বিশ্বকাপে ফ্যান বিতর্কে সরব সোশ্যাল মিডিয়া

শাহারিয়া নয়ন ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়ে ওঠে নতুন বিতর্কে, ‌‘মৌসুমি ফ্যান বনাম আসল ফ্যান’। দলীয় সমর্থনের চিরন্তন দ্বন্দ্বের বাইরে এ অনলাইন লড়াই এখন চার বছর পরপর ফিরে আসা এক সাংস্কৃতিক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় পোস্ট, রিলস এবং মিমের বন্যা। কেউ প্রিয় দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের জার্সি পরে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেন। কেউ আবার ম্যাচের আগে সম্ভাব্য একাদশ, কৌশল কিংবা ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইনে ফুটবলই হয়ে ওঠে প্রধান আলোচনার বিষয়। এ সময়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ‘আসল ফ্যান’ ও ‘মৌসুমি ফ্যান’ বিতর্ক। আত্মস্বীকৃত আসল ফ্যানদের মতে, তারা সারাবছর ফুটবল অনুসরণ করেন। ক্লাব ফুটবল, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, ট্রান্সফার বাজার, কৌশলগত পরিবর্তন কিংবা বিভিন্ন লিগের খুঁটিনাটি সম্পর্কে তারা নিয়মিত খোঁজ রাখেন। তাদের কাছে ফুটবল কেবল বিনোদনের বিষয় নয়। এটি জ্ঞান, বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘদিনের আবেগের একটি ক্ষেত্র

বিশ্বকাপে ফ্যান বিতর্কে সরব সোশ্যাল মিডিয়া

শাহারিয়া নয়ন

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়ে ওঠে নতুন বিতর্কে, ‌‘মৌসুমি ফ্যান বনাম আসল ফ্যান’। দলীয় সমর্থনের চিরন্তন দ্বন্দ্বের বাইরে এ অনলাইন লড়াই এখন চার বছর পরপর ফিরে আসা এক সাংস্কৃতিক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় পোস্ট, রিলস এবং মিমের বন্যা।

কেউ প্রিয় দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের জার্সি পরে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেন। কেউ আবার ম্যাচের আগে সম্ভাব্য একাদশ, কৌশল কিংবা ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইনে ফুটবলই হয়ে ওঠে প্রধান আলোচনার বিষয়।

এ সময়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ‘আসল ফ্যান’ ও ‘মৌসুমি ফ্যান’ বিতর্ক। আত্মস্বীকৃত আসল ফ্যানদের মতে, তারা সারাবছর ফুটবল অনুসরণ করেন। ক্লাব ফুটবল, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, ট্রান্সফার বাজার, কৌশলগত পরিবর্তন কিংবা বিভিন্ন লিগের খুঁটিনাটি সম্পর্কে তারা নিয়মিত খোঁজ রাখেন। তাদের কাছে ফুটবল কেবল বিনোদনের বিষয় নয়। এটি জ্ঞান, বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘদিনের আবেগের একটি ক্ষেত্র।

অন্যদিকে বিশ্বকাপ এলেই হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠা মৌসুমি ফ্যানদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ দেখা যায়। অভিযোগ করা হয়, তারা বড় টুর্নামেন্ট ছাড়া সাধারণত ফুটবল নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখান না। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হলেই প্রিয় দল বেছে নিয়ে আবেগী সমর্থকে পরিণত হন এবং ম্যাচ প্রেডিকশন, তর্ক-বিতর্ক ও সমর্থনমূলক পোস্টে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তবে এ বিতর্কের পেছনে আছে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আসল ফ্যান পরিচয় অনেকের কাছে একধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল অনুসরণের অভিজ্ঞতা এবং খেলা সম্পর্কে গভীর জ্ঞানকে তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। ফলে বিশ্বকাপের সময় হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক নতুন বা অনিয়মিত দর্শকের উপস্থিতি অনেক সময় তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিতর্ক আরও বেশি দৃশ্যমান। বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ সমর্থন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বিশাল পতাকা টানানো, সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, জার্সি পরা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় দলভিত্তিক প্রচারণা এখন অনেকটাই পরিচিত দৃশ্য। ফলে চার বছর পরপর এমন অনেক মানুষও ফুটবল আলোচনায় যুক্ত হন, যারা বছরের অন্য সময়ে খেলাটি নিয়মিত অনুসরণ করেন না।

সোশ্যাল মিডিয়া এ বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করে তুলছে। ফেসবুক কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম সাধারণত বিতর্ক, আবেগ এবং বেশি সম্পৃক্ততা তৈরি করে এমন কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে মৌসুমি ফ্যান ও আসল ফ্যানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পোস্ট, মিম, ভিডিও কিংবা মন্তব্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

এ দুই পক্ষের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে চলে পোস্ট-পাল্টাপোস্ট, মন্তব্য আর মিমের প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ ফুটবল বোঝার মানদণ্ড হিসেবে ট্যাকটিকস, ফরমেশন, ট্রান্সফার ইতিহাস কিংবা অফসাইড রুল নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা করেন। আবার অন্যরা প্রশ্ন তোলেন, ফুটবল উপভোগ করতে হলে কি সারাবছর খেলা দেখা বাধ্যতামূলক?

বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হওয়া মিম সংস্কৃতিও এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। মৌসুমি ফ্যান শনাক্তের উপায়, বিশ্বকাপ এলেই ফুটবল বিশেষজ্ঞ কিংবা চার বছর পর সক্রিয় সমর্থক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ও ভিডিও নিয়মিত ভাইরাল হয়। অনেক ক্ষেত্রে এ বিতর্ক বাস্তব মতপার্থক্যের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক হাস্যরসের অংশ হিসেবেই বেশি দেখা যায়। সমর্থকেরা নিজেদের দলকে এগিয়ে রাখতে কিংবা প্রতিপক্ষকে খোঁচা দিতে এসব কনটেন্ট তৈরি করেন। যা অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

তবে বিতর্কের বিপরীতে ভিন্ন মতও আছে। অনেকের মতে, মৌসুমি ফ্যান হওয়া নেতিবাচক কিছু নয়। সবার আগ্রহ, সময় এবং জীবনযাত্রা এক নয়। কেউ হয়তো নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখার সুযোগ পান না, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে প্রিয় দলকে সমর্থন করতেই পারেন। তাদের কাছে বিশ্বকাপ হচ্ছে আনন্দ, উৎসব এবং সাময়িকভাবে একটি বৈশ্বিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।

ফুটবল বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে চার বছর পর খেলা দেখতে বসা দর্শক, বিশ্বকাপের সময় সবাই কোনো না কোনোভাবে একই আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল হলে যেমন অভিজ্ঞ সমর্থক আবেগে ভেসে যান; তেমনই অনিয়মিত দর্শকরাও একই উচ্ছ্বাসে উদযাপন করেন। সামাজিক মাধ্যমে যতই আসল ও মৌসুমি সমর্থকদের বিভাজন তৈরি হোক না কেন, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই।

এটি এমন আয়োজন, যা ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাস, আগ্রহ ও অভিজ্ঞতার মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করে। কেউ সারাবছর ফুটবল দেখুক বা চার বছর পর মাঠে ফিরুক; বিশ্বকাপের উন্মাদনায় তাদের অংশগ্রহণই এ বৈশ্বিক আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্ট্যাডিজ বিভাগ, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow