বিচারহীনতা-অস্থিরতায় সমাজে বাড়ছে ‘প্যান্ডেমিক হিংস্রতা’

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার: আসক ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে, ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা ৩ চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৫১৯ শিশু নির্যাতনের শিকার: এইচআরএসএস হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার শেষ হতে লেগে যাচ্ছে ২৫-৩০ বছর বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করছে প্রতিশোধ ও ক্ষমতা প্রদর্শন সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে ঢাকার পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার নৃশংস ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশজুড়ে প্রতিনিয়ত শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষ নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের শিকার হচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন একটি ‘প্যান্ডেমিক পর্যায়ের হিংস্রতা’ হিসেবে। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল রামিসার। হঠাৎ তাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে শিশুটির একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তার মা। ঘাতক সোহেল রানা ও রামিসার পরিবার পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতেন। দীর্ঘক্ষণ নক করার পরও ভেতর থেকে দরজা না খো

বিচারহীনতা-অস্থিরতায় সমাজে বাড়ছে ‘প্যান্ডেমিক হিংস্রতা’
  • ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার: আসক
  • ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে, ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা ৩
  • চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৫১৯ শিশু নির্যাতনের শিকার: এইচআরএসএস
  • হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার শেষ হতে লেগে যাচ্ছে ২৫-৩০ বছর
  • বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করছে
  • প্রতিশোধ ও ক্ষমতা প্রদর্শন সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে

ঢাকার পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার নৃশংস ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশজুড়ে প্রতিনিয়ত শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষ নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের শিকার হচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন একটি ‘প্যান্ডেমিক পর্যায়ের হিংস্রতা’ হিসেবে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল রামিসার। হঠাৎ তাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে শিশুটির একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তার মা। ঘাতক সোহেল রানা ও রামিসার পরিবার পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতেন। দীর্ঘক্ষণ নক করার পরও ভেতর থেকে দরজা না খোলায় সন্দেহ তৈরি হয় এবং পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে শয়নকক্ষের মেঝে থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং টয়লেটের বালতি থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করে।

কেবল পল্লবীর এই ঘটনাই নয়, দেশজুড়ে প্রতিনিয়ত তিন-চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে নারী ও সাধারণ মানুষ নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের শিকার হচ্ছেন। 

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেওয়া পরিসংখ্যান দেশের বর্তমান পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। এছাড়া, জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় ১১৫টি শিশু খুন হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৮১ জন, গণপিটুনিতে ১৫৩ জন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। - অধিকার

অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ৪৮৩ জন। শুধু চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ৫১৯ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছে।

আরও পড়ুন
রামিসার বড় বোনের দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী 
বড় বোনের পিছে পিছে বের হওয়াই কাল হলো রামিসার 
ছোট্ট রামিসার জন্য কাঁদছে পল্লবী, কুলখানিতে অংশ নিতে গ্রামে পরিবার 

পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৮১ জন, গণপিটুনিতে ১৫৩ জন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

হিংস্রতার নেপথ্যে

দেশের এই সামগ্রিক সহিংসতা ও মানুষের নিষ্ঠুর হয়ে ওঠার পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহানা পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে প্রতিশোধ আর ক্ষমতা প্রকাশ যেন সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, ফলে মানুষ খুবই তুচ্ছ কারণেও অন্যকে হত্যা করছে। সিনেমা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বাস্তব রাজনীতিতে অপরাধীদের অনেক সময় গ্লোরিফাই বা নায়ক বানিয়ে বরণ করা হয়, যা অন্যদের মধ্যে ‘ক্ষমতার নেশা’ তৈরি করে। অনেকে আবার নিজের হীনমন্যতা ঢাকতে অন্যকে নির্যাতন ও মরদেহ বিকৃত করে এক ধরনের বিকৃত মানসিক তৃপ্তি পায়।

জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাওয়ায় সহনশীলতার পরিবর্তে ‘আমিত্বের লড়াই’ চলছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। - ডা. শাহানা পারভীন

এই সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, বছরের পর বছর ধরে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক অস্থিরতা এর অন্যতম বড় কারণ।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন সেক্টরে বড় ধরনের বেকারত্ব এবং রাষ্ট্রে নানাবিধ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাওয়ায় মানুষের মধ্যে সহনশীলতার পরিবর্তে ‘আমিত্বের লড়াই’ চলছে। এছাড়া আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সামাজিক মর্যাদার বিভেদের মূলে থাকা অর্থ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, যার ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অস্থিরতা কমছে না।

আরও পড়ুন
আমার শতভাগ বিশ্বাস মেয়ে হত্যার বিচার পাবো: রামিসার বাবা 
রামিসা হত্যা মামলায় বিশেষ পিপি নিয়োগ 
আসামি সোহেলের কক্ষের সামনে পড়েছিল রামিসার জুতা, ভেতরে রক্তাক্ত দেহ 

সহিংসতার এই ভয়াবহ রূপ সমাজে দিন দিন স্বাভাবিক বা ‘নরমালাইজ’ হয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি লিড মনিরা রহমান।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, যখন সমাজে অপরাধের বিচার হয় না এবং সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি হয় না, মানুষ ধীরে ধীরে এটিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়। ২০২৪ সালের সহিংসতার ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে যে আমাদের সামাজিক প্রতিরোধ ও নৈতিক প্রতিবাদ খুব দুর্বল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই নীরবতাই অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গত ১৫ বছর ধরে এদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলেছে, যেখানে টাকা ও পেশীশক্তি থাকলে যা ইচ্ছা তাই করা যায়। ফলে সবাই তাৎক্ষণিক জিততে চায় এবং পেশিশক্তি প্রদর্শন করতে চায়। - মনিরা রহমান

একই সুর শোনা যায় বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এস এম ইয়াসিন আরাফাতের কণ্ঠেও। তিনি জাগো নিউজকে জানান, জুলাই-আগস্টে যে তীব্র ভায়োলেন্স বা সহিংসতা মানুষ দেখেছে, সেই অভিজ্ঞতার ফলে মন থেকে ভয়ের মাত্রা কমে গেছে।

তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছর ধরে এ দেশে একটা লম্বা সময় ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলেছে, যেখানে টাকা ও পেশীশক্তি থাকলে যা ইচ্ছা তাই করা যায়। ফলে সবাই তাৎক্ষণিক জিততে চায় এবং পেশিশক্তি প্রদর্শন করতে চায়।

jagonews24

রুশ মনোবিজ্ঞানী উরি ব্রোনফেনব্রেনারের ‘ইকোলজিক্যাল সিস্টেম থিওরি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক সিস্টেমের সব স্তর থেকে নীতি-নৈতিকতা ফিরিয়ে না আনলে এই উগ্রতা থামানো কঠিন।

আরও পড়ুন
রামিসা হত্যা মামলা নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর প্রস্তুতি 
রামিসাকে ধর্ষণের ডিএনএ রিপোর্ট হস্তান্তর করেছে সিআইডি 
ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় শিশু রামিসাকে, মরদেহ লুকাতেই মাথা বিচ্ছিন্ন 

বিশেষজ্ঞদের এই দীর্ঘ বিশ্লেষণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বিচারের ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করেছেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম।

তিনি মনে করেন, একটি মামলায় বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত ও রাষ্ট্রপতির বিবেচনা পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষ হতে ২৫ থেকে ৩০ বছর লেগে যাচ্ছে। ফলে শাস্তির ফল সমাজ সময়মতো দেখতে পাচ্ছে না এবং অপরাধীদের মনে শাস্তির কোনো ভয় থাকছে না। আলোচিত ফেনী মাদরাসা শিক্ষার্থী হত্যা মামলার দ্রুত রায় হলেও বছরের পর বছর তা কার্যকর না হওয়ায় সমাজে কোনো কঠোর বার্তা পৌঁছায়নি।

সমাধানে প্রয়োজন সামাজিক ও আইনি পদক্ষেপ

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও আইনি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন। সাবেক বিচারক ফউজুল আজিম মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিচারিক আদালত থেকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।

ড. তৌহিদুল হক এবং মনিরা রহমান যৌথভাবে পরামর্শ দেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহমর্মিতা, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে অর্থ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক দূরত্ব ও ক্ষোভ প্রশমন করা, তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহিংসতা উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এসইউজে/এমআরএম/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow