বাবার নীরব যুদ্ধ: প্রবাসে এসে মেলানো এক জীবনের হিসাব

এমকে হক, জার্মানি ছোটবেলায় আমরা ভাবতাম বাবারা বোধহয় এক একজন সুপারহিরো, যাদের কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো অপূর্ণতা নেই। কিন্তু প্রবাসের এই ব্যস্ত আর হিসাবের জীবনে এসে যখন আমরা নিজেরা দায়িত্বের মুখোমুখি হই, তখনই বুঝতে পারি- তারা সুপারহিরো ছিলেন না, তারা ছিলেন আমাদের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দেওয়া এক একজন ক্লান্ত মানুষ। ছোটবেলায় ঈদের সময় একটা ব্যাপার খেয়াল করতেন? বাবা নিজের জন্য কখনো নতুন জামা কিনতেন না। আমরা ভাবতাম, হয়তো বাবার নতুন জামার দরকার নেই। কিন্তু আজ বড় হওয়ার পর বুঝি… তারও দরকার ছিল। শুধু আমাদের আবদার আর চাহিদার সামনে নিজের ইচ্ছেগুলোকে তিনি চুপচাপ আড়াল করে রাখতেন। দেশে থাকতে মাসের শেষে বেতন হাতে পেলে আমরা খুব বেশি কিছু ভাবতাম না। বন্ধুদের আড্ডা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, নতুন ফোন বা নতুন জামা কেনা- মনে হতো এটাই বুঝি জীবন। কিন্তু প্রবাসে পা রাখার পর প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে যখন হিসাব করতে বসলাম, তখন বুঝলাম জীবন কতটা বাস্তব। আরও পড়ুন জার্মানিতে আসলে জীবন সত্যিই কি বদলে যায়? বাসা ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল, ইনস্যুরেন্স ও চিকিৎসাক্ষেত্রের খরচ, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল, যাতায়াত ও ট

বাবার নীরব যুদ্ধ: প্রবাসে এসে মেলানো এক জীবনের হিসাব

এমকে হক, জার্মানি

ছোটবেলায় আমরা ভাবতাম বাবারা বোধহয় এক একজন সুপারহিরো, যাদের কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো অপূর্ণতা নেই। কিন্তু প্রবাসের এই ব্যস্ত আর হিসাবের জীবনে এসে যখন আমরা নিজেরা দায়িত্বের মুখোমুখি হই, তখনই বুঝতে পারি- তারা সুপারহিরো ছিলেন না, তারা ছিলেন আমাদের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দেওয়া এক একজন ক্লান্ত মানুষ।

ছোটবেলায় ঈদের সময় একটা ব্যাপার খেয়াল করতেন? বাবা নিজের জন্য কখনো নতুন জামা কিনতেন না। আমরা ভাবতাম, হয়তো বাবার নতুন জামার দরকার নেই। কিন্তু আজ বড় হওয়ার পর বুঝি… তারও দরকার ছিল। শুধু আমাদের আবদার আর চাহিদার সামনে নিজের ইচ্ছেগুলোকে তিনি চুপচাপ আড়াল করে রাখতেন।

দেশে থাকতে মাসের শেষে বেতন হাতে পেলে আমরা খুব বেশি কিছু ভাবতাম না। বন্ধুদের আড্ডা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, নতুন ফোন বা নতুন জামা কেনা- মনে হতো এটাই বুঝি জীবন। কিন্তু প্রবাসে পা রাখার পর প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে যখন হিসাব করতে বসলাম, তখন বুঝলাম জীবন কতটা বাস্তব।

বাসা ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল, ইনস্যুরেন্স ও চিকিৎসাক্ষেত্রের খরচ, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল, যাতায়াত ও ট্রেনের টিকিট, মাসিক বাজারের খরচ, সবকিছু মিটিয়ে যখন হাতের দিকে তাকালাম, তখন বুঝলাম- টাকা উপার্জন করার চেয়েও কঠিন হলো সেটাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা।

সেদিন হঠাৎ বাবার কথা খুব মনে পড়ল। ছোটবেলায় কোনো খেলনা চাইলে বাবা কখনো বলতেন না, ‘আমার কাছে টাকা নেই।’ তিনি বলতেন, ‘আগামী মাসে কিনে দেব।’ তখন মনে মনে খুব রাগ হতো।

আজ প্রবাসে এসে হিসাব মেলাতে গিয়ে বুঝি- হয়তো সেই মাসে বাবা নিজের জন্য একজোড়া নতুন জুতো কেনার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু আমার জেদের কাছে হেরে গিয়ে নিজের জুতো কেনাটা বাতিল করে আমার খেলনাটাই আগে কিনে দিয়েছিলেন।

বাবারা আসলে খুব কম কথা বলেন। তারা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন না, কিন্তু পুরো পরিবারের দায়িত্বের বিশাল পাহাড়টা নীরবে কাঁধে বয়ে বেড়ান। আমরা যখন রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম, বাবা তখন হিসাব করতেন- কোন বিলটা আগে দেবেন, আর নিজের কোন স্বপ্নটা আরেকটু পিছিয়ে রাখবেন।

আজ আমরা নিজেরা দায়িত্ব বুঝি। নিজের সংসার, নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিকল্পনা সাজাই। এখন মনে হয়, আমাদের বাবা এত বছর ধরে যে সংসার টেনেছেন, সেটা কোনো সাধারণ কাজ ছিল না। সেটা ছিল এক নীরব যুদ্ধ।

আজ হয়তো বাবা ফোনে ওপাশ থেকে শুধু বলেন- ‘ভালো আছিস তো?’ এই মাত্র তিনটি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকে হাজারটা না-বলা কথা। ‘ঠিকমতো খাচ্ছিস তো?ৎ’ ‘অতিরিক্ত খাটুনি দিস না নিজের শরীরে।’ ‘অসুস্থ হোস না, নিজের খেয়াল রাখিস।’

প্রবাসে থাকার সবচেয়ে বড় কষ্ট এটাই- আপনি যখন অবশেষে জীবনে সফল হবেন, তখন সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে করবে সেই মানুষটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে, যিনি আপনার জন্য নিজের পুরো জীবনটা উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু যোজন যোজন দূরত্বের সীমানা সবসময় সেটা হতে দেয় না।

যদি আপনার বাবা এখনো বেঁচে থাকেন, তবে আজ কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই তার কাছে একটা ফোন করুন। শুধু জিজ্ঞেস করুন। ‘বাবা, কেমন আছো?’

বিশ্বাস করুন, আপনার মুখ থেকে শোনা এই চারটে শব্দ হয়তো তার পুরো দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর যাদের বাবা আজ আর এই পৃথিবীতে নেই, তারা দূর পরবাস থেকেই বাবার জন্য একটিবার হাত তুলে মন থেকে দোয়া করুন।

কারণ, বাবারা কখনো সুপারহিরো ছিলেন না। তারা ছিলেন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, এক একজন ক্লান্ত মানুষ-যারা আমাদের সামনে কখনো নিজেদের ক্লান্তি প্রকাশ করেননি।

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow