বিরিশিরি জাদুঘর: আদিবাসী-লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা
পাহাড়, নদী আর লোকজ সংস্কৃতির মায়াবী এক জনপদ বিরিশিরি। সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জল আর সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শত বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য আর জীবনসংগ্রামের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিরিশিরি কালচারাল অ্যাকাডেমি জাদুঘর। এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়। বরং বাংলাদেশের আদিবাসী ও লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরিতে অবস্থিত এ জাদুঘর বহু বছর ধরে গারো, হাজং, কোচ, ডালু ও বানাই সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছেও এটি এখন অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। নিদর্শনের ভেতরে আদিবাসী জীবনের গল্প জাদুঘরে প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে আদিবাসীদের বাঁশ, কাঠ ও মাটির তৈরি নানা ব্যবহার্য সামগ্রী। এক পাশে সাজানো রয়েছে প্রাচীন কৃষিযন্ত্র, মাছ ধরার উপকরণ, শিকারি অস্ত্র ও রান্নার সামগ্রী; অন্য পাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, অলংকার ও বাদ্যযন্ত্র। প্রতিটি নিদর্শন যেন পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা আর শত বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস তুলে ধরে। আরও পড়ুনবরেন্দ্র জাদুঘরের ১৭
পাহাড়, নদী আর লোকজ সংস্কৃতির মায়াবী এক জনপদ বিরিশিরি। সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জল আর সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শত বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য আর জীবনসংগ্রামের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিরিশিরি কালচারাল অ্যাকাডেমি জাদুঘর। এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়। বরং বাংলাদেশের আদিবাসী ও লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরিতে অবস্থিত এ জাদুঘর বহু বছর ধরে গারো, হাজং, কোচ, ডালু ও বানাই সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছেও এটি এখন অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।
নিদর্শনের ভেতরে আদিবাসী জীবনের গল্প
জাদুঘরে প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে আদিবাসীদের বাঁশ, কাঠ ও মাটির তৈরি নানা ব্যবহার্য সামগ্রী। এক পাশে সাজানো রয়েছে প্রাচীন কৃষিযন্ত্র, মাছ ধরার উপকরণ, শিকারি অস্ত্র ও রান্নার সামগ্রী; অন্য পাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, অলংকার ও বাদ্যযন্ত্র। প্রতিটি নিদর্শন যেন পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা আর শত বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস তুলে ধরে।
আরও পড়ুন
বরেন্দ্র জাদুঘরের ১৭ হাজার নিদর্শনের ১৬ হাজারই গুদামবন্দি
বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
বয়ামে বাঘ-সিংহ, খাঁচায় নীল তিমি
জাদুঘরের দেয়ালে টাঙানো বিভিন্ন আলোকচিত্র দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় অতীতের স্মৃতিতে। কোথাও দেখা যায় গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, কোথাও পাহাড়ি উৎসবের আনন্দঘন মুহূর্ত। আবার কিছু ছবিতে উঠে এসেছে কৃষিকাজ, নদীকেন্দ্রিক জীবন ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের দৃশ্য। এসব ছবি শুধু ইতিহাস নয়; বরং একেকটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক দলিল।
‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে এ অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সচেতনতা সৃষ্টি এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য জাগ্রত করা। জাদুঘরটি আদিবাসী মানুষের বিচিত্র জীবনমানের নীরব সাক্ষী। একে আরও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে’—ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বিরিশিরি একসময় ছিল সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মিলনমেলায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা করা হয় বিরিশিরি কালচারাল অ্যাকাডেমি। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাদুঘর। বর্তমানে এটি স্থানীয় সংস্কৃতি গবেষণা ও সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
পূর্বধলা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শহীদুল্লাহ খান জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের ইতিহাস শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়। পাহাড় ও সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিও বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অংশ। বিরিশিরি জাদুঘর সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে।
প্রতিষ্ঠা ও যাদের শ্রমে সমৃদ্ধ এই অ্যাকাডেমি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিরিশিরির ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মূল্যবান ও আকর্ষণীয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে মেঘালয় কন্যা সোমেশ্বরী নদীর তীরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে এই একাডেমি। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যসচেতনতা সৃষ্টি এবং জাতিগত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা।
‘পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে জাদুঘরটির অনেক মূল্যবান নিদর্শন বর্তমানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে’— জাদুঘর পরিচালক কবি পরাগ রিছিল
এই একাডেমিকে সমৃদ্ধ করতে এবং গারো-হাজংদের সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে সবার প্রথম এগিয়ে আসেন বিরিশিরি এলাকার উচ্চশিক্ষিত নারী প্রয়াত বিভা সাংমা। তিনি পরিচালক পদে যোগদানের পর নিজের জীবনের শেষ সময়টুকুও বিলিয়ে দিয়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি রক্ষার কাজে।
আরও পড়ুন
ঢাকার জাদুঘরগুলো যেমন আছে, চলছে যেভাবে
ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব ঠিকানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর
৪২০ নিদর্শনে সুলতানি আমলের হাতছানি
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে বিশিষ্ট কবি রফিক আজাদ এ একাডেমিতে পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি আদিবাসী সংস্কৃতির পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া বাংলা গান, বাউল গান, পালাগান, বিচার গানসহ কবিগানের মতো উচ্চপর্যায়ের গান সংরক্ষণে কাজ করেন। এমনকি তিনি বেশ কিছু উপজাতীয় ‘রেঁ রেঁ’ গানের স্তবকও উদ্ধার করেন।
এরপর ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কবি ও গীতিকার সুজন হাজং পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর গারো, হাজং, কোচ, বানাই ও ডালু সম্প্রদায়ের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি উপজাতীয় শিল্পীদের গহনা, অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র, ব্যবহৃত অস্ত্র, বস্ত্র-পরিচ্ছদসহ কুটিরশিল্পের প্রচুর আসবাবপত্র সংগ্রহ করে আদিবাসী জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেন। সেই সঙ্গে গবেষণা ও সাংস্কৃতিক শাখাকে উন্নত করে বাংলা সংস্কৃতিতে নান্দনিকতা এনেছেন।
সংরক্ষণ সংকটে মূল্যবান নিদর্শন
অ্যাকাডেমিটির গবেষণা শাখাকে সমৃদ্ধ করতে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। যেখানে আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতির ওপর লিখিত বইসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রায় ৫ হাজার মূল্যবান পুস্তক সংগ্রহ করা হয়েছে। জ্ঞানপিপাসু ও গবেষকেরা প্রতিনিয়ত এই লাইব্রেরিতে এসে পড়াশোনা করছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।
এছাড়া অ্যাকাডেমির জাদুঘর, রেস্ট হাউস, অডিটোরিয়াম ও আদিবাসী শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলো নতুন করে সুসজ্জিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন করতে অ্যাকাডেমির আশপাশের খালি জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে রঙিন ফুলের বাগান। তবে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে সম্প্রতি এখানে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা বাড়লেও জাদুঘরটির প্রচার এখনো সীমিত।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, আধুনিক প্রদর্শনব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র ও ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা গেলে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
অ্যাকাডেমির বর্তমান পরিচালক কবি পরাগ রিছিল জাগো নিউজকে বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানে না। তাই আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, পোশাক, ভাষা ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে। তবে পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে অনেক মূল্যবান নিদর্শন বর্তমানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
আধুনিকায়নের তাগিদ ও সরকারি আশ্বাস
সম্প্রতি বিরিশিরি কালচারাল অ্যাকাডেমি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
পরিদর্শনকালে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে এই অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সচেতনতা সৃষ্টি এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য জাগ্রত করা। এই জাদুঘরটি আদিবাসী মানুষের বিচিত্র জীবনমানের নীরব সাক্ষী। একে আরও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সহজ-সরল জীবনের প্রতীক এই জাদুঘরটি। এর আরও আধুনিকায়ন ও সমৃদ্ধি প্রয়োজন।
কেএএইচ/কেএইচকে/জেআইএম
What's Your Reaction?