বাম্পার ফলনে কদর বেড়েছে মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি লিচুর

পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন লিচুর মায়াবী লাল আভা। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বাজারগুলো পাহাড়ে উৎপাদিত রসালো ও মিষ্টি লিচুতে সয়লাব। প্রতিদিন ভোর থেকেই মাটিরাঙ্গা সদর বাজারে নামছে নানা জাতের লিচুর ঢল। তবে মৌসুমের স্থায়িত্ব কম হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ফল পেকে বাজারজাত ও শেষ হয়ে যায়। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় প্রায় ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছিল। সে বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ কিছুটা পুনর্বিন্যাস হয়ে প্রায় ৫২৫ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। এ বছর সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সহজেই এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। মাটিরাঙ্গা বাজারের সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা চাষিরা ঝুড়ি ও আঁটিতে করে সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে লিচুর পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ক্রেতাদের ভিড় আর বিক্রেতাদের হাঁকডাকে পুরো বাজারজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকার পাশাপাশ

বাম্পার ফলনে কদর বেড়েছে মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি লিচুর

পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন লিচুর মায়াবী লাল আভা। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বাজারগুলো পাহাড়ে উৎপাদিত রসালো ও মিষ্টি লিচুতে সয়লাব। প্রতিদিন ভোর থেকেই মাটিরাঙ্গা সদর বাজারে নামছে নানা জাতের লিচুর ঢল। তবে মৌসুমের স্থায়িত্ব কম হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ফল পেকে বাজারজাত ও শেষ হয়ে যায়।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় প্রায় ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছিল। সে বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ কিছুটা পুনর্বিন্যাস হয়ে প্রায় ৫২৫ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। এ বছর সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সহজেই এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।

মাটিরাঙ্গা বাজারের সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা চাষিরা ঝুড়ি ও আঁটিতে করে সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে লিচুর পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ক্রেতাদের ভিড় আর বিক্রেতাদের হাঁকডাকে পুরো বাজারজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য।

মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকার পাশাপাশি উপজেলার ১০ নম্বর এলাকা, বাইল্যাছড়ি, খেদাছড়া, গোমতী, বড়নাল, তবলছড়ি ও তাইন্দং এলাকাতেও ব্যাপকভাবে লিচুর চাষ হয়। পাহাড়ি আবহাওয়া ও উর্বর মাটির কারণে এসব এলাকার লিচু স্বাদ ও গুণে পেয়েছে আলাদা পরিচিতি।

বাজারে বিভিন্ন জাতের লিচুর দাম ও চাহিদায় দেখা গেছে বড় ধরনের পার্থক্য। আকারে ছোট ও চাহিদা কম হওয়ায় প্রতি ১০০ দেশি লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। চায়না-২ জাতের লিচু মানভেদে বিক্রি হচ্ছে প্রতি ১০০টি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। আর ছোট বীজ ও বেশি শাঁসের কারণে ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে চায়না-৩। ফলে এ জাতের লিচুর দাম ও চাহিদা; দুটোই বেশি।

বাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল স্বর্ণকার টিলা এলাকার এক বিক্রেতার আনা ‘কাঁঠালিয়া’ জাতের লিচু। আকারে বড়, আকর্ষণীয় রঙ ও সুস্বাদের কারণে প্রতি ১০০টি লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়।

স্থানীয় বাগান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাছ থেকে লিচু সংগ্রহ করা বেশ জটিল ও সংবেদনশীল কাজ। লিচুর বোঁটা অত্যন্ত নরম হওয়ায় সতর্কতার সঙ্গে তা পাড়তে হয়। ফলে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা যেমন বেশি, তেমনি শ্রমিক ব্যয়ও বেড়েছে।

এদিকে ফলন ভালো হলেও বাগান মালিকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বানর ও বাদুড়ের উপদ্রব। বন্যপ্রাণীর হাত থেকে ফসল রক্ষায় অনেক মালিক লিচু পুরোপুরি পরিপক্ব হওয়ার আগেই বাগান বিক্রি করে দিচ্ছেন। এই সুযোগে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা অগ্রিম বাগান কিনে নিজস্ব পাহারাদার বসিয়ে ফসল রক্ষা করছেন।

মাটিরাঙ্গা সদরের লিচু চাষি ও বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এবার লিচুর ফলন খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু গাছে লিচু পাকতে শুরু করলেই ঝাঁকে ঝাঁকে বানর আর বাদুড় হানা দেয়। দিনে বানর আর রাতে বাদুড় পাহারা দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত। তাই বাধ্য হয়ে একটু কাঁচা থাকতেই পাইকারদের কাছে বাগান বিক্রি করে দিয়েছি। তবে বাজারে এখন ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে লিচু বিক্রি করতে আসা ক্ষুদ্র চাষি জামাল হোসেন বলেন, পাহাড় থেকে লিচু অক্ষত অবস্থায় বাজারে আনা অনেক কষ্টের। বোঁটা ছিঁড়ে গেলে লিচু কেউ কিনতে চায় না। তার ওপর এবার শ্রমিক খরচও অনেক বেশি। একশ দেশি লিচু ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি করলেও খুব বেশি লাভ থাকে না। তবে চায়না জাতের লিচুতে ভালো আয় হচ্ছে।

বাজার করতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল হক বলেন, বছরে একবারই লিচুর মৌসুম আসে। তাই পরিবার ও আত্মীয়দের জন্য কিনতে এসেছি। বাজারে প্রচুর লিচু আসায় দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে। তবে চায়না-৩ লিচুর স্বাদ ভালো হলেও দাম একটু বেশি।

ঢাকা থেকে আসা ফল ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি লিচুর চাহিদা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক। আমরা আগেই বাগান কিনে রেখেছিলাম। এখন হাটের দিনে ট্রাকে করে লিচু পাঠাচ্ছি। বোঁটা নরম হওয়ায় পরিবহনের সময় কিছু লিচু নষ্ট হয়। তারপরও আশা করছি, এবার ব্যবসা ভালো হবে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, এ বছর মাটিরাঙ্গায় পাহাড়ি লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাই কম থাকা এবং কৃষকদের নিয়মিত পরিচর্যার কারণে উৎপাদন অনেক ভালো হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদিত হবে বলে আমাদের ধারণা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এ অঞ্চলের সুস্বাদু পাহাড়ি লিচু সরবরাহ করা যাচ্ছে। এতে চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow