বিদ্যালয়ের পাশে ময়লার স্তূপ শিশুস্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি

শরিফুল আলম তপন প্রতিদিন সকালে হাজারো শিশু বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যায় নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ের সামনে তাদের প্রথম অভ্যর্থনা ফুলের সুবাস দিয়ে নয় বরং পচা আবর্জনার দুর্গন্ধ দিয়ে হয়। স্কুলগেটের সামনেই উপচেপড়া ডাস্টবিন বা ময়লার গাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক, মাছি-মশার উপদ্রব–এসব যেন আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার নির্মম প্রতিচ্ছবি। একটি সভ্য সমাজে এর চেয়ে বড় বৈপরীত্য আর কী হতে পারে? যে জায়গাটি শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তি হওয়ার কথা, সেই স্থানই যদি রোগ ও দূষণের উৎসে পরিণত হয়, তবে তা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়; এটি শিশুদের মৌলিক অধিকারেরও লঙ্ঘন। বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের স্থান নয়; এটি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ বিদ্যালয়ের আশপাশে দীর্ঘসময় ধরে জমে থাকা বর্জ্য থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও ক্ষতিকর গ্যাস শিশুদের ও তাদের সাথে আসা অভিভাবকদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য মশা, মাছি, ইঁদুর ও তেলাপোকার নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়, যা ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা সংক্

বিদ্যালয়ের পাশে ময়লার স্তূপ শিশুস্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি

শরিফুল আলম তপন

প্রতিদিন সকালে হাজারো শিশু বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যায় নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ের সামনে তাদের প্রথম অভ্যর্থনা ফুলের সুবাস দিয়ে নয় বরং পচা আবর্জনার দুর্গন্ধ দিয়ে হয়। স্কুলগেটের সামনেই উপচেপড়া ডাস্টবিন বা ময়লার গাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক, মাছি-মশার উপদ্রব–এসব যেন আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার নির্মম প্রতিচ্ছবি। একটি সভ্য সমাজে এর চেয়ে বড় বৈপরীত্য আর কী হতে পারে? যে জায়গাটি শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তি হওয়ার কথা, সেই স্থানই যদি রোগ ও দূষণের উৎসে পরিণত হয়, তবে তা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়; এটি শিশুদের মৌলিক অধিকারেরও লঙ্ঘন।

বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের স্থান নয়; এটি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ বিদ্যালয়ের আশপাশে দীর্ঘসময় ধরে জমে থাকা বর্জ্য থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও ক্ষতিকর গ্যাস শিশুদের ও তাদের সাথে আসা অভিভাবকদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য মশা, মাছি, ইঁদুর ও তেলাপোকার নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়, যা ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা সংক্রামক রোগ ছড়াতে সহায়তা করে। শুধু স্বাস্থ্যগত ক্ষতিই নয়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ শিশুদের মনোযোগ, শেখার আগ্রহ এবং মানসিক স্বস্তিকেও ব্যাহত করে। একটি শিশুর শেখার পরিবেশ কখনোই দুর্গন্ধ ও আবর্জনার পাশে হতে পারে না।

এই সংকটের জন্য শুধু সিটি করপোরেশনকে দায়ী করলেই দায় শেষ হয় না। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত ডাম্পিং ব্যবস্থার অভাব, সময়মতো বর্জ্য অপসারণ না করা এবং নাগরিকদের অসচেতন আচরণ–সব মিলিয়েই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে এখনো সব ধরনের বর্জ্য একই জায়গায় ফেলা হয়। অথচ প্রতিবেশী অনেক দেশেই কয়েক বছর ধরেই বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী আলাদা বিনে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা চালু আছে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেমন আরও কার্যকর হয়, তেমনি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সহজে রিসাইকেল করা যায়। পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনও সম্ভব হয়। অর্থাৎ সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু পরিচ্ছন্ন পরিবেশই নিশ্চিত করে না বরং অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।

বাস্তবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপই হলো উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণ। প্রতিটি স্কুল, বাসাবাড়ি, অফিস ও বাজারে অন্তত তিন ধরনের বিন থাকা উচিত–একটিতে জৈব বর্জ্য, একটিতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য (যেমন- প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ ও ধাতু) এবং অন্যটিতে অবশিষ্ট বর্জ্য। এতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সহজেই পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি করা যাবে এবং ল্যান্ডফিলে বর্জ্যের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। বিশ্বের অনেক শহর বহু আগেই এই পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক করেছে; আমাদেরও এখন আর দেরি করার সুযোগ নেই।

সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করার ফলে এখনো নগরের অনেক স্থানেই ময়লা ফেলা হয় খালে-বিলে এবং ড্রেনে। এর ফলে যে পরিবেশের কী মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। একটি ছোট প্লাস্টিকের বোতামেও আমাদের অসচেতনতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটা উদাহরণ দিই। শার্ট থেকে খুলে পড়া একটি বোতাম যদি ড্রেনে ফেলা হয়, তাহলে সেটি একসময় সেখান থেকে নদী হয়ে সাগরে পৌঁছে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি ভেঙে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। সামুদ্রিক প্রাণীরা এগুলো খাদ্য ভেবে খেয়ে ফেলে, আর সেই প্রাণীই পরে আমাদের খাদ্যতালিকায় ফিরে আসে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, লিভার, এমনকি মাতৃদুগ্ধেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আজ আমরা যে প্লাস্টিক অবহেলায় ফেলে দিচ্ছি, কাল সেটিই অন্য রূপে আমাদের শরীরে ফিরে আসছে। তাই একটি ছোট প্লাস্টিকের টুকরোও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে আসতে পারে। আর এজন্যই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এত বেশি জরুরি।

ফিরে আসি আবারো শিশুদের স্কুলের কথায়। আসলে আমরা সময়ের থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। তাই আর ফিরে তাকাবার উপায় নেই। এখন সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। বিদ্যালয়ের অন্তত ১০০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রতিটি স্কুলের আশপাশে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন স্থাপন এবং প্রতিদিন খুব ভোরে স্কুল ও নগরের কর্মব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় এলাকাকে ‘চাইল্ড-সেইফ এনভায়রনমেন্ট জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা যেতে পারে। স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি স্কুলের পাঠ্যক্রম ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দূষণ বিষয়ে ব্যবহারিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না বরং অভ্যাস গড়ে উঠতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যদি প্রতিদিন ময়লার স্তূপের পাশ দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেতে বাধ্য হয়, তবে আমাদের উন্নয়নের দাবি কতটা বাস্তব? একটি পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি একটি সুস্থ, সচেতন ও দায়িত্বশীল জাতি গঠনের ভিত্তি। তাই শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে আর কোনোভাবেই অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাছে জিম্মি রাখা যাবে না। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়, নিরাপদ শৈশব, সুস্থ জীবন ব্যবস্থা–এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: সচেতন অভিভাবক।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow