বিতর্কের বেড়াজাল থেকে এনসিপি বের হতে পারছে না কেন
বিএনপির হাইব্রিডদের চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ—এমন মন্তব্য করে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকালে নোয়াখালীতে জুলাইয়ের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পদযাত্রায় তিনি এই আহ্বান জানান। হাসনাত বলেন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতির জন্য এনসিপির দরজা খোলা। হাসনাত যেদিন এই মন্তব্য করলেন, তার দুদিন আগেই গণমাধ্যমের শিরোনাম: দিনাজপুরে অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় যুবশক্তির পাঁচজন কারাগারে। খবরে বলা হয়, দিনাজপুরে এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অঙ্গসংগঠন যুবশক্তির কেন্দ্রীয় নেতা আরিফ মুনসহ পাঁচজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এনসিপির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। কারো কারো ব্যাপারে দুদকও তদন্ত করেছে। অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরে শোকজ করা হয়েছে। কিছুদিন পরে আবার সেই শোকজ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সুতরাং এনসিপি নিজেই কতটা পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করছে—সেই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়। তার চেয়ে বড় প্র
বিএনপির হাইব্রিডদের চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ—এমন মন্তব্য করে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকালে নোয়াখালীতে জুলাইয়ের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পদযাত্রায় তিনি এই আহ্বান জানান। হাসনাত বলেন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতির জন্য এনসিপির দরজা খোলা।
হাসনাত যেদিন এই মন্তব্য করলেন, তার দুদিন আগেই গণমাধ্যমের শিরোনাম: দিনাজপুরে অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় যুবশক্তির পাঁচজন কারাগারে। খবরে বলা হয়, দিনাজপুরে এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অঙ্গসংগঠন যুবশক্তির কেন্দ্রীয় নেতা আরিফ মুনসহ পাঁচজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এনসিপির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। কারো কারো ব্যাপারে দুদকও তদন্ত করেছে। অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরে শোকজ করা হয়েছে। কিছুদিন পরে আবার সেই শোকজ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সুতরাং এনসিপি নিজেই কতটা পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করছে—সেই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়।
তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, অভ্যুত্থানের পরে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, নতুন বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন ব্যবস্থা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মেধাভিত্তিক যে সমাজের কথা তারা বলছিলেন; যে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার নিয়ে তারা যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং দলটির ব্যাপারে সাধারণ মানুষেরও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেই দলটি কেন খারাপ খবর নিয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে?
বস্তুত চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণের একটি অংশের নেতৃত্বে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা দল এনসিপি শুরু থেকেই সংবাদের শিরোনাম। সম্ভবত দেশের ইতিহাসে আর কোনো দল আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের আগে থেকেই এতটা আলোচনায় আসেনি। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছরে এনসিপি এবং এই দলটির নেতাকর্মীরা যেসব কারণে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন, তার একটা বড় অংশই খারাপ খবর। প্রশ্ন হলো, সব খবরই কি মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত?
সম্প্রতি উগ্রবাদী সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দলের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অবশ্য এরপরই দল থেকে তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে এনসিপি। প্রশ্ন হলো, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তারের যে অভিযোগ উঠেছে এবং যার অনেক লক্ষণও স্পষ্ট—সেই কার্যক্রমে জড়িত সন্দেহে এনসিপির একজনের নাম প্রকাশ্যে এলেও এরকম তৎপরতার সঙ্গে দলটির আরও কত লোক জড়িত, তা কি এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা সরকার জানে?
বিএনপি-আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের যে রাজনীতি ও কর্মসূচির সঙ্গে দেশের মানুষ পরিচিত, তার বাইরে গিয়ে একটি মধ্যপন্থি, বাংলাদেশপন্থি তথা ভারত-পাকিস্তান-চীন-মার্কিন বলয়ের বাইরে গিয়ে জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার যে প্রত্যাশা এনসিপির কাছে মানুষের ছিল বা তৈরি হয়েছিল, এই সময়ের মধ্যে এনসিপি তার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে? তার চেয়ে বড় কথা, এনসিপি শুরু থেকে মধ্যপন্থার কথা বললেও ধীরে ধীরে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, তাদের পক্ষপাত আসলে ডানপন্থার দিকেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি জামায়াত ও পাকিস্তানি বয়ানের সাথে এনসিপির বয়ানের খুব বেশি পার্থক্য নেই বলেও অনেকে মনে করেন।
এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেই দলের শীর্ষ নেতারা স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলের স্লোগান ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ হয় কি না—সেই প্রশ্নটি শুরু থেকেই ছিল। এরপর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে এবং এরপরে শাহবাগ ও হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে এনসিপির নেতৃত্বে যে জমায়েত হয়েছিল, সেখানে জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। ওই গণজমায়েতে ‘গোলাম আযমের বাংলায়, আওয়ামী লীগের ঠাঁই নাই’ এমন স্লোগানও দেয়া হয়েছে। একদল তরুণ সেখানে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে গেলে গণজমায়েতে অংশ নেওয়া একদল লোক তাতে বাধা দেয়। এরপর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সেখান স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, ‘বিজয়ের এই দিনে সাঈদী তোমায় মনে পড়ে’ ইত্যাদি। এরকম নানা ঘটনায় জনমনে এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, এনসিপি আসলে কাদের প্রতিনিধিত্ব করছে বা তাদরেকে সঙ্গে নিয়ে তারা রাজনীতি করতে চায়?
