বিদ্যুৎ-পানি ‘খেয়ে’ শেষ করছে এআই, পৃথিবীর কী হবে?
সামিন ইয়াসার চ্যাটজিপিটি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কোনো চ্যাটবটে প্রশ্ন লিখে এন্টার চাপলেই চোখের পলকে উত্তর হাজির। প্রক্রিয়াটি এতটাই সহজ ও স্বয়ংক্রিয় যে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এর পেছনে কোনো খরচ নেই। তবে দৃশ্যমান এই সরলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতা। প্রতিটি উত্তরের খোঁজে হাজার মাইল দূরে কোনো এক ডাটা সেন্টারে অবিরাম গরম হয়ে চলেছে সারি সারি শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ)। আর সেই বিপুল তাপ সামলাতে খরচ হচ্ছে অঢেল বিদ্যুৎ ও পানি। ২০২৬ সালে এসে এই অতিব্যবহারই এআই শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাহিদার লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০২৬ সালে এসে দাঁড়াবে ৫৬৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে, যা পূর্ববর্তী বছরের (৪৪৭ টেরাওয়াট-আওয়ারে) তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে। এই আকাশচুম্বী চাহিদার মূল কারণ লুকিয়ে আছে এআইয়ের আধুনিক হার্ডওয়্যারে। এআই মডেল চ
সামিন ইয়াসার
চ্যাটজিপিটি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কোনো চ্যাটবটে প্রশ্ন লিখে এন্টার চাপলেই চোখের পলকে উত্তর হাজির। প্রক্রিয়াটি এতটাই সহজ ও স্বয়ংক্রিয় যে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এর পেছনে কোনো খরচ নেই।
তবে দৃশ্যমান এই সরলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতা। প্রতিটি উত্তরের খোঁজে হাজার মাইল দূরে কোনো এক ডাটা সেন্টারে অবিরাম গরম হয়ে চলেছে সারি সারি শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ)। আর সেই বিপুল তাপ সামলাতে খরচ হচ্ছে অঢেল বিদ্যুৎ ও পানি। ২০২৬ সালে এসে এই অতিব্যবহারই এআই শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাহিদার লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০২৬ সালে এসে দাঁড়াবে ৫৬৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে, যা পূর্ববর্তী বছরের (৪৪৭ টেরাওয়াট-আওয়ারে) তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে।
এই আকাশচুম্বী চাহিদার মূল কারণ লুকিয়ে আছে এআইয়ের আধুনিক হার্ডওয়্যারে। এআই মডেল চালানোর জন্য ব্যবহৃত একেকটি সার্ভার র্যাক সাধারণ সার্ভারের তুলনায় বহুগুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে।
উদাহরণস্বরূপ, এনভিডিয়ার ‘জিবি২০০’ চিপসমৃদ্ধ একটি একক র্যাক পরিচালনায় ১২০ থেকে ১৪০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়; যেখানে প্রথাগত একটি এন্টারপ্রাইজ র্যাকের জন্য মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎই যথেষ্ট। গার্টনারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টারগুলোর মোট বিদ্যুৎ খরচের ৩১ শতাংশই ব্যয় হবে শুধু এআই-অপ্টিমাইজড সার্ভারের পেছনে, যা এক বছর আগেও ছিল মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি।
পানির হিসাবও উদ্বেগজনক
বিদ্যুতের সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানির ব্যবহারও। জিপিইউ ঠান্ডা রাখার জন্য বেশিরভাগ বৃহৎ ডাটা সেন্টার এখনো ‘ইভাপোরেটিভ কুলিং’ বা বাষ্পীভবন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে পানি বাষ্পীভূত করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল জানিয়েছে, ২০২৩ সালে তাদের ডাটা সেন্টারগুলোতে পানি খরচের পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি গ্যালনেরও বেশি। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি খরচ হয়েছে এমন সব অঞ্চল থেকে, যা আগে থেকেই তীব্র পানিসংকটে ভুগছে।
একটি একক প্রশ্নের উত্তর তৈরিতে ঠিক কতটা পানি অপচয় হয়, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে। রিভারসাইডের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ১০০ শব্দের একটি উত্তর তৈরিতে প্রায় আধা লিটার পানির প্রয়োজন হতে পারে।
বিপরীতে ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের দাবি এই পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য, যা প্রায় কয়েক ফোঁটার সমান। তবে বিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, নেদারল্যান্ডস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মতো অঞ্চলগুলোতে পানির হিস্যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা এরই মধ্যে ডাটা সেন্টারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সংকট ও সম্ভাবনা
বৃহৎ এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণের গুরুভার এখনো বাংলাদেশের কাঁধে আসেনি; সেই কাজগুলো মূলত সম্পন্ন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে। তবে বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের সমীকরণটি বেশ পুরোনো।
গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট হলেও দৈনিক গড় উৎপাদন থাকছে মাত্র ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ২০২২ সালের অক্টোবরের দেশব্যাপী গ্রিড বিপর্যয়ের স্মৃতিও জনমনে এখনো অমলিন।
তবে দেশে নিজস্ব ডাটা সেন্টার শিল্পের বিকাশ ঘটছে, যদিও তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। ২০২৫ সালে দেশের মোট ইনস্টলড আইটি লোড ছিল মাত্র ২৩ দশমিক ৫৫ মেগাওয়াট, যা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন।
বিশেষ করে স্থানীয় ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’-এর কারণে সংবেদনশীল তথ্য দেশের ভেতরেই রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ায় দেশীয় কোলোকেশন ডাটা সেন্টারের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু দেশের গ্রিডের অস্থিরতা এবং ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে অপারেটরদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে এখনো অনেকটাই ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এখানে বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটের একটি চমৎকার এক সমান্তরাল রেখা দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যখন তাদের এআই-এর জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, বাংলাদেশও তখন তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর’ থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে।
আগামী আগস্টের মধ্যে রূপপুর থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের শুরুতে তা ধাপে ধাপে ১,২০০ মেগাওয়াটের পূর্ণ সক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাবে। তবে লক্ষ্য দ্বিমুখী একদিকে উন্নত বিশ্বে যেখানে চলছে এআই-এর ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা, অন্যদিকে বাংলাদেশে মূল লক্ষ্য দীর্ঘদিনের লোডশেডিংয়ের অবসান ঘটানো।
রূপান্তর নাকি স্থবিরতা?
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে স্পষ্ট দুটি মতধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদলের মতে, বিদ্যুৎ সংকট এখন এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধির পথে বাস্তব প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিপিইউ কেনার পর্যাপ্ত তহবিল থাকলেও গ্রিড লাইনের সংযোগ পেতেই অনেক সংস্থাকে দুই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের জন্য পরিকল্পিত ডাটা সেন্টার সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই হয় স্থগিত হয়েছে, নয়তো পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘ব্রিজওয়াটার’ সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, এআই খাতে পুঁজির এই বিপুল প্রবাহ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, প্রত্যাশিত চাহিদার ঘাটতি হলে পুরো খাত বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে।
বিপরীতমুখী অন্য দলটি অবশ্য একে একটি উদীয়মান ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পের স্বাভাবিক রূপান্তরকালীন সংকট হিসেবে দেখছেন। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও মেটা যৌথভাবে শুধু ২০২৬ সালেই এআই অবকাঠামো উন্নয়নে ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে, যার একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে।
যেমন-মাইক্রোসফট পেনসিলভানিয়ার ঐতিহাসিক ‘থ্রি মাইল আইল্যান্ড’ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরুজ্জীবিত করার চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে চিপ নির্মাতারা এমন সব উন্নত আর্কিটেকচার নিয়ে কাজ করছেন, যা সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও বহুগুণ বেশি টোকেন বা ডাটা প্রসেস করতে সক্ষম হবে।
অতএব, পরবর্তী সময়ে কোনো চ্যাটবটের প্রমট বক্সে প্রশ্ন লেখার আগে একবার ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। উত্তরটি হয়তো চোখের পলকে স্ক্রিনে ভেসে উঠছে, কিন্তু তার পেছনে যুক্ত থাকা বিদ্যুৎ লাইন আর পানির পাইপলাইনের স্থায়িত্বের সমীকরণটি মেলানো এখনো বিশ্ববাসীর জন্য এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।
কেএসকে
What's Your Reaction?

