয়েছিল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, বহু গ্রন্থ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সঞ্চিত মানবজ্ঞান মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
শেষ আব্বাসীয় খলিফা মুস্তাসিম বিল্লাহও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। তার সম্পদ লুট করা হয়, পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, এবং অবশেষে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে চলা আব্বাসীয় খেলাফতের অবসান ঘটে।
ওএফএফ
What's Your Reaction?