বলা হয়, বাংলাদেশে বামপন্থি রাজনীতির সম্ভাবনা যেহেতু কম এবং দেশের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও ধর্মভীরু, ফলে মূলধারার সব দলই এই মুসলিম সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতে চায়। যে কারণে বামপন্থিদেরকেও অনেক সময় বলতে শোনা যায়, ‘বামপন্থি মানেই ইসলামের বিরুদ্ধে নয়।’ কেননা তারাও জানে এই দেশের ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম বরাবরই একটা বিরাট ফ্যাক্টর। যে কারণে ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয় তখন তার শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্মের বিধান না থাকলেও একজন সামরিক শাসক সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত করেনে, তারপর আরেকজন সামরিক শাসক ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বানিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছেন। এই দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল জনতুষ্টি তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন আদায়। শুধু তাই নয়, ২০১১ সালে যখন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাহাত্তরের মূল সংবিধানের অনেক বিধান ফিরিয়ে আনা হয়, তখন তৎকালীন সরকার বা সংসদ সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের সাহস করেনি। কারণ তারা ভয় পেয়েছে এই কারণে যে, সাধারণ মানুষ এর বিরোধিতা না করলেও বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে এবং তাতে দেশে দারুণ অস্থিরতা তৈরি হবে।
সেই সেন্টিমেন্ট তথা ভোটের রাজনীতি মাথায় রেখেই জাতীয় নাগরিক পার্টি বলেছিল যে, তারা মধ্যপন্থি দল হবে। কিন্তু গত দেড় বছরে নানা কর্মকাণ্ডে এটা মনে হয়েছে যে, তাদের ঝোঁকটা আসলে ডানপন্থার দিকে। যেমন দলটির শীর্ষ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বিভিন্ন মাহফিলে গিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এনসিপি সম্ভবত তারা দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসাকেই তাদের প্রধান ভোট ব্যাংক মনে করে, এমনটিও শোনা যায়। যদিও এই ভোট ব্যাংকের জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামিক দলগুলোরও হিস্যা আছে।
তবে রাজনীতিতে মধ্যপন্থি হওয়াটা খুব জরুরি কি না, এই প্রশ্নও পুরোনো। কেননা অনেক দেশেই কট্টরপন্থি দলও বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত দলও রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। একইভাবে বামপন্থি দলও সরকার গঠন করেছে বা করছে। সেক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক পার্টি যদি মনে করে যে তারা তাদের কর্মসূচিতে ধর্মকে প্রাধান্য দেবে এবং এই ধরনের মানসিকতার ভোটাররাই তাদের টার্গেট, সেক্ষেত্রে নিজেদেরকে মধ্যপন্থি বলে ক্যামোফ্লাজ তৈরির চেষ্টা না করাই ভালো। তারা যেহেতু তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তারা মনে করে যে তরুণদের বিরাট অংশের সমর্থন তাদের সাথে আছে, সেক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে তাদের বক্তব্য এবং কর্মসূচি দৃশ্যমান করে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সত্যিই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি নতুনে ধরনের এবং সত্যিকারের বাংলাদেশপন্থি এমন একটি রাজনীতির উদ্বোধন করতে চায়, যেখানে চাঁদাবাজি-অনিয়ম-দুর্নীতি এবং সর্বোপরি ধর্মীয় উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই।
আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরোধিতার নামে তারা যদি স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করে এবং মুক্তিযুদ্ধের এমন সব বয়ান সামনে হাজির করে যা মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত সত্যকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায় বা যে বয়ানকে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির ভাষ্য বলেই মনে করে—তাহলে তাদের ব্যাপারে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে থাকবে। তখন অনেকের মনে হবে যে, তারা মধ্যপন্থি রাজনীতির নামে প্রকারান্তরে ডানপন্থার দিকেই ঝুঁকেছে এবং তারা আসলে ‘জামায়াতের বি টিম’। কেননা এনসিপি গঠনের পর থেকেই এটা বলা হচ্ছে যে, এই দলের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশই শিবিরের সাবেক কর্মী। কেউ কেউ এমনও বলার চেষ্টা করেন যে, ভবিষ্যতে কখনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার সহযোগী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞার আলোকে জামায়াত যদি আবারও নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তাদের আদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য যাতে একটা বিকল্প প্ল্যাটফর্ম থাকে, সেজন্য এনসিপি গঠন করা হয়েছে। এই ধারণাটি যে সঠিক নয়, সেটি এনসিপিকেই প্রমাণ করতে হবে কাজ দিয়ে। কর্মসূচি দিয়ে।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচনে না গিয়ে জামায়াতের সাথে এনসিপির জোট গঠন কি নিতান্তই ভোট পাওয়া তথা নির্বাচনি কৌশল নাকি দুই দলের আদর্শিক মিলের কারণেই এই জোট—সেটিও ভবিষ্যতই বলে দেবে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